নেহাৎ মামুলি ছবি সব। বিষয়বস্তুতে আকর্ষণীয় কিছু নেই। তবে রঙের ব্যবহারটাতে সাহসের পরিচয় আছে। কখনও কখনও তুলির সোজা টান না দিয়ে সে পাশাপাশি বিন্দু বিন্দু রঙের ফুটকি বসিয়েছে। কখনও বা বিশেষ করে অয়েল কালারে, রঙ লাগিয়েছে রীতিমত ধ্যাবড়া করে লিনসিড অয়েল-তৃষিত কাঁচা রঙ বোধহয় আঙুলে করে থুপ থুপ করে বসিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের রঙের ব্যভিচার আমি ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি।
-কেমন লাগছে?
সেই চিরন্তন সমস্যা! নবীন সাহিত্যিক, নবীন শিল্পীর বন্ধুদলের এ এক সর্বকালের সমস্যা। মুখ ফুটে বলাও যায় না যে, মোটেই ভাল লাগছে না! একটু ঘুরিয়ে বলি, স্টাইলটা নতুন, কিন্তু এ কি পাবলিকে নেবে?
–পাবলিকের জন্য তো আঁকিনি আমি!
–তাহলে হেদোর ধারে সাজিয়ে বসেছিস কেন?
চন্দ্রভান ম্লান হাসে। বুঝতে পারি তার সমস্যা। সাধারণ মানুষে ছবি কেনে না, কেনে রাজা মহারাজা জমিদার এবং বিলাতি কোম্পানির ধনকুবেররা। তাদের নাগাল কেমন করে পাবে চন্দ্রভান? তাছাড়া তারা এ জাতীয় ছবি পচ্ছন্দই করবে না।
–ছবির কথা থাক। তোর খবর বল্। কোথায় আছিস?
চন্দ্রভান বললে, সে কাছেই থাকে। ঠিকানা জানাল না।
বিয়ে করেছিস?
এবার সে হাসল। বললে, করেছি। তুই তো ডাক্তার হয়েছিস দীপু, একটা উপকার করবি?
-কি বল্?
–ওকে একবার ডাক্তার দিয়ে দেখাতে চাই।
–বেশ তো, নিয়ে যাস একদিন। হাসপাতালে কিংবা আমার বাড়িতে
— ছাপানো কার্ড বার করে দিলাম। সেটা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে মুখ নিচু করেই বললে, –তোকে দিয়ে দেখানো চলবে না, কোন লেডি ডাক্তার তোর জানাশোনা আছে?
আমি হেসে উঠি। বলি, –তোর বউ পর্দানশীন নাকি? তুই না খ্রীষ্টান হয়েছিস? তোর বউও তো আলোকপ্রাপ্তা? না কি?
না রে! ও কিছুতেই পুরুষমানুষের সামনে বের হতে চায় না। সে অনেক ব্যাপার। তোকে পরে সব বলব একদিন। কোন মেয়ে ডাক্তার হলে
-কি হয়েছে তোর বউয়ের? অসুখটা কি?
–না, অসুখ কিছু নয়। ওর…ছেলেপুলে হবে।
–আচ্ছা! কংগ্রাচুলেশন্স! এই কি ফার্স্ট কনফাইনমেন্ট? প্রথম সন্তান সম্ভবনা?
না। এর আগেও একটি ছেলে হয়েছিল। সেটি মারা গেছে।
জন্মাবার সময়?
–না না। অনেক বড় হয়ে প্রায় আট বছর বয়সে।
–ওঃ! অনেকদিন বিয়ে করেছিস তাহলে। তা এত বছর আর বাচ্চা হয়নি?
না।
-বুঝলাম। তা তুই কালই ওকে হাসপাতালে নিয়ে আয়। আমি ব্যবস্থা করে দেব। ভয় নেই, আমি ঘোমটা দিয়ে থাকব। মেডিক্যাল কলেজে একজন লেডি ডাক্তার। আছেন। ডক্টর মিসেস স্মিথ। কাল তার ভিসিটিং ডে। তুই সোজা আমার ঘরে চলে আসিস।
পরদিনই চন্দ্রভান সস্ত্রীক মেডিক্যাল কলেজে এসে হাজির। স্লিপ দেখে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। চন্দ্রভানকে নিয়ে এলাম। মিসেস স্মিথের ঘরে। আমার চেম্বারের বাইরে বেঞ্চিতে যারা সারি সারি বসেছিল তাদের মধ্যে একজনকে চন্দ্রভান ইঙ্গিতে আহ্বান করল। উঠে এলেন একজন মহিলা। মুখের উপর এত প্রকাণ্ড ঘোমটা তিনি দিয়েছেন যে, চন্দ্রভানের বউ দেখা আমার হল না, তবে হাত-পাগুলি অনাবৃত ছিল। তাতে মালুম হল, চন্দ্রভান যদি কখনও বটুকেশ্বরের মত তার বউয়ের ছবি আঁকতে বসে তাহলে তার প্রয়োজন হবে একটি মাত্র রঙ-চাইনিস ইংক। বলিষ্ঠগঠনা। দীর্ঘাঙ্গী। নিঃসন্দেহে তার ফিগারটি অনিন্দ্যনীয়, যদিও বর্তমানে তাকে মধ্যে-ক্ষামা বলার উপায় নেই।
মিসেস স্মিথের কাছে ওকে জিন্মা করে আসার আগে বলি, কাল আবার আসিস। ইতিমধ্যে মিসেস স্মিথের কাছ থেকে প্রাথমিক রিপোর্টটা আমি শুনে নেব।
প্রাথমিক রিপোর্টটা আমাকে গরজ করে শুনতে যেতে হল না। ভিসিটিং আওয়ার শেষ হলে ডক্টর মিসেস স্মিথ নিজেই চলে এলেন আমার ঘরে। আমারও রোগী দেখার পর্ব শেষ হয়েছিল। উঠব উঠব করছি, হঠাৎ উনি আসায় আবার বসে পড়ি। উনি বলেন, ডক্টর লাহিড়ী মিস্টার গর্গ কি আপনার বিশিষ্ট বন্ধু?
-হ্যাঁ, আমার সহপাঠী। আমরা একসঙ্গে আর্য মিশন স্কুলে পড়তাম।
–তারপর? তারপর আপনাদের বন্ধুত্বটা কি পর্যায়ে আছে?
-কেন বলুন তো? ম্যাট্রিক পাস করার পর আর ওর খবর কিছু জানতাম না। গতকাল মাত্র দেখা হয়েছে। একথা কেন জিজ্ঞাসা করছেন?
মিসেস স্মিথ একটু ইতস্ততঃ করে বলেন, না, কিছু নয়। ওঁর আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ, নয়?
-হ্যাঁ। অথচ ও জমিদারের ছেলে। সব ছেড়ে-ছুঁড়ে ও বিবাগী হয়ে যায়।
জমিদারের ছেলে! ও, তাই বলুন!
কেমন যেন অসংলগ্ন কথাবার্তা ওর। মনে হল কি একটা কথা উনি বলি বলি করেও বলতে পারছেন না। অমন একটা লোফারের সঙ্গে আমার মত ডাক্তার মানুষের বন্ধুত্বটা ঠিকমত বরদাস্ত করতে পারছিলেন না বোধ হয়।
মিসেস গর্গকে কেমন দেখলেন বলুন? কোন কমপ্লিকেশান আছে?
এতক্ষণে মুখ তুলে মিসেস স্মিথ চাইলেন আমার দিকে। বললেন, –আছে! কিন্তু চিকিৎসাটা আপনাকে করতে হবে, আমার দ্বারা সম্ভবপর নয়!
এ আবার কি হেঁয়ালি? আমাকে প্রশ্ন করতে হল না। উনি এক নিঃশ্বাসে বলে যান, চিকিৎসার প্রয়োজন ওর স্ত্রীর নয়, মিস্টার গর্গের। আর সে ওষুধটা আপনার পক্ষে প্রয়োগ করাই বাঞ্ছনীয়।
-কি ওষুধ?
–শঙ্কর মাছের চাবুক!
আমি স্তম্ভিত। কি বলছেন উনি? কী বলতে চাইছেন?
মিসেস স্মিথ নিঃশব্দে একটি রিপোর্ট আমার সামনে বাড়িয়ে ধরেন। দেখলাম লেখা আছে-রোগিণী মিসেস গর্গ, বয়স ছত্রিশ, ওজন একশ বারো পাউণ্ড, গর্ভস্থ ভ্রূণের বয়স পঁচিশ সপ্তাহ, এবং আসন্ন জননী উপদংশ রোগে আক্রান্ত!
