যেন অত্যন্ত গোপন একটি খবর জানাচ্ছেবটুকেশ্বর মুখটা আমার কানের কাছে সরিয়ে এনে বললে, সুলেখাকে মডেল করে ছবিখানা এঁকেছি বটে, তবে মুখটা ইচ্ছে করেই বদলেছি। না বলে দিলে কেউ বুঝতে পারবে না এটা সুলেখার চেহারা। আসলে ফিগারটা সুলেখার, মুখটা কাল্পনিক!
তবে আর ওটা বিক্রি করতে আপত্তি কিসের?
–ওর পিছনে একটা সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু আছে বলে। ছবিটা এবার একজিবিশানে যাবে নট ফর সেল মার্কা নিয়ে।
সুলেখার পোর্ট্রেট এঁকেছিস? কই, দেখি?
–আলেখ্য কেন দীপু, গোটা মানুষটিকেই দেখে এস না বাবা। ও তো প্রায়ই বলে কই, তোমার সেই ডাক্তার বন্ধু আসবেন বলেছিলেন, তা এলেন না তো। একবার তোকে দিয়ে ওকে দেখাতেও চাই। মাঝে মাঝে ফিট হচ্ছে আজকাল। হজমের গণ্ডগোল আছে, কন্সটিপেশন! তাছাড়া এতদিনেও ওর ছেলেপুলে হল না।
বটুকেশ্বর তার স্কেচবই বার করে দেখালো। ওর বউয়ের অনেক স্কেচ এঁকেছে, নানান গৃহকর্মে ব্যাপৃতা। রান্না করছে, তরকারি কুটছে, সেলাই করছে, বসে আছে বা শুয়ে আছে। পেনসিল, পেন-অ্যাণ্ড-ইঙ্ক, টেম্পারা এবং অয়েল। দু-চারখানা রঙিন ক্রেয়নে। বটুক ল্যাণ্ডস্কেপ আঁকে না, স্টিল লাইফও নয়, অধিকাংশ চিত্ৰই মানুষের, বরং বলা উচিত মেয়েমানুষের–আর সেই মেয়েমানুষ ওর মনের মানুষ। পাছে লোকে চিনে ফেলে বলে মুখটা শুধু বদলে দেয়। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পৌরাণিক বা মহাকাব্যের বিষয়বস্তু নিয়ে কেন সে কাল্পনিক ছবি আঁকে না। বললে, -মুশকিল কি জানিস, পৌরাণিক ছবি আঁকতে গেলে কোন স্টাইলে আঁকব? সুলেখাকে মডেল করে সীতার অগ্নিপরীক্ষা একখানা এঁকেছিলাম। সেটা দেখে অবনদা বললেন-বটুক, তোমার সীতা অগ্নিপরীক্ষায় পার পাবেন কিনা জানি না, কিন্তু আমাকে এ কোন্ অগ্নিপরীক্ষায় ফেললে তুমি?
–অবনদা মানে?
–অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছবিখানা জোড়াসাঁকোয় দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম।
–কেন, অবনীন্দ্রনাথ ও কথা কেন বললেন?
বটুক আমাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়। অবনীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, ক্ষিতীন্দ্র মজুমদার, নন্দলাল, অসিতকুমার ইত্যাদি পৌরাণিক বিষয়বস্তু নিয়ে অনেক ছবি এঁকেছেন ও আঁকছেন। তাদের একটা নতুন স্কুল হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় সেটা ভারতীয় চিত্রাদর্শ। অ্যানাটমি সেখানে বড় কথা নয়, বড় কথা ভাবের ব্যঞ্জনা। সাহিত্য পত্রিকায় এঁদের ক্রমাগত গালাগাল দিয়ে যাওয়া হচ্ছে বটে, কিন্তু দেশে-বিদেশে ক্রমে ক্রমে এই ধরনের ছবি সমাদর পাচ্ছে। অবনীন্দ্রনাথের বুদ্ধ ও সুজাতা, নির্বাসিত যক্ষ, যমুনাতটে রাধিকা, শিব-সীমন্তিনী; ক্ষিতীশ মজুমদারের রাসলীলা, শকুন্তলা, গঙ্গা; নন্দলালের– সতী, কৈকেয়ী, সাবিত্রী ও যম, গান্ধারী, কিংবা অসিতকুমারের রাসলীলা, অশোকবনে সীতা, শিব-পার্বতী সার্থক সৃষ্টি বলে স্বীকৃত হয়েছে। এসব ছবির কোথাও অ্যানাটমিকে পুরোপুরি মেনে চলা হয়নি। সুরেশ সমাজপতি তার সাহিত্যে এ জাতীয় ছবির কঠিন সমালোচনা করে চলেছেন। নন্দলালের মহাদেবের তাণ্ডবনৃত্যের সমালোচনায় লিখেছেন, মহাদেব কেন হাড়গিলার মত একপায়ে দাঁড়াইয়া আছেন, তাহা বুঝিলাম না। অবনীন্দ্রনাথের কাজরী চিত্রের প্রসঙ্গে লিখলেন, রমণীর প্যাকাটিবিনিন্দিত হাতের ত্রিভঙ্গিম ভঙ্গী। বটুকেশ্বর যে বছর ম্যাট্রিক পাস করে সেই বছরই অবনীন্দ্রনাথ সরকারী আর্ট স্কুলের সহ-অধ্যক্ষ হয়ে আসেন। আর্ট স্কুলে যখন পড়ছে তখন অবনীন্দ্রনাথের নূতন ভারতীয় ভাবাদর্শ সেখানে নবরূপ পরিগ্রহ করছিল। আর্ট স্কুলে তখন একটি পিকচার গ্যালারি ছিল। তাতে অতি সাধারণ স্তরের য়ুরোপীয় চিত্র ও ভাস্কর্যের নমুনা ছিল। আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষই ই. বি. হ্যাঁভেল এটা সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করলেন, তাতে সায় দিলেন সহ-অধ্যক্ষ অবনীন্দ্রনাথ। ওঁরা সম্পূর্ণ নূতন ভারতীয় আদর্শে আর্ট স্কুলকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন। কলকাতার বিশিষ্ট নাগরিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে আর্ট স্কুলের ছাত্রদল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ সংগ্রহশালা অবনীন্দ্রনাথ অপসারিত করিয়েছিলেন। ওরিয়েন্টাল আর্টের আসন নিরঙ্কুশ হল আর্ট স্কুলে। সুরেশ সমাজপতির শ্লেষাত্মক আক্রমণ সত্ত্বেও নৃতন ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত শিল্পীর দল এগিয়ে চললেন তাঁদের পথে। দেশে-বিদেশে ক্রমে ক্রমে স্বীকৃতি পেলেন তারা। ইতিমধ্যে আর্ট স্কুলে একটি সংগ্রহশালা খোলা হয়েছে। লর্ড কারমাইকেলের আমলে এই সংগ্রহশালার পারচেস কমিটিতে যাঁরা সভ্য হয়ে এলেন তারা সকলেই ভারতীয় ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত–মিস্টার মোলার এবং মিস্টার রুবেনসন নামে দুজন সুইডিশ শিল্পরসিক, মিঃ নর্মান ব্রান্ট, এ ছাড়া গগনেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ। স্যার জন উডরফ ছিলেন কমিটির সভাপতি এবং আর্ট স্কুলের নূতন অধ্যক্ষ মিঃ পার্সিব্রাউন ছিলেন সেক্রেটারী। এই সংগ্রহশালাতে নূতন চিন্তাধারায় যাঁরা ব্ৰতী তাদের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম স্থান পেতে শুরু করল। ওদিকে ইণ্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টও তখন জন্ম নিয়েছে। লর্ড কিচেনার তার পৃষ্ঠপোষক, স্যার জন উডরফ এবং বিচারপতি আশুতোষ চৌধুরীও ছিলেন। শিল্পী ও সি. গাঙ্গুলিও আছেন তার ভিতর; ফলে ওরিয়েন্টাল আর্টের জয়যাত্রায় বাধা পড়েনি।
