সুলেখী দেবী কিছু বলার আগেই বটুক বলে ওঠে, -এবারে একজিবিশান দেখেছিস? আয় না, একসঙ্গে দেখা যাক। সুলেখা এবার প্রাইজ পেয়েছে যে
সুলেখা?–আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি।
–আই মীন সুলেখার সেই ছবিখানা। সেই পোর্ট্রেটখানা। চল দেখাই।
আজ ওর আনন্দের দিন। তিন-চার বছর প্রদর্শনীতে ওর ছবি থাকছে, এই প্রথম সে প্রাইজ পেয়েছে। আমার অনেক কাজ ছিল হাতে। বিয়ের বাজার করতে বেরিয়েছি। কিন্তু সেকথা ওদের বললাম না। রাজী হয়ে গেলাম। বটুক আমাকে নিয়ে গেল প্রদর্শনীতে। ছাপানো প্রোগ্রাম বই সে-ই কিনল। আমাকে এক একখানা করে দেওয়ালে টাঙানো ছবি দেখিয়ে নানা জ্ঞানগর্ভ আর্টের তত্ত্ব বোঝাতে থাকে। সুলেখা দেবী সঙ্গে সঙ্গে আছেন। যতদূর মনে পড়ছে সেবার অসিতকুমারের সুরের আগুন, সমরেন্দ্র গুপ্তের নটরাজের মন্দিরে, যামিনীবাবুর গণেশজননী আর দেবীপ্রসাদের বুদ্ধের নির্বাণ প্রদর্শিত হয়েছিল। আর প্রতিযোগিতার বাইরে দেখানো হয়েছিল অবনীন্দ্রনাথের শাজাহানের মৃত্যু। গগনেন্দ্রনাথের একখানি ছবি ছিল; তার গঠন পদ্ধতিটা ঠিকমত বুঝলাম না। বটুক বলল, এটা একটা নতুন পদ্ধতি, এর নাম ভারতীয় শিল্পকলায় চতুষ্কোণবাদ।
–এ নাম কে দিয়েছে?
স্টেলা ক্রামরীশ বলেছেন, এ হল ইণ্ডিয়ান কিউস্টিক ছবি। কিউবিস জানিস তো? বছর আট-দশ আগে একবার বার্লিন থেকে ক্যানডিস্কি আর জার্মান কিউবিস্টদের ছবি এনে সোসাইটিতে দেখানো হয়েছিল। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই চিত্রকরদের উদ্দেশ্য আর আদর্শের কথা বুঝে নিয়ে নিজস্ব ধ্যানধারণায় আর স্বকীয় পদ্ধতিতে এই নতুন চতুষ্কোণবাদের রূপ দিয়েছেন।
এর পরে সে কিউবিস্মের গোড়ার কথায় এল। সেখান থেকে ডাডাইস ইম্প্রেশনিস সুররিয়ালিস কত নূতন নূতন তথ্য। সুলেখার কাছে বোরিং হয়ে যাচ্ছে। মনে করে একসময় বলিজানিস দীপু, এই ঘরে ঠিক ঐ জায়গাটায় বছর পাঁচেক আগে একটা মজার কাণ্ড হয়। আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। সেবার বার্ষিক প্রদর্শনীতে গগনেন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন খানকতক কার্টুন ছবি। কার্টুন আঁকায় তিনি ওস্তাদ, তা তো জানিসই, একটা ছবি ছিল বিবাহ-বিশারদাঁ কুলীন বামুনদের আক্রমণ করে, একটা ছিল ইঙ্গবঙ্গ বাবুদের ব্যঙ্গ করে, আর একখানার ক্যাপশান ছিল পীস ডিক্লেয়ার্ড ইন দ্য পঞ্জাব। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের উপর। নরকঙ্কাল আর নরমুণ্ডে আকীর্ণ জালিয়ানওয়ালাবাগের মাঠ। দু-একটি বুড়ো শকুন ঝিমোচ্ছে। আর মড়ার খুলির পাহাড়ে শান্তভাবে অর্ধশয়ান ইংরাজশাসক ওডায়ার! তা সেবার বড়দিনে কলকাতায় এসেছিলেন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ড। বড়লাটকে প্রদর্শনীতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা হল। কেউ কেউ বললেন, পাঞ্জাবের উপর কার্টুনখানি সরিয়ে রাখলেই ভাল হয়। কিন্তু অবন-গগন তা মানবেন কেন? অগত্যা ছবিখানা থাকল যথাস্থানে। লর্ড চেমফোর্ড এলেন। প্রদর্শনীর বড়কর্তারা সঙ্গে সঙ্গে চলেছেন। ক্ষিতীনদা আছেন, স্যার আর. এন. আছেন, অতুল বসু ছিলেন, গগনেন্দ্রনাথ, ও. সি. গাঙ্গুলীরা ছিলেন–আর আমিও ছিলাম দলের সঙ্গে। স্টেলা। ক্রামরীশই প্রতিটি চিত্রের ইন্ট্রোডাকশান হিসাবে দু-চার কথা বলতে বলতে আসছিলেন। ব্যঙ্গচিত্রটির কাছে এসে তিনি নীরব হলেন। বড়লাট হয়তো খেয়াল করতেন না। ঐ নীরবতাই তার দৃষ্টিটা আকৃষ্ট করল দৃশ্যপটের দিকে। হঠাৎ যেন হোঁচট খেয়েছেন। বড়লাট। থমকে পিছিয়ে আসেন। ঘুরে দেখেন ক্রামরীশের দিকে। তিনি হেসে বলেন, –আই শ্যডন্ট, অফ কোর্স, ট্রাই টু অ্যানালাইস এ কার্টুন অ্যাণ্ড মার ইটস্ হিউমার! লাটবাহাদুর ঝুঁকে পড়ে দেখলেন চিত্রকরের স্বাক্ষর। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন নির্ভীক চিত্রকরও দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। মাথায় কাজ করা টুপি, গায়ে সিল্কের জোব্বা। উপযুক্ত খুড়োর উপযুক্ত ভাইপো। খুড়ো যদি অত বড় নাইটহুড ছাড়তে পারেন তবে ভাইপো একখানা ছোট্ট মতো কার্টুন ছাড়তে পারবেন না! সুলেখা দেবী বললেন, –চল, এবার ও-ঘরের ছবিগুলো দেখি।
চল। ওটা হচ্ছে ইণ্ডিয়ান আর্ট সেকশান।
কিন্তু সেদিকে অগ্রসর হতে গিয়েই বাধা পেলাম আমরা। মঁসিয়ে পল গগ্যা তার বিশাল বপু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দোরগোড়ায়। আমাদের দেখতে পেয়ে তার প্রকাণ্ড দেহটি বিনয়াবনত করে বলেন, কী সৌভাগ্য! একসঙ্গে ত্রিরত্ন! আর্টিস্ট, আর্ট সমঝদার আর আর্ট মডেল?
ভু দুটি কুঁচকে ওঠে সুলেখা দেবীর। গগ্যার ঐ প্রকাণ্ড দেহটাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে সে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। যেন গগ্যাকে সে দেখেনি। বটুক বলে, –দেখলি?
-আমি তো দেখলাম, কিন্তু উনি বোধ হয় আমার মত ক্ষীণদেহী নগণ্য জীবকে দেখতে পেলেন না।
না, আমি বলছি একজিবিশান দেখলি?
–তাও দেখলাম। চল, আবার দেখি তোদের সঙ্গে।
এই এক ফ্যাচাং জুটল। বটুক কিন্তু নির্বিকার। বেশ বুঝতে পারি বটুকের স্ত্রী বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু পথে-ঘাটে দেখা হলে বটুকই বা কি করবে? আমরা চারজনেই পাশের ঘরে ঢুকি। বটুক গগ্যাকে বলে, –এবার আমার একখানা ছবি প্রাইজ পেয়েছে।
–প্রাইজ পেয়েছে? কই, কোনখানা?
সুলেখার পোর্ট্রেটখানা।
–ও তো কনসোলেশান প্রাইজ। ও, ঐটার কথা বলছিস! আমি ভেবেছি কোন ছবি প্লেস পেয়েছে বুঝি?
সুলেখা দেবী ফস করে বলে বসেন, –আপনার ছবি কোন্ ঘরে আছে গগনবাবু?
