-খাস চিনেবাড়ির।
অপ্রীতিকর প্রসঙ্গটা এড়িয়ে বলি, –ছেলেমেয়ে কি?
-ছেলেপুলে হয়নি।
এখনও হয়নি? কতদিন বিয়ে করেছিস?
—ওঃ! সে অনেক দিন! তের-চোদ্দ বছর হয়ে গেছে।
অর্থাৎ সন্তান হওয়ার আশাও আর নেই। ঐ চিত্রগুলিই ওর সন্তান।
বটুক মনিব্যাগ খুলে একটা দশ টাকার নোট বাড়িয়ে ধরে গগ্যার দিকে, –নে ধর!
গগ্যা ছোঁ মেরে নোটটা নিয়ে আমার দিকে ফিরে বলে, –সেতারটা কাল পরশু গিয়ে নিয়ে আসব।
বটুক বলে, স্টিল লাইফটা শেষ করেছিস?
প্রশ্নটা গগ্যাকে। সে হাফ সার্টটা খুলে একটা পেরেকে ঝুলিয়ে রাখছিল। বিনা বাক্যব্যয়ে খাটিয়ার নিচে থেকে টেনে বার করল কাগজে জড়ানো ক্যানভাস। বটুক সেটা ঘরের এক কোণে রেখে সমঝদারের মত একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। ডাইনে-বাঁয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বললে, কিশু হয়নি। বললাম, ড্রইংটা আরও চালিয়ে যা। তা নয়, তুলি। ধরব। ওরে বাবা, এ এত সহজ নয়! বুঝলি? ড্রইংটা মসো না হলে কিছুই হবে না। গেলাসটা সিমেট্রিকাল হয়নি। সেন্ট্রাল লাইনের ডাইনে সরে গেছে। খাটিয়ার পায়াগুলো ভার্টিকাল নয়। দে, তুলি দে
ছবিটা ঘরের ভিতরেই এঁকেছে গগ্যা। খাটিয়ার একটা অংশ, একটা কলসি, একটা তালপাখা, একটা গেলাস। তেলরঙে আঁকা ক্যানভাস। রঙ ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া করে লেগেছে। কাঁচা হাতের আঁকা। ঠিকই বলেছে বটুক। গেলাসটা ঠিকমত আঁকা হয়নি। খাটিয়ার পায়াও বেঁকে গেছে।
খাটিয়ার নিচে থেকে প্যালেট আর তুলিটা নিয়ে বটুক এগিয়ে যেতেই ছবিখানা ছোঁ মেরে তুলে নিল গগ্যা। বললে, আমার ছবিতে মেরামত করতে হবে না তোকে। আর কিছু শেখাতেও হবে না। কিভাবে লিনসিড অয়েলে রঙ গুলতে হয় এটুকুই শিখতে চেয়েছিলাম তোর কাছে
–ওঃ! বাদবাকি তুই নিজেই শিখে নিবি? একলব্য হয়েছিস?
গগ্যা হাসল। বললে, –তাই হতে চাই রে মটুকু।
ফেরার পথে অনেকটা পথ বটুকের সঙ্গে এলাম। ও ভবানীপুরের দিকে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করেছে। দুটি তো মাত্র প্রাণী। দুখানি ঘর। কল ও স্নানাগার অপর একজন ভাড়াটের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। তাও মাসে বারো টাকা ভাড়া। বটুকের ইচ্ছে ছিল সেদিনই আমাকে ওর বাড়িতে নিয়ে যায়। আমি রাজী হতে পারি না। পরে একদিন যাব বলে পাশ কাটালাম। বলি, বটুক, তুই গগ্যাকে টাকা দিলি কেন? ধার?
ধার বলেই দিলাম। তবে শোধ পাবার আশা না রেখে। কি করব? একেবারে ধরে পড়েছিল।
–ওর সব কথা তুই জানিস? গগ্যা তার সতের বছরের বিয়ে করা বউকে ফেলে চলে এসেছে।
বটুক বললে, জানি! তাতেই তো শ্রদ্ধা হল ওর ওপর। ওর বুকের পাটা আছে।
আমি বললাম, বুকের পাটা যে আছে, সেটা ওর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বাঙালি ছেলের অমন চওড়া বুক আমি খুব কমই দেখেছি, কিন্তু সেটাই কি সব বটুক? বুকের পাটাটাই দেখলি তুই? কিন্তু ঐ বুকের ভিতর স্নেহ-ভালবাসা-মমতা কি একতিলও থাকতে নেই?
পথ চলছিলাম দুজনে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বটুক। বলে, দেখ দীপু, ওভাবে ওকে বিচার করিস না। ও হল আর্টিস্ট! ওর জাত আলাদা! তোর আমার মত সহজভাবে ওকে বিচার করা চলে না!
এবার আমিও দাঁড়িয়ে পড়ি। বলি, কী বলছিস তুই? গগ্যা আর্টিস্ট? ওর লাইন জ্ঞানই তো হয়নি এখনও। খাটিয়ার পায়াগুলো কিভাবে এঁকেছে দেখেছিলি?
-হ্যাঁ, ওর হাতটা এখনও আর্টিস্টের নয়; কিন্তু চোখ আর্টিস্টের। কতবড় দিল থাকলে তবে অমন গোছানো সংসার, নিশ্চিত রোজগারকে এভাবে ফেলেছেড়ে মানুষ ছবি আঁকবার উন্মাদনায় বস্তীতে এসে উঠতে পারে ভেবে দেখেছিস!
আমি বলি, কিন্তু বস্তীতে ওঠার কি প্রয়োজন ছিল ওর?
–সে তুমি বুঝবে না ডাক্তারসাহেব!
–কিন্তু তোকে তো ঘর সংসার ছেড়ে রাস্তাতে এসে বাস করতে হচ্ছে না?
–যে অর্থে গগ্যা আর্টিস্ট সে অর্থে আমি আর্টিস্ট নই–এ থেকে সেটাই প্রমাণ হয়। ব্যাপারটা তোকে বুঝিয়ে বলতে পারব না দীপু। আমি নিজেও বুঝিনি ঠিকমত। কিন্তু ওর চোখে আমি আগুন দেখেছি, সেখানে ভুল হয়নি আমার।
একটু থেমে আবার বলে কোম্পানির বাগানের সেই সন্ন্যাসীর কথা মনে আছে। দীপু? গগ্যাকে তিনি বলেছিলেন–তেরা বনৎ বনৎ বনি যাই! বিগড়ি বনৎ বনি যাই। মনে পড়ে?
কথাটার মানে কি রে?
-ওটা তুলসীদাসজীর একটা দোঁহার অপভ্রংশ। অর্থাৎ তোমার চেষ্টা করতে করতে হয়ে যাবে, ভুল করতে করতে ঠিক হয়ে যাবে!
বিশ বছর আগেকার ভবিষ্যদ্বাণী। আমার একটুও মনে ছিল না সেকথা। বটুক কিন্তু ভোলেনি। ঐ প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল আর একটি বন্ধুর কথা। প্রশ্ন করি
–হ্যাঁরে, চন্দ্রভানের খবর রাখিস?
–হ্যাঁ। চন্দ্রভান মারা গেছে।
মারা গেছে? ঈস্! কবে? কেমন করে?
চন্দ্রভান মরে জন্মেছে ভিন্সেন্ট ভান গর্গ! ধ্রুবানন্দের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। যবন কাহকা! চন্দ্রভান খ্রীষ্টান হয়ে গেছে।
আমি বলি, কিন্তু তোর সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী তো ফলেনি! তুই পাসও করেছিস। নামকরা আর্টিস্টও হয়েছিস। একশো টাকা দিয়ে তোর ছবি কিনছে লোকে–
বটুক কি একটা কথা বলতে গেল। বলল না কিন্তু শেষ পর্যন্ত। ম্লান হেসে বললে, কি জানি! হ্যাঁ, তা তো বটেই; আমি আর্টিস্ট হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছি। দেবী বীণাপাণির প্রসাদ পেয়েছি আমি! না, ধ্রুবানন্দ অগ্নিহোত্রীর ভবিষ্যদ্বাণী অন্তত আমার ক্ষেত্রে ফলেনি!
