আরে ব্বাস রে! তোর কথাই ভাবছিলাম। আয় আয়। শোন, কাল তোর নেমন্তন্ন! আমার বাড়িতে, রাত্রে। লেখা হাঁড়িকাবাব খাওয়াবে। জমিয়ে বড়দিন করা যাবে।
আমি বলি, আপাততঃ সে গুড়ে বালি ভাই। আমার ভাইঝির বিয়ে। দোসরা মাঘ। তোকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছি। এখন আমার মরবার ফুরসৎ নেই—
আরে সে তো পরে বছরের কথা। ঢের দেরী আছে। কাল তোকে আসতেই হবে।
বলি, হ্যাঁরে বটুক, চন্দ্রভানের খবর রাখিস?
না। শুনেছি সে খ্রীষ্টান হয়ে গেছে। ওর ভাই সূরযের সঙ্গে বছরখানেক আগে দেখা হয়েছিল। সে আজকাল দিল্লীতে থাকে। তার কাছেই শুনেছিলাম। স্কুল ছাড়ার পর আর তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। কোথায় আছে জানি না।
চন্দ্রভান কলকাতাতেই আছে। দিন তিনেক আগে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে।
বলিস কি? বল, তার ঠিকানা বল। কাল তাহলে তাকেও নিমন্ত্রণ করি বরং।
আমি বাধা দিয়ে বলি, না রে! প্রথমত, তার ঠিকানা আমি জানি না, দ্বিতীয়ত, তার সঙ্গে নতুন করে বন্ধুত্ব স্থাপন না করাই মঙ্গল। চন্দরটা একেবারে গোল্লায় গেছে–
-মানে? কী বলছিস তুই?
আমি আদ্যোপান্ত ইতিহাসটা ওকে শোনাই। বটুক ধৈর্য ধরে সবটা শুনল, তারপর বললে, –ঐ তোর বড় দোষ দীপু। বড় সহজে তুই কনক্লুশানে আসিস। চন্দ্রভানের ভি. ডি, হয়েছে শুনেই তুই শুচিবায়ুগ্রস্তের মত নাক সিটকালি। তুই না ডাক্তার?
আমি বলি, দ্যাখ বটুক, সেজন্য আমি রাগ করিনি। রাগ করেছি ওর ন্যাকামি দেখে। ওর নিজের স্ত্রীর ঐ অসুখের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। রোজার কাছে মামদোবাজি। আমি বুঝি না কিছু? আর কী লম্বাই-চওড়াই বুলি!
যাক, ঠিকানা যখন রাখিসনি, তখন চন্দ্রভান আবার হারিয়ে গেল। একবার হেদোয় গিয়ে খবর নেব বরং। হাজার হোক, আমরা একই প্রফেশানের মানুষ। দেখি যদি ওকে কিছু সাহায্য করতে পারি।
আমি ওকে বারে বারে বারণ করলাম; কিন্তু বটুক মনে হল কথাটা কানে তুলল না। সে কতকগুলো মালপত্র গুছিয়ে তুলছিল। দেখি, বটুক অনেক জিনিসপত্র কিনেছে। ক্রিস্টমাস প্রেজেন্টস্! ফুল, কেক, মায় একটা ক্রিস্টমাস ট্রি।
আমি ঠাট্টা করে বলি, –হগমার্কেটে দোকান দিয়ে তুই যে একেবারে সাহেব হয়ে গেছিস দেখছি! মায় ক্রিস্টমাস ট্রি? অ্যাঁ?
বটুক দড়ি দিয়ে কি একটা প্যাকেট বাঁধছিল। মুখ তুলে বললে, –এসব সুলেখার জন্যে। ও ধর্মে হিন্দু, কিন্তু মনেপ্রাণে ক্রিশ্চিয়ান। একজন ফাদার ওর জীবনে খুব প্রভাব বিস্তার করেছিল। তখন ওর বয়স বছর পনের। ও নাকি তার কাছে খ্রীষ্টানধর্মে দীক্ষা পর্যন্ত নিতে গিয়েছিল। তিনি ওকে দীক্ষিত করেননি-অপ্রাপ্তবয়স্কা বলে বোধহয়। সুলেখার কাছে শিব বা কালীর চেয়ে যীসাস্ অথবা মেরীর কদর বেশি! দেখ না, ওর জন্য কি প্রেজেন্ট নিয়ে যাচ্ছি!
ক্রুশবিদ্ধ যীশুর একটি তৈলচিত্র বটুক নিজে এঁকেছে।
বলি, বটুক, সেদিন তুই তোর স্ত্রীর প্রসঙ্গে কি একটা কথা বলতে গিয়ে থেমে গিয়েছিলি। আজ বলবি?
–আজ নয় ভাই। আজ একটু তাড়া আছে। শীগগির করে বাড়ি ফিরতে হবে।
–তোর স্ত্রীর দেশ কোথায়? বাপের বাড়িতে কে আছেন?
–ওর বাপ-মা কেউ নেই। বাড়ি ছিল মেদিনীপুরে। বন্যায় এক রাত্রে বাপ মা ভাই সবাই ভেসে যায়। ও আশ্রয় পেয়েছিল দূরসম্পর্কের এক মামার কাছে। লোকটা চামার। ওর আসল নাম চিত্রলেখা-কিন্তু কি জানি কেন আমাকে ও নামে ডাকতে বারণ করে। আমি ওকে ডাকি সুলেখা বলে। কিন্তু এখন সে মহাভারত শোনাতে পারব না ভাই।
বাইরে এসে বলে, –এ কি রে? তোর গাড়ি? কিনেছিস? বাঃ! তাহলে যোগেশ মিত্তির রোড পর্যন্ত পৌঁছে দে না ভাই! এতগুলো মালপত্তর নিয়ে–
ভাবলাম সেই ভাল। ওর বাড়িতে গিয়েই সস্ত্রীক নিমন্ত্রণ করে আসি। সুলেখা ইতিমধ্যে আমাদের বাড়ি একদিন এসেছিল। আমার স্ত্রীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে।
ওদের বাড়িতে গিয়ে দেখি সুলেখা এলাহি আয়োজন করেছে। বেলুন আর কাগজের শিকল দিয়ে বাইরের ঘরটা সাজিয়েছে। ক্রিস্টমাস ট্রি-টা যেখানে থাকবে সে জায়গাটা সাফা করে রেখেছে। আমাকে দেখেই বললে, -ডাক্তারবাবু! আসুন আসুন। কাল আপনাকে হাঁড়িকাবাব খাওয়াব। কাল রাত্রে। মিসেসকেও নিয়ে আসবেন।
বললাম আমার অবস্থার কথা। বাড়ি ভরতি আত্মীয়-স্বজন। আমার স্ত্রীর পক্ষে এখন আসা সম্ভবপর হবে না। দোসরা মাঘ নিমন্ত্রণও করলাম।
বটুক আমাকে জনান্তিকে বললে, –গগ্যাকে আজ নিমন্ত্রণ করবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু বউ রাজী হচ্ছে না। তুই একটু বলে দেখ না!
আমি বলি, বটুক, এটা অন্যায় বলছিস। আনন্দটা ওঁর। এখানে কেন মিছিমিছি অশান্তি টেনে আনবি?
সুলেখা ছিল পাশের ঘরেই। কথাটা তার কানে যায়। ওর ঘর থেকেই বলে, বলুন তো ডাক্তারবাবু! তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়ে হৈ-চৈ করতে চাও, কর না। আমি তো আপত্তি করছি না। এখানে কেন?
বটুক বললে, তাহলে কাল সকালে ওর জন্যে কিছু কেক আর মিষ্টি নিয়ে যাব। সে বেচারি বরানগরের বস্তীতে বড়দিনের দিন হয়তো পেটে কিল মেরে পড়ে থাকবে।
সুলেখা এ-ঘরে এসে বলে, যাও না, যত ইচ্ছে কেক খাইয়ে এস। আমার কি?
একটুখানি বসে গেলাম। ক্রিস্টমাস ট্রি-টা সাজাতে সাহায্য করলাম। সুলেখা যেন ছেলেমানুষ হয়ে গেছে। ত্রিশ বছরের রাশভারী মহিলা যেন সে নয়, যেন আজ আবার সে তার কৈশোরে ফিরে গেছে। দিব্যি হুকুম চালাচ্ছে আমাকেও, দেখুন তো ডাক্তারবাবু, লাইনটা সোজা হল কিনা?
