–ওঁর স্ত্রী নিতান্ত গ্রাম্য মহিলা। কথায় জড়তা আছে। লজ্জায় জড়সড়। বোধকরি আপনার বন্ধু তাকে নিয়ে কোনদিন থিয়েটার্স দেখতেও যান না, পর্দানশীন যে! আর এদিকে নিজে প্রস্ কোয়ার্টার থেকে নিয়ে এসেছেন এ রোগ–চাপিয়ে দিয়েছেন নির্বিচারে একটা অসহায় মেয়ের দেহে। মাপ করবেন ডক্টর লাহিড়ী-আপনার বন্ধু বলে আমি রেয়াৎ করব না। হান্টার পেটা করা ছাড়া ও রোগের চিকিৎসা নেই!
আমি জবাব দিতে পারিনি। জবাব ছিলও না কিছু। সেই চন্দ্রভান এত নিচে নেমে গেছে?
পরদিন আবার চন্দ্রভান এল হাসপাতালে। ঘরে ঢোকবার মুখেই দেখি বেঞ্চির কোণ দখল করে বসে আছে। আমাকে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে কিছু একটা কথা বলতে চায়। আমি দেখেও দেখি না। সোজা ঢুকে পড়ি চেম্বারে।
একটু পরে আর্দালি খানকতক স্লিপ রেখে গেল টেবিলে। সবার উপরে চন্দ্রভানের চিরকুট। আমি সেটা বাঁ-হাতে সরিয়ে রাখি। থাক বসে। অন্যান্য দর্শনপ্রার্থীদের একে একে বিদায় করতে থাকি। একটি বেলা ওকে বসিয়ে রেখে উঠবার উপক্রম করছি, আর্দালি পুনরায় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল স্লিপ কাগজটার দিকে।
-এর আউটডোর টিকিট কোথায়? এখানে কি চায়?
–না স্যার, উনি এমনিই দেখা করতে চান। বললেন, আপনার বন্ধু।
বন্ধু! নাঃ! এ অধ্যায়ের শেষ করতে হয়। না হলে সকাল-সন্ধ্যা নোকটা বিরক্ত করবে, যেখানে-সেখানে পরিচয় দেবে ডাক্তার দ্বৈপায়ন লাহিড়ী ওর বন্ধু। ঐ চরিত্রহীন, ইন্দ্রিয়াসক্ত লম্পট লোকটা–যে বেশ্যাপল্লী থেকে কুৎসিত ব্যাধি বয়ে নিয়ে এসে সেটা ধর্মপত্নীর দেহে পাচার করেছে তার সঙ্গে সব সম্পর্ক এখনই চুকিয়ে নেওয়া দরকার।
–ডেকে দাও।
চন্দ্রভান পর্দা সরিয়ে ঢুকল। সে নিশ্চয় কিছু আন্দাজ করেছে। বিনা অনুমতিতে বসল আমার ভিসিটার্স চেয়ারে। কেমন যেন গোরু চোরের মত আতঙ্কিত দৃষ্টি। কান দুটো খরগোশের মত খাড়া হয়ে আছে। একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়ি।
-কি চাই?
একেবারে থতমত খেয়ে গেল চন্দ্রভান। ঢোক গিলে বললে, না, মানে কাল তুই আসতে বলেছিলি কিনা? ইয়ে মিসেস স্মিথ কি বললেন? কোন কমপ্লিকেশান নেই তো?
আমি ওকে বসতে বললাম না। বরং নিজেই উঠে পড়ি। হ্যাঙার থেকে কোটটা পেড়ে গায়ে দিতে দিতে বলি, কপ্লিকেশান যে আছে তা তুমি জান না?
ও বোকার মত তাকিয়ে থাকে। অস্ফুটে বলে, না! কী?
-তোমার স্ত্রী একটি কুৎসিত ব্যাধিতে ভুগছেন, এ কথা তোমার জানা নেই বলতে চাও?
বিশ্বাস কর দীপু, আমি কিছুই জানি না!
ও আমাকে বিশ্বাস করতে বলছে! স্ত্রীর উপদংশ রোগ হয়েছে, তা স্বামী জানে না! ঘুরে দাঁড়িয়ে বলি, –তোর লজ্জা হয় না স্কাউণ্ড্রেল? সমাজে মুখ দেখাস কি করে?
ওর মুখটা একেবারে ছাইয়ের মত সাদা হয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলে, কী বলছিস?
ন্যাকা! কতদিন ধরে প্রস্ কোয়াটার্সে যাচ্ছিস?
মাথাটা নিচু হয়ে গেল ওর।
-কই, তুই তো বললি না–প্রস্ কোয়ার্টার্সে আমি জীবনে যাইনি দীপু!
মুখটা তুলল না। মাথা নিচু করেই বলল, -মিছে কথা আমি বলি না। আমি শুধু ভাবছি তুই কেমন করে জানতে পারলি!
–রোগ চাপা থাকে না। ও-রোগের চিকিৎসা হচ্ছে চাবুক। চাবকে শায়েস্তা করলে তবে ও রোগ ছাড়বে। তবে আমার ওসব ভাল লাগে না। আমার সময়ও নেই, ধৈর্যও নেই। অন্য কোন ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাস।
একটি কথাও বলল না চন্দ্রভান। মুখ তুলে চাইল না পর্যন্ত।
আর একটা কথা। আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও আজ এখানে শেষ হল।
–আর কোনদিন এখানে আসব না, এই কথা বলতে চাস?
না। এটা সরকারী হাসপাতালও কথা বলার অধিকার আমার নেই। তবে ডাক্তার দ্বৈপায়ন লাহিড়ীর বন্ধুর পরিচয়ে এখানে আর এস না।
এতক্ষণে চন্দ্রভান হাসল। পাণ্ডুর ম্লান হাসি। বললে, ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি।
বলল বটে, কিন্তু চলে গেল না। জানালা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর আপন মনে বললে, আজব এ দুনিয়া! ক্রিশ্চান ফাদারদের দেখলাম–পাপের সঙ্গে দিব্যি আপস করেছেন তারা, যত আক্রোশ পাপীর উপর, আর কে পাপী তাও চিনতে পারছেন না! আজ আবার মেডিক্যাল কলেজের পাস করা ডাক্তারদের দেখলাম রোগের বিরুদ্ধে তাদের কোন জেহাদ নেই, যত আক্রোশ রোগীর উপর, আর কে রোগী তাও চিনতে পারছেন না তারা।
–তার মানে? তুই নিরোগ? ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে বল্ দেখি তোর রতিজ রোগ নেই?
–তা আমি বলব না দীপু। কারণ ঈশ্বরকে আমি মানি না! ঈশ্বরের নামে শপথ নিই না আমি!
-না, মিস্টার ভিন্সেন্ট ভান গর্গ! আমি কালী-দুর্গা-মা শীতলার দিব্যি দিতে বলছি না তোমাকে। তোমাদের গড-দি-ফাদারের নামে ওথ নিতে বলছি।
-হ্যাঁ, আমি ও তাঁর কথা বলছি! ঈশ্বর মানি না আমি! আমি নাস্তিক!
-খুব আনন্দের কথা! সমাজ মানো না, ধর্ম মানো না, ঈশ্বরও মানো না! বাঃ! বেশ কথা, তবে দয়া করে ঐ সঙ্গে আরও একটি জিনিস অস্বীকার কর–আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা!
চন্দ্রভান জবাব দেওয়ার সুযোগ পায়নি। পরক্ষণে আমি নিজেই ঘর ছেড়ে চলে যাই।
১১-১২. তারিখটা মনে আছে
তারিখটা মনে আছে। চব্বিশে ডিসেম্বর। ক্রিস্টমাস ঈভ। এতদিনে বাবা গত হয়েছেন। আমিই সংসারের কর্তা। আমাদের তখনও ছিল একান্নবর্তী পরিবার। আমার মেজ ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে স্থির হয়েছে। দূর দূর থেকে আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি ভরে গেছে। আমার মরবার ফুরসৎ নেই। কি একটা কাজে চৌরঙ্গীর দিকে গিয়েছিলাম, ভাবলাম বটুকের দোকানে একবার যাই। ওকে নিমন্ত্রণ করে আসি। সেদিন একজিবিশানে হাটের মাঝে ইচ্ছে করেই নিমন্ত্রণ করিনি। সেটা শোভন হত না। ওর দোকানে যেতেই বটুক একেবারে লাফিয়ে উঠল—
