বটুক বলে, আমি তো বলছি, সোজা হয়েছে।
-তোমার লাইনজ্ঞান নেই!
হা হা করে হেসে ওঠে বটুক। সে একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠিত আর্টিস্ট। তার লাইনজ্ঞান নেই।
বিদায় নিয়ে উঠে পড়তে হল। দ্বার পর্যন্ত এগিয়ে দিল সুলেখা। আগামীকাল সন্ধ্যায় আসার কথা আবার মনে করিয়ে দিল।
পরদিন সন্ধ্যায় নয়, দ্বিপ্রহরেই যেতে হয়েছিল ওদের বাড়ি। সে আর এক কাণ্ড।
পরদিন সকালে–এই বেলা দশটা নাগাদ হন্তদন্ত হয়ে বটুক এসে হাজির। চুল উসকো-খুসকো। মুখ শুকনো। গলার টাইটা আলগা, কোটের বোতাম উল্টো ঘরে। লাগান।
কী হয়েছে রে? এমনভাবে ছুটে এসেছিস?
দীপু, শীগগির আয়। সর্বনাশ হয়েছে! গগ্যা খুন হয়েছে!
খুন হয়েছে! কী বলছিস পাগলের মত?
বটুক বললে, সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই সে বরানগরে গিয়েছিল। বড়দিনের জন্য গগ্যাকে কিছু কমলালেবু, কেক আর মিষ্টি দিয়ে আসতে সেখানে গিয়ে সে যা দেখে এসেছে তা অকল্পনীয়।
বস্তীতে ওর খাটিয়ায় গগন শুয়েছিল চিৎ হয়ে। তার মাথায় প্রকাণ্ড একটা ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। আওডিন আর ডেটলের গন্ধে ঘরটা ম-ম করছে। হাট করে খোলা আছে দরজা। ঘরে আর কেউ নেই। ওর খাটিয়ার নিচে মাটিতে শালপাতা ঢাকা দেওয়া এক গ্লাস জল। পাশের ঘরে যে হিন্দুস্থানী লোকটা সপরিবারে থাকে তার কাছে পাওয়া গেছে কতকগুলো অসংলগ্ন সংবাদ। গগন দুদিন ঐভাবেই পড়ে আছে–অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায়! মাঝে মাঝে তার জ্ঞান হয়েছে বটে, তবে সে কিছু খায়নি। লোকজন দেখলেই মারতে উঠছে। বটুক জিজ্ঞাসা করেছিল, –এমন করে মাথা ফাটল কেন?
হিন্দুস্থানী লোকটা ভাল। যতটা জানা ছিল তার, শুনিয়ে দেয় বটুককে। এ বস্তীর অধিকাংশই বেহারী। চটকলে কাজ করে। তার ভিতর এই উটকো বাঙালিবাবুকে কেউই বড় একটা সুনজরে দেখত না। বাঙালিবাবু কোন কাজ কাম করে না। কারও সাথে মেশে না। সন্ধ্যে থেকে পড়ে পড়ে দারু খায়। তা দারু আর কে না খায়? সেজন্যে কিছু নয়। আসল কথা হল, বাঙালিবাবুর নজরটা খারাপ। ওদের বস্ত্রীর জীবন কারখানার সিটি দিয়ে বাঁধা। প্রহর নয়, সিক্ট দিয়ে বাঁধা ওদের জীবনযাত্রা। সকালে কারখানার প্রথম ভে পড়লেই বস্তীতে আর জোয়ান মানুষ থাকে না। তখন সেটা প্রমীলারাজ্য। থাকে কিছু পঙ্গু, বৃদ্ধ, শিশু আর ঔরৎ-লোক। এই বাঙালিবাবু সেই শান্তির রাজ্যে মূর্তিমান বিঘ্নের মত এসে অবতীর্ণ হয়েছে তার রঙ-তুলিকাগজ-পেনসিল নিয়ে। যখন-তখন যেখানে-সেখানে আঁকবার সরঞ্জাম নিয়ে বসে যায়। দু-একবার বস্তীর জোয়ানরা এসে শাসিয়েছিল। বাঙালিবাবু ভ্রূক্ষেপ করেনি। অবস্থা একদিন চরমে উঠল দুপুর বেলা। রাস্তার ধারে একটি মাত্র কর্পোরেশনের কল ওদের পানীয় জলের উৎস। জল নিতে আসে সারা বস্তীর লোক। লাইন পড়ে যায় মানুষের নয়, পাত্রের। ঘড়া, কলসী, বালতি, ক্যানেস্তারা টিন। মেয়েরা সার দিয়ে অপেক্ষা করে। ওরা কদিন ধরেই লক্ষ্য করছে বাঙালিবাবু একটা চৌকোমতন পিঁড়িতে মেয়েদের ছবি আঁকে। কথাটা কানাকানি হতেই প্রতিবাদে মুখর হয়ে পড়ল ভিখন, রঙলাল আর রামাবতার। ওরা জোর করে উঠিয়ে দিল বাঙালিবাবুকে। বললে, এমন বেসরমের কাজ যদি আবার তাকে করতে দেখা যায়, তবে তারা শেষ করে ফেলবে ওকে। এরপর কদিন আর বাঙালিবাবুকে দেখা যায়নি। সে বোধহয় দূরে কোথাও ছবি আঁকতে যেত। তারপর এই তো সেদিন, তিন নম্বর শেডের রঙলাল সপ্তাহান্তের টাকাটা ভাটিখানায় নিঃশেষ করে ফিরে আসতেই ওদের মরদ-ঔরতে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়ে গেল। এমন তো নিত্য হয়ে থাকে। কে আর তাতে কান দেয়। সেদিন কিন্তু রঙলাল দারু পান করে টং হয়ে ছিল–আচ্ছা করে ধর্মপত্নীকে চেলাকাঠ পেটা করে তাকে ঘরের বার করে দেয় এবং অর্গলবদ্ধ ঘরে নেশাগ্রস্ত মানুষটা দিব্যি শুয়ে পড়ে। অনেক রাত পর্যন্ত ওর বউ রুদ্ধদ্বারের কাছে বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে আর মিনতি করে। রঙলাল সেসব জানে না–সে তখন নেশার ঘোরে অচৈতন্য। ওর বউ অবশেষে বাইরের দাওয়াতেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। তার ঘুম ভাঙে ভোররাতে। উঠে দেখে, তার দাওয়া থেকে হাত দশেক দূরে বাঙালিবাবু বসে আছে, আর রঙ-তুলি দিয়ে তার ছবি আঁকছে। অসংবৃত বেসবাস সামলে রঙলালের বউ মড়াকান্না জুড়ে দেয়বাঙালিবাবু তার ইজ্জত নষ্ট করেছে, ততক্ষণে রঙলালের নেশা ছুটে গেছে। দ্বার খুলেই সে দেখে বাঙালিবাবু দ্রুতহাতে তখনও এঁকে চলেছে তার ডবকা বউয়ের যৌবনপুষ্ট দেহের ছবি। রঙলাল আর স্থির থাকতে পারেনি। ছুটে এসে প্রচণ্ড একটা চড় মেরে বসে বাঙালিবাবুকে। বউয়ের ইজ্জত নিয়ে কথা! না হয় বিয়ে করা বউ নাই হল–ওর ঘরেরই তো সে! তারই বিবি! একটা কথা শুধু রঙলাল খেয়াল করেনি-সেটা এই যে, ঐ বাঙালিবাবুর দেহে ছিল মত্তহস্তীর বল। চড় খেয়েও তসবিরওয়ালাবাবু কিছু বলেনি। গুটিয়ে তুলছিল তার আঁকার সরঞ্জাম। আর ঐ সুযোগে রঙলাল এক লাথি মেরে ছবিটাকে ফাঁসিয়ে দেয়। অমনি ঐ বাঙালিবাবু রঙলালকে দুহাতে মাথার উপর তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল ছাইগাদায়। একে বউয়ের ইজ্জত গিয়েছে, তায় সকাল বেলাতেই আঁস্তাকুড়ে পড়েছে সে-রঙলাল দিক্বিদিক জ্ঞান হারায়। তার সবচেয়ে রাগ হয়েছিল বাঙালিবাবু, তাকে ছুঁড়ে ফেলায় তার বউ খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল বলে। রঙলাল লোকজন ডেকে আনে। ততক্ষণে বাঙালিবাবু তার ডেরায় চলে গেছে। ওরা পাঁচ-সাতজনে লাঠি নিয়ে এসে সেখানে চড়াও হয়। বাঙালিবাবু তার ভিতর তিন-চারজনকে ঘায়েল করেছে বটে, কিন্তু নিজেও সে ধরাশায়ী হয়। রঙলাল ভূপতিত মানুষটার মাথায় বসিয়ে দেয় মোম এক ডাণ্ডার বাড়ি!
