বটুক বললে, -কেমন হয়েছে বউ?
সুলেখা দেবী লজ্জা পেলেন। স্বামীর দিকে ফিরে বলেন, কথা বলার কি ছিরি! চোদ্দ বছর হয়ে গেছে মশাই-এখন কি আমি নতুন বউ?
বটুক তার কুতকুতে চোখ দুটো পিট পিট করে বলে, -চল্লিশ বছর পরেও তুমি নতুন বউ থাকবে! না কি বলিস দীপু?
আমি হেসে বলি, –তা জানি না, তবে এটুকু বলতে পারি পূজারিণী ছবিতে তুমি যদি কল্পনার আশ্রয় না নিতে তবে ভাল করতে।
একটু রাঙিয়ে ওঠেন সুলেখা দেবী। বলেন, বসুন, আমি ওদিকটা দেখি।
উনি আহারের আয়োজন করতে গেলেন। আমরা দুই বন্ধু গল্প করতে বসি। জিজ্ঞাসা করলাম, তুই এখন কি আঁকছিস?
বটুক মুখে জবাব দিল না। কাপড়ে মোড়া ক্যানভাসখানা খুলে চৌকির ও-প্রান্তে বসিয়ে দিল। বেশ বড় একখানা ক্যানভাস। ওর স্ত্রীর পোর্ট্রেট। মেয়েটি শুয়ে আছে খাটে-ঠিক শুয়ে নেই, অর্ধ-শয়ান। তার পিঠের নিচে একটা বালিশ, মাথার নিচে আর একটা। দুটি হাত মাথার উপর বেষ্টন করে আছে। পরিধানে একটা কল্কা পাড় বেনারসী শাড়ি। মাথার চুল খোলা বালিশের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে। ছবিটা অসমাপ্ত।
আমি বললাম, -এখানা খুব ভাল ছবি হবে। হয়তো পোর্ট্রেট সেকশানে প্রাইজ পাবে।
বটুক তার ছোট ছোট চোখ দুটি তীক্ষ্ণ করে বললে, আচ্ছা দীপু, এ ছবিতে তোর চোখে কোন কিছু বিসদৃশ লাগল? কোন অসঙ্গতি?
বিসদৃশ? কই, না তো! আমার বরং মনে হচ্ছে ঠিক এই পোজে আঁকা পোর্ট্রেট আরও কোথাও দেখেছি। কোন বিখ্যাত শিল্পীর ঠিক মনে আসছে না।
হ্যাঁ, গইয়ার। ছবিটার নাম ডাচেস অফ আলভা। মাদ্রিদে আছে। কিন্তু আনন্যাচারাল কোন কিছু লাগছে না তো?
আমি মাথা নেড়ে বললাম, কই, না!
–অথচ এই ছবিখানা নিয়েই গগ্যার উপর ভীষণ চটে গেছে বউ। ইন ফ্যাক আজ তাকেও নিমন্ত্রণ করতে চেয়েছিলাম আমি। বউ রাজী হল না। ও তাকে দুচোক্ষে দেখতে পারে না।
–তোর বউয়ের সঙ্গে গগ্যার আলাপ করিয়ে দিয়েছিস বুঝি?
-হ্যাঁ। ওকে একবার টেনে এনেছিলাম এখানে। তা সেই প্রথম দিন থেকেই ওকে । একেবারে শনির দৃষ্টিতে দেখছে সুলেখা। বলেছে, খবরদার তোমার বন্ধুকে আর বাড়িতে আনবে না।
আমি বলি, –গগ্যাটা যা ঠোঁটকাটা, কিছু বেঁফাস কথা বলে ফেলেছিল নিশ্চয়।
–তা ফেলেছিল। গগ্যাকে ছবিটা দেখাতেই বললে, -এ আবার কি রে? এমন পাটভাঙা বেনারসী পরে কেউ শুতে আসে? তাতে আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, ঐ আশ্লেষ-শয়নার ভঙ্গিতে যে আমন্ত্রণ আছে সে কি নিদ্রাদেবীর? ও তো প্রসাধন সেরে দয়িতের প্রতীক্ষা করছে। আর হতভাগা ফস করে বললে, তাহলে বেনারসী কেন বাবারিয়ালিসমের চূড়ান্তই কর না কেন? ন্যুডস্টাডি আঁক! তখন বউ ছিল পাশের। ঘরে। কথাটা তার কানে গেছে।
আমি বলি, -গগনের অন্যায় হয়েছে।
নয়? আর শুধু কি তাই! আমার সবগুলো ছবি দেখে বললে, -মটকু, তোর তো পয়সার অভাব নেই বাবা। তুই একটা ক্যামেরা কিনে ফে হতভাগাটাকে তুলি ধরতে শেখালাম আমি, আর সেই আমাকেই
খেতে বসেছিলাম আমরা ভিতরের একফালি বারান্দায়। একজন পাঁচক ব্রাহ্মণ পরিবেশন করছিল। সুলেখা দেবী একটা হাতপাখা নিয়ে বসেছিলেন একটু দূরে। বলি, কই, মাংসের হাঁড়িকাবাব কই? শুনেছি আপনি খুব ভাল হাঁড়িকাবাব বানাতে পারেন
আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বটুক বললে, দেখলে? আমি তখনই বলেছিলাম? তুমি বেশি পণ্ডিত্বেমি করলে?
ব্যাপার কি? একটু পরেই ব্যাপারটা বোঝা গেল। বামুনের জাত যাতে মারা না যায়, তাই বটুক একটি পাঁচক ব্রাহ্মণকে একদিনের জন্য ঠিকা নিয়েছে। রান্নায় হাত দেয়নি সুলেখা।
আমি বলি, –এটা উনিশ শো চব্বিশ সাল! আর আমি ডাক্তারমানুষ-অত জাতের পুতুপুতু নেই আমার। মাংসের হাঁড়িকাবাব কিন্তু আমার পাওনা থাকল সুলেখা দেবী!
সুলেখী দেবী বলেন, বেশ তো, আসছে রবিবার আসুন।
না, এবার আপনারা যাবেন আমার বাসায়। আমার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার আলাপ হয়নি এখনও।
আহারান্তে সুলেখা দেবীকে পরীক্ষা করলাম। মাঝে মাঝে ওর ফিট হয়। হজমেরও গণ্ডগোল আছে। জনান্তিকে বটুককে বলি, –ছেলেপুলে না হলে ওঁর এ ফিটের ব্যারাম সারবে না। মেয়ে-ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে।
বটুক ভিতরের দিকে নজর দিয়ে দেখল; তারপর নিম্নস্বরে বলল, –ওর পেটে একবার সন্তান এসেছিল। বাঁচেনি।
কতদিন আগে?
অনেক আগে। প্রায় চোদ্দ বছর।
একটু চমকে উঠি। চোদ্দ বছর হল বিয়ে হয়েছে ওদের। জিজ্ঞাসা করি, বিয়ের আগে থেকেই ওঁকে চিনতিস বুঝি?
বটুক সচকিত হয়ে বলে, –পরে তোকে সব বলব।
.
সে কাহিনী আর শোনা হয়নি তখন।
আরও মাস চার-পাঁচ পরে আবার ওদের সঙ্গে একদিন দেখা হয়ে গেল চৌরঙ্গীর উপর। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। হঠাৎ পিছন থেকে কে নাম ধরে ডাকছে শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি শ্রীমান বটুকেশ্বর। তিন-পিসের একেবারে কায়দা দূরস্ত বিলাতি সুট, হাতে ঘড়ি, মাথায় বাউলার হ্যাট। ওয়েস্টকোটের পকেটে রূপালি চেনে পকেট ঘড়ি।
কি হে ডাক্তারসাহেব? কোথায় চলেছ?
এতক্ষণে নজর হল বটুকের পাশেই যে মহিলাটি আছেন তিনি সুলেখা দেবী। সাজগোেজ তিনিও কম করেননি। বেনারসী শাড়ির আঁচলটা গেঁথেছেন জড়োয়া ব্রোচে, গায়ে পুরো-হাতা জ্যাকেট, পায়ে খুরওয়ালা জুতো-যা বাঙালী মেয়েরা পায়ে দিয়ে পথ চলতে সাহস পায় না। নমস্কার করে বলি, কী খবর? ভাল আছেন?
