দোকান ঘরের পিছন থেকে একখানা ক্যানভাস নিয়ে এল বটুক। ১৮x১২ মাপের ছবি। প্রথমটা মনে হল ক্রোম ইয়ালো, সিপিয়া আর কোবাল্টব্লুর বাটিতে ডুব দিয়ে তিনটে ইঁদুর ঐ ক্যানভাসটার উপর যৌথ নৃত্য করেছে। কিছুই বোঝা গেল না–ছবিটার বিষয়বস্তু কী। তারপর অনেকক্ষণ দেখতে দেখতে মনে হল–একটা খোলার চালের বস্তী। একটা চায়ের দোকান। একটা ছ্যাকড়া ঘোড়ার গাড়ি। পায়ের কাছে কাদা-মাখা ঘোলা জল, একটা ল্যাংটো বাচ্চা, আঁস্তাকুড়, আর এই সব কিছুর উপর দুটি খোলার চালের মাঝখানে আটকা পড়েছে একমুঠো নীল আকাশ। তাতে একটি মাত্র সূরযসাক্ষী নিঃসঙ্গ চিল। এমন ছবি আমি জীবনে দেখিনি একথা অনস্বীকার্য। এর আঙ্গিক, এর অঙ্কন-পদ্ধতি, এর ব্যঞ্জনা সবই নতুন। বলি, -এর মধ্যে সুন্দর কোন্টা?
বটুক বললে, ছবিতে সব সময় সুন্দর কিছু যে থাকতেই হবে তার মানে কি? আর ব্যাপক অর্থে যদি বলিস, তবে ঐ বস্তী পরিবেশের বাস্তব কদর্যতার মধ্যেই ওর সৌন্দর্য।
ব্যাপারটা কিছুই বোঝা গেল না। তাই প্রশ্ন করলাম অন্যদিক থেকে, –এই যদি সার্থক ছবি, তবে তুই এই স্টাইলে আঁকিস না কেন?
–তার একমাত্র কারণ আমি বটুক দেবনাথ, গগন পাল নই!
আমি বলি, কি জানি ভাই, আমার আর্ট সম্বন্ধে যেটুকু ধারণা আছে, তাতে এ ছবিকে কিছুতেই একটি সার্থক সৃষ্টি বলতে পারছি না। প্রথমত, ছবিটা অত্যন্ত তাড়াহুড়ো। করে আঁকা। আমার তো মনে হয় আধঘন্টার বেশি সময় লাগেনি। ফলে এটা সৌখীন মজদুরী। এর পিছনে দীর্ঘ সময়ের সাধনা নেই। দ্বিতীয়তঃ, এ বাচ্চা ছেলেটার গায়ের রঙ সবুজ কেন হল তার মাথা-মুণ্ডু বোঝা যাচ্ছে না। মহিষাসুর ছাড়া সবুজ রঙের মানুষের চেহারা কোথাও দেখিনি। তৃতীয়তঃ, সামনে এই কাদার মধ্যে ঘোলা জল যেটা জমে আছে সেটা কোন দুঃখে টকটকে লাল রঙের হল? চতুর্থতঃ, ঐ আঁস্তাকুড়টা বাদ দেওয়াই শোভন হত–বিশেষ করে ঐ মরা বেড়ালটাকে। ওটা ছবিটাকে বীভৎস করে। তুলেছে।
বটুক একদৃষ্টে ছবিটা দেখছিল। অনেকক্ষণ কোন জবাব দিল না। তারপর ধীরে ধীরে বললে, আমি তোর সঙ্গে একমত দীপু। ঠিক ঐ ত্রুটিগুলিই আমি দেখিয়েছিলাম। ছবিখানা প্রথম দেখে। গগ্যা তার নিজের ছবির সমালোচনা করে না। কিন্তু সেদিন সে মুডে ছিল। দুটি বোতল শেষ করে ভাম হয়ে বসেছিল ওর ছাপরায়? জবাবে কি বললে জানিস?
কি?
বললে, বাবা মটুকু, এ ছবির অর্থ তুমি বুঝবে না চাঁদু। এটি নিয়ে যাও। যত্ন করে রেখে দিও। অনেক টাকা ধার দিয়েছ আমাকে, পঞ্চাশ বছর পরে এই ছবিখানা সে ধার শোধ দেবে। যাও!–আমি বলেছিলাম, ওসব বাজে কথা শুনছি না। ছেলেটা সবুজ, জলটা লাল কেন হল বল্ আগে!-ও বললে, ছবিটা দেখতে হবে আমার চোখ দিয়ে। বাস্তবে কি ছিল জানতে হলে তো তার ফটো তুলতাম। এ তো ফটো নয়–এ হচ্ছে শিল্পীর চোখে দেখা বরানগরের চটকল বস্তী! মাইণ্ড দ্যাট! শিল্পীর চোখে দেখা। শিল্পী ঐ খণ্ডমুহূর্তে দেখেছিলেন ঐ ল্যাংটো ছেলেটার মধ্যে ভবিষ্যৎ তারুণ্যের বিদ্রোহ। তাই তার রঙ সবুজ। সবুজ হচ্ছে তারুণ্যের প্রতীক। শিল্পীর চোখে ওটা বস্তীর কাদা-গোলা জল নয়–বস্তীমজদুরের পাঁজর নিংড়ানো রক্ত! শিল্পী বলতে চান–তবুও এখানে আকাশ বন্দী হয়নি। মরা বেড়ালের ছানাটাই এখানে শেষ কথা নয়, তবুও আছে আকাশ! এ ছবির মানে বুঝতে হলে শিল্পী যে যন্ত্রণা ভোগ করেছেন সেই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাকে দেখতে হবে!সব কথা আমি বুঝতে পারিনি; তবু বলেছিলাম, –বেশ, তাহলে তোর নামটা লিখে দে। নিয়ে যাই। গগ্যা হেসে বলেছিল, –মটুকু কোথাকার! আমার স্বাক্ষর তো রয়েছে ছবিতে। দেখতে পাচ্ছিস না? ঐ একমুঠো আকাশের নিঃসঙ্গ চিলটাই আমার স্বাক্ষর।
সেদিন আমার কাছে সবটাই পাগলের প্রলাপ মনে হয়েছিল।
.
বটুকের নিমন্ত্রণ রাখতে গিয়েছিলাম।
ভবানীপুর অঞ্চলে যোগেশ মিত্র রোডে। দ্বিতল বাড়ি, তার একতলায় দুখানি ঘর ভাড়া নিয়ে বটুক বাস করে। দক্ষিণ-চাপা ঘর, বটুক অবশ্য তাতে দুঃখিত নয়দখিনা বাতাসের চেয়ে নর্থ-লাইটটাই নাকি তার বেশি প্রয়োজন। সরু গলির ভিতর। তা হোক, ট্রামের ঘড়ঘড়ানি নেই। মনের একাগ্রতা নষ্ট হয় না। বাইরের ঘরটাই ওর স্টুডিও। পাশে ওর শয়নকক্ষ। পিছনে একফালি বারান্দা। তার ও-প্রান্তে রান্নাঘর। উঠানের ওপাশে স্নানাগার–সেটা দ্বিতলবাসীর সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়।
বটুক আমাকে আপ্যায়ন করে বসালো। ঘরে মস্ত একটা চৌকি, প্রায় ঘরজোড়া। তার উপর ফরাস। চৌকির উপর একটা কাঠের ডেক্সাে। বটুক ছবি আঁকে ভারতীয় পদ্ধতিতে চৌকিতে বসে, টুলে বসে নয়। রঙ, তুলি, রঙের বাটি একপাশে সাজানো। আর্টিস্টের স্টুডিও বলতে যে অগোছালো ছবিটা মনে ভেসে ওঠে এ-ঘরের সঙ্গে তার সাদৃশ্য নেই। দেওয়ালে অসংখ্য তৈলচিত্র। ওপাশে থাক দেওয়া আছে আরও অনেক ক্যানভাস। ডেকের উপর একটি ছবি খবরের কাগজে ঢাকা দেওয়া।
আমি ঘুরে ঘুরে ছবিগুলি দেখলাম। প্রথম যুগে অনেক স্টিল-লাইফ ও নিসর্গচিত্রও সে এঁকেছে দেখছি। ইদানিং কালে সে শুরু করেছে নারীচিত্র আঁকতে। বোধহয় বিবাহের পর থেকে। তন্ময় হয়ে ছবিগুলি দেখছি, হঠাৎ পিছন থেকে শুনলাম নারীকণ্ঠে, নমস্কার!
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি শিল্পীর স্ত্রীকে। সুলেখা দেবী। বছর ত্রিশ-বত্রিশ বয়স হবে। বটুকের চেয়ে বছর পাঁচেকের ছোট। ওঁকে দেখেই বুঝতে পারি কেন বটুক য়ুরোপীয় পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছে। ভদ্রমহিলার দেহসৌষ্ঠব মোটেই বাঙালী মেয়ের মত নয়। লম্বায় বটুকের চেয়ে অন্তত চার আঙুলের বড়। অথচ সেজন্য শীর্ণকায়া মনে হয় না। তাকে। হয়তো সন্তান হয়নি বলেই দেহের বাঁধুনি এখনও অটুট। পীনোদ্ধত উরস ও গুরু নিতম্বের মাঝখানে মধ্যে-ক্ষামা কটিদেশ। রঙ কালো; কিন্তু এতটুকু কুঞ্চন নেই গাচর্মে। চোখ দুটি গভীর, চিবুকটা নিখুঁত এবং মাথার চুল অজস্র। মাথায় ঘোমটা ছিল, : কিন্তু খোঁপা ছিল না। ঘন কালো কোকড়ানো চুল পাতলা শাড়ির মধ্যে দিয়েও দেখা যাচ্ছে গুরু নিতম্বে আছড়ে পড়েছে।
