বটুক কী কথা বলতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গিয়েছিল, সেদিন তা বুঝিনি। সেটা বুঝতে পেয়েছিলাম অনেক অনেকদিন পরে।
সাতদিনের মাথায় ফিরে এলাম ঢাকায়। ইতিমধ্যে গগ্যা এসেছিল একদিন সেতারটা নিতে। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। আমি বাড়িতেই ছিলাম। চাকরের হাতে যন্ত্রটা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। গগ্যা চাকরটাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, আমি আছি কিনা। আছি শুনেও সে কিন্তু দেখা করতে চায়নি। সেতারটা নিয়ে ফিরে গিয়েছিল।
আমি কিন্তু বটুকের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। তার যুক্তির কোনও অর্থ হয় না। মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের দায় তাকে মেটাতে হবে। আর্টিস্ট হতে চাই বললে তার সাত-খুন মাপ হয় না। ঢাকাতে পৌঁছেই পরদিন গিয়ে দেখা করলাম শান্তি দেবীর সঙ্গে। দুপুরবেলাতেই গিয়েছিলাম, যাতে ছেলেমেয়েরা স্কুলে থাকে। সৌভাগ্যক্রমে ওঁর ফুলদাও বাড়ি ছিলেন না। এ কয়দিনে আরও যেন ভেঙে পড়েছেন শান্তি দেবী। চোখের কোলে কালি পড়েছে। মুখটা শুকিয়ে গেছে।
–আসুন ডাক্তারবাবু, কবে এলেন?
কালই এসেছি। শুনুন, গগ্যার সঙ্গে দেখা হয়েছে।
ক্লান্ত বিষণ্ণ দুটি দৃষ্টি মেলে বসে থাকেন শান্তি দেবী। যেন আমার বক্তব্যের প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই। একটু অবাক হতে হল আমাকে। এতটা অনীহার কারণ কি? যাইহোক, যা দেখেছি, যা বুঝেছিযা যা কথাবার্তা হয়েছে আনুপূর্বিক বলে গেলাম। দীর্ঘ সময় শান্তি দেবী কোন কথা বলেননি। ক্রমে ক্রমে তার উদাস দৃষ্টিতে স্বাভাবিকতা ফিরে এল। ওঁর চোখের তারায় ধীরে ধীরে ফুটে উঠল আগ্রহের রেশ। সব কথা শেষ হতে বললেন, ছবি আঁকতে চায়? আর কিছু না?
না। আর কিছু নয়। বারে বারেই সে বললে ঐ কথা। সে বুঝেছে, ছবি না এঁকে তার নিস্তার নেই। আর এখানে বসে বসে তার ছবি আঁকা হবে না।
হঠাৎ উঠে পড়েন উনি। বলেন, ডাক্তারবাবু, আপনাকে একটু কষ্ট দেব। আমাকে যা বললেন, সেই কথাগুলি আবার আপনাকে বলতে হবে বাবলুকে। কিছুই বাদ দেবেন না। সব কথা খুলে বলবেন।
–বেশ। বাবলু ফিরে আসুক স্কুল থেকে।
না। ও স্কুলে যায়নি আজ। পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে। আসুন, দেখুন।
পাশের ঘরের পর্দা সরিয়ে উনি দেখালেন। এ কী? বাবলু শুয়ে আছে চৌকির উপর; কিন্তু মাথায় একটা ব্যাণ্ডেজ বাঁধা।
-কি ব্যাপার? মাথা ফাটলো কেমন করে?
–স্কুলে মারামারি করে এসেছে। ফুলদার কল্যাণে সারা ঢাকা শহরে রটে গেছে আপনার বন্ধুর কাহিনী। স্কুলে কে বুঝি তাই নিয়ে বাবলুকে কি বলেছে, বাপের অপমান ছেলে সহ্য করেনি। মাথা ফাটিয়ে বাড়ি এসেছে। আপনি ওকে সব কথা খুলে বলুন। ওর জানা দরকার–ওর বাপ ব্যভিচারী নয়! আবার মনে হল, অদ্ভুত মেয়ে এই শান্তি দেবী।
০৯-১০. পাকাপাকিভাবে কলকাতাতে
ঢাকার বাস তুলে দিয়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতাতেই এসে বসলাম। প্রথম মাসকতক নিজেকে নিয়েই এত ব্যস্ত ছিলাম যে বটুক অথবা গগনের কোন খোঁজখবর নিতে পারিনি। গগনের সঙ্গে অবশ্য সম্পর্ক রাখবার আদৌ কোন ইচ্ছে আমার ছিল না, কিন্তু বটুকের সাদর আমন্ত্রণ রাখতে যাবার ইচ্ছে ছিল–নানান ঝঞ্ঝাটে ঘটে ওঠেনি। ক্রমে ভুলেই গিয়েছিলাম সেকথা। মনে পড়ল হঠাৎ একদিন মাসিক বসুমতীর পাতা ওলটাতে বসে। প্রথম পাতাতে যে ছবিটি ছাপা হয়েছে তার চিত্রকর-শ্ৰীবটুকেশ্বর দেবনাথ। ছবির ক্যাপসান–পূজারিণী। ফুলের সাজি ও নৈবেদ্যের থালা হাতে– একটি পূর্ণযৌবনা রমণী মন্দিরের ধাপ বেয়ে উপরে উঠছে। পশ্চাদপটে একটি পুকুর, নারকেল গাছ, রোমন্থনরত গাভি। মেয়েটির পরিধানে একটি ভিজে শাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। ফলে মন্দিরের বাতাবরণে একটা স্বর্গীয় ভাবের সঙ্গে আর্টিস্ট পার্থিব সৌন্দর্যকে সুন্দরভাবে মিলিয়ে দিতে পেরেছেন।
সেদিনই দেখা করতে গেলাম হগমার্কেটে। দোকানের ঠিকানা বটুক আগেই দিয়ে রেখেছিল। ছোট্ট দোকান। ছবি সবই বটুকেশ্বর দেবনাথের আঁকা। প্রতিটি ছবির দাম লেখা আছে ছবির নিচে। বটুক আমাকে দেখে খুশি হল। দোকানের টুলটা টেনে বসালো আমাকে। পাশের দোকান থেকে কেক আর চা এনে খাওয়ালো। বললে, এতদিন পরে অধমকে মনে পড়ল?
–পড়ত না। আজ মাসিক বসুমতীতে তোর ছবিখানা দেখে মনে হল আর্টিস্টকে কংগ্রাচুলেট করে আসা উচিত!
-কেমন লেগেছে? সুন্দর নয়?
–হ্যাঁ, চমৎকার হয়েছে। বিশেষ করে ব্যাকগ্রাউণ্ডটা।
–আরে দূর! আমি ছবিটার কথা বলছি না। বলছিলাম, সুলেখা সুন্দর নয়?
তার মানে? ঐ তোর বউ সুলেখা নাকি?
খুশিতে বটুকেশ্বরের চোখ দুটো মিটমিট করতে থাকে। ও বসেছিল কাউন্টারের ওপাশে একটা উঁচু টুলে। সেখানে বসে বসে পা নাচায় টুকটুক্ করে। বেঁটে মানুষটা টুলে বসে বেশ দোলনায় বসার আনন্দ লাভ করে। আমি বলি, –আরে সেকথা জানা থাকলে আরও ভাল করে মেয়েটাকে দেখতাম। আমি তো পূজারিণীকে দেখিনি, দেখেছি গোটা ছবিখানা।
বটুক তুরুক করে নেমে পড়ে টুল থেকে। বলে, -দেখ না যত খুশি!
র্যাকের নিচে থেকে টেনে বার করে অরিজিনালখানা। একটু দূরে বসিয়ে দেয় আলোর নিচে। নিজেও একটু দূরে সরে গিয়ে ঘাড় নেড়ে দেখতে থাকে।
বলি, বিক্রি করবি? কত দাম ধরেছিস?
না ভাই, এখানা নয়! সুলেখাকে কথা দেওয়া আছে।
আমি হো হো করে হেসে উঠি। বলি, –কেন রে? ভিজে কাপড় পরে আছে বলে? ও ছবি তো এখন ঘরে ঘরে। অত কনসার্ভেটিভ হলে এ ছবি আঁকবারই বা কি দরকার, আর সেটা মাসিকপত্রে ছাপানোরই বা কি দরকার?
