পরে অবশ্য বস্তীর মাতব্বরেরা সব কয়টি আহতকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। থানা-পুলিস পর্যন্ত ব্যাপারটা গড়ায়নি। কারণ কোন পক্ষই থানায় যায়নি। আহতদের ওরা নিজ নিজ ছাপড়ায় পৌঁছে দিয়ে এসেছে। বস্তীর আইন অনুসারে এখানেই মাতব্বরদের দায়িত্ব খালাস।
এই হচ্ছে গগ্যার মাথাফাটার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
আমি আর বটুক যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখনও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে গগন। গায়ে হাত দিয়ে দেখি জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, থার্মোমিটার সঙ্গেই ছিল। জ্বরতাপ দেখলাম; একশ তিন। চোখ দুটো জবাফুলের মত লাল। ঘুমের মধ্যে ভুল বকছে।
পাশের ঘরে লোকটি বললে, –ওরাকে লে যাইহ বাবু, ইহা রহনেসে মর যাই।
বটুক বললে, তিনদিন ধরে একটা মানুষ পাশের ঘরে বেহুঁস হয়ে পড়ে আছে, তোমরা দেখ না কেন?
লোকটি হতাশার ভঙ্গি করে বলে, -ক্যা কিয়া যায়? বহু না খাতে, না পিতে। ভরদিন বে-হোঁস! ঔর হোঁস হোনেসে হামলোগকে মার ডালনে চাতা।
বললাম, বটুক, একে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে ও কি বেঁচে উঠবে? ও তো নার্সদেরও মারধোর করতে চাইবে!
আমি বলি, –তা ঠিক। আঘাতটা কতদূর গভীর না বুঝে কিছুই বলতে পারছি না। তাছাড়া শক্ থেকে জ্বর হয়েছে। মাথার আঘাত তো–ব্রেনটা না অ্যাফেটেড হয়। সেক্ষেত্রে ওষুধের চেয়ে নার্সিংটাই এখন বড় কথা। ওর জীবনীশক্তি প্রচুর–একটু যত্ন পেলে ও নিশ্চিত বেঁচে উঠত।
বটুক আমার হাত দুটি জড়িয়ে ধরে বলে, –আমরা কি ওকে এভাবে মরতে দিতে পারি দীপু?
আমি ইতস্ততঃ করে বলি, আমার বাড়িতে বিয়ের হাঙ্গামা না থাকলে আমি ওকে আমার বাড়িতেই নিয়ে যেতাম। ও ঠিক বেঁচে উঠত। এখানে এ অবস্থায়–
বটুক তখনও আমার হাতটা ছাড়েনি। বললে, কিন্তু আমার বাড়িতে তো বিয়ের হাঙ্গামা নেই। আমি ওকে আমার বাড়িতে নিয়ে যাই। আমার তো দুখানা ঘর; ও বাইরের ঘরে থাকবে। তোর গাড়িতেই ওকে নিয়ে যাই।
কিন্তু বটুক, গগ্যাকে তোর বউ কি চোখে দেখে তা তো জানিস—
–কী পাগলের মত বকছিস! লোকটা মরতে বসেছে–
আমি বাধা দিয়ে বলি, –তা হোক। তুমি বরং আগে তোমার স্ত্রীর সঙ্গে একবার কথা। বলে নাও। তোমার অন্য বন্ধু হলে আমি এ কথা বলতাম না; কিন্তু গগ্যার ক্ষেত্রে
ও দৃঢ়স্বরে প্রতিবাদ করে, -লেখাকে তুই জানিস না! ওর মন শিশুর চেয়ে কোমল। একটা মানুষ মরে যাচ্ছে শুনলে…আজ বড়দিনের দিন…
–তা হোক। আমি বলছি–তুই একবার কথাবার্তা বলে আয়। আমি না হয় অপেক্ষা করছি।
বটুক চুপ করে খানিকক্ষণ কী ভাবলে। তারপর বলে, –তুই ঠিকই বলেছিস রে। বউকে না জিজ্ঞেস করে গগ্যাকে হুট করে নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তবে তোকেও আসতে হবে…মানে ডাক্তার হিসাবে তোর অভিমতটাই জোরদার হবে তো!
দুজনে গেলে এখানে কে থাকবে? রোগীর কাছে?
পাশের ঘরের হিন্দুস্থানী লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল পিছনেই। আমাদের কথাবার্তা সে কিছু কিছু বুঝতে পেরেছে। তার দেহাতী ভাষায় বললে, -যান বাবুমশাইরা, ব্যবস্থা করে এসে নিয়ে যান। ততক্ষণ আমরাই দেখ ভাল্ করব।
বটুক কয়েকটা কমলালেবু প্রথমবারেই নিয়ে এসেছিল।
একটু জলও গরম করা গেল। বটুক একটা ফিডিং কাপ কিনে নিয়ে এল বরানগরের বাজার থেকে। একটু একটু করে আধো ঘুমের মধ্যে গগনকে খানিকটা ফলের রস খাইয়ে দিলাম। এখন করণীয় কিছু নেই। রোগী অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। ঘুমই ওষুধ। আমরা ওকে প্রতিবেশীর জিম্মায় রেখে আবার রওনা হলাম বরানগর থেকে ভবানীপুর।
আমিই চালাচ্ছি গাড়ি। বটুক বসে আছে আমার পাশে। হঠাৎ বললে, –লেখার হাতে ও ঠিক বেঁচে উঠবে, দেখে নিস। জানি তো লেখাকে। শীস এ ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল! আমার অসুখের সময়
বাধা দিয়ে বলি, বটুক, তোর স্ত্রী চোদ্দ বছর আগে একবার মা হতে বসেছিল, অথচ এ দীর্ঘদিনে আর সন্তান হয়নি। ব্যাপারটা কি, আজ বলবি? না, নেহাৎ কৌতূহলের জন্য এমন অশোভন প্রশ্নটা বারে বারে করছি না। ডাক্তার হিসাবেই জানতে চাইছি। কেন এতদিনে সে মা হয়নি?
বটুক অনেকক্ষণ জবাব দিল না। জানালার বাইরে অপসৃয়মান রাস্তার দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থাকে চুপ করে। তারপর তেমনিভাবেই ওধারে চেয়ে বলে, সুলেখা মা হতে পারেনি, কারণ আমি নিশ্চয়ই বাপ হওয়ার উপযুক্ত নই! দোষটা আমারই, ওর নয়!
তার মানে? চোদ্দ বছর আগে বিয়ের আগেই কি—
সুলেখা আমার বিবাহিতা স্ত্রী নয়। তার বিয়েই হয়নি!
এবার আমার নীরব হবার পালা।
এতক্ষণে আমার দিকে ফিরে বলে, -বেচারি কোন্ সাহসে তোর মত বামুনকে রেঁধে খাওয়াবে বল? বিয়ের আগেই মা হয়েছে, আর মা হবার পরেও বিয়ে হয়নি।
–তা হোক; কিন্তু ওর গর্ভে যে সন্তান এসেছিল, তার বাপ তাহলে –
সে রাস্কেলটা যে কে, তা আজও আমি জানি না।–
তোর সঙ্গে ওর কোথায় দেখা হয়? লেখাপড়া জানা মেয়ে?
আগেই বলেছি ও অফান। মানুষ হচ্ছিল দুরসম্পর্কের এক মামার কাছে। লোকটা কোন এক কোলিয়ারিতে কাজ করত। ভাগ্নীকে সে আশ্রয় দিয়েছিল বটে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল সাংঘাতিক। চাকরিতে উন্নতির জন্য ও লেখাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করত। সে এক বীভৎস ব্যাপার। বিস্তারিত আমি জানতেও চাইনি, লেখাও নিজে থেকে বলেনি। কোলিয়ারিতে ছিলেন এক ক্রিশ্চিয়ান ফাদার। তাকে খুব শ্রদ্ধা করত লেখা তিন ওকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অবাঞ্ছিত সন্তান আর নিজেকে মুক্তি দিতে একদিন লেখা বাড়ি ছেড়ে পালায়। ওখান থেকে দামোদর তিন মাইল। সিধে তিন মাইল হেঁটে চলে এসেছিল সে। আমি ওর সাক্ষাৎ পাই দামোদরের এক ঘাটে। ঘাটে নয়, আঘাটায়।
