–অর্থাৎ প্রফেসনাল আর্টিস্ট ও জিনিসটা বিলাতে আছে, এদেশে নেই। আর তাছাড়া ছবি এঁকে তুই নাম করতে পারবি তার স্থিরতা কোথায়?
-কে চাইছে নাম করতে? আমি যশের কাঙাল নই। আমি স্রেফ ছবি এঁকে যেতে চাই। সে ছবি কেউ দেখল কি দেখল না, সুখ্যাতি না কুখ্যাতি করল এ নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
আমি ধমক দিয়ে উঠি, –পাগলামিরও একটা মাত্রা থাকে গগ্যা। এ কী বলছিস তুই? পাঁচজনে দেখবে বলেই তো মানুষ ছবি আঁকে? না কি?
অন্তত আমি সেজন্য আঁকব না!
তবে কি জন্য আঁকবি?
–না এঁকে আমার নিস্তার নেই-তাই আঁকব।
–এ একটা কথা হল? মনে কর প্রশান্ত মহাসাগরের এক নির্জন দ্বীপে তোকে। নির্বাসন দেওয়া হল; সেখানে সভ্য মানুষ নেই। সেখানে কেউ তোর ছবি দেখবে না। তা সত্ত্বেও তুই সেখানে একা একা বসে ছবি আঁকতে পারিস?
গগন জবাব দিল না। জানলা দিয়ে আগুন-ঝরা বৈশাখী আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। দূর আকাশে পাক খাচ্ছে সূরযসাক্ষী একটা নিঃসঙ্গ চিল।
-কই, জবাব দিলি নে যে বড়?
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল গগ্যার। যেন স্বপ্নের ঘোরে বললে, তাহলে আমি আর কিছুই চাইব না রে দীপু! নারকেল গাছ ছাওয়া একটা নির্মল নিস্তরঙ্গ অ্যাটল ..দু-চারটে পাতায়-ছাওয়া কুঁড়েঘর…দু-চারজন উলঙ্গ আদিম আদিবাসী, যাদের ভাষা আমি বুঝি না, প্রখর সূর্যালোক, সবুজ বন…নীল আকাশ আর ধূসর সমুদ্র! উফ্!
আবেশে চোখ বুজল গগ্যা।
হেসে বলি, –ওসব রোমান্টিসিস কাব্যেই ভাল লাগে গগ্যা। বাস্তবে ও কল্পনাবিলাসের কোন অর্থ হয় না। ছবি আঁকতে চাস, তা ঢাকায় বসে আঁক না?
যেন বাস্তবেই ফিরে এল সে। বললে, ওখানে হবে না। ঝট দে!
-কেন হবে না? গগন, কিছু মনে করিস নে ভাই। ছবির বিষয়ে আমি কিছু কিছু বুঝি। দেবনারায়ণবাবুর ড্রইং ক্লাসে তোর চেয়ে আমি অথবা বটুক বরাবর বেশি নম্বর। পেতাম। তোর দ্বারা ওসব হবে না।
-মটুকুও তাই বলে; কিন্তু আমার উপায় নেই। আমাকে আঁকতে হবে। ছবি না এঁকে আমার নিস্তার নেই।
–মটুকু? মানে বটুক? বটুক কোথায় জানিস?
–জানি। হগসাহেবের বাজারে সে দোকান দিয়েছে। ভাল রোজগার করছে।
কিসের দোকান?
–ছবির।
ওকে আবার বলি, -গগ্যা, বটুকের ভাল রোজগার হচ্ছে বলে তোরও যে হবে এমন কোন কথা নেই। বটুক পাক্কা চার বছর আর্ট স্কুলে শিখেছে। সে পাস করা আর্টিস্ট। সে গোড়া থেকেই ঐ লাইনে লেগে ছিল। তোর বয়স চল্লিশ। এ বয়সে কি ছবি আঁকা শেখা যায়? না তা থেকে রোজগার করা যায়?
একগুঁয়ে গোঁয়ারটা জবাবে ঐ একই কথা বললে, –তা জানি না; কিন্তু ছবি আমাকে আঁকতেই হবে। ছবি না এঁকে আমার নিস্তার নেই। অগত্যা উঠে পড়ি। বলি, চলি তাহলে?
যাবি? তা যা।
–ও, ভাল কথা। শান্তি দেবী তোর সেতারটা আমাকে দিয়েছেন তোকে দিতে। সেটা আমার বাড়িতে আছে, তুই নিয়ে আসবি? না হলে আবার কষ্ট করে আমাকে
না না। তুই আবার কেন কষ্ট করবি? চল, এখনই চল, নিয়ে আসি।
কোন বিকার নেই। এই সেতার ফেরত দেওয়ার ভিতর যে তীব্র অভিমান আছে– এর ভিতর যে একটি কাব্য আছে এটা ওর যেন খেয়ালই হল না। সেতার সে বাজাতে ভালবাসে। সেতারটা সে ফেলে এসেছিল। এখন সেটা হাতে পাওয়া যাবে এতেই ও খুশি। পাথরে মাথা খুঁড়ছি জেনেও বললাম, -সেতারটার জন্য খুব অভাব বোধ করছিলি। নিশ্চয়। তোর বউ মনে করে।
গগন একটা হাফ সার্টের মধ্যে মাথা গলাচ্ছিল। জুতোটা পায়ে দিয়েছে এবার। ঐ অবস্থাতেই আমাকে বাধা দিয়ে ও বললে, –আরে ঝাঁট দে! সেতারের কথা এতদিন। মনেই ছিল না আমার। তুই বললি অমনি মনে পড়ল।
–তাহলে এখনই ছুটছিস কেন?
না হলে আজ রাতে খাব কি? বললাম না, পকেট একেবারে গড়ের মাঠ! ওটা সেকেণ্ড হ্যাঁণ্ডে আজই বেচে কিছু নগদ টাকা রোজগার করতে হবে। সিপিয়া আর আলট্রামেরিন রঙের টিউব দুটোও ফুরিয়েছে ও দুটোও কিনে আনব। কি হল, দাঁড়িয়ে পড়লি কেন? চল?
কেন যে হঠাৎ পথের উপর দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম তা আর ওকে বলিনি।
কিন্তু মোড়ের মাথাতেই দেখা হয়ে গেল অপ্রত্যাশিতভাবে আর একজন বন্ধুর সঙ্গে। বটুকেশ্বর দেবনাথ। উৎসাহের আতিশয্যে একেবারে জড়িয়ে ধরল আমাকে।
উঃ! কতদিন পর দেখা! চল চল ঘরে গিয়ে বসি। নে, সিগ্রেট খা।
অগত্যা আবার ফিরে গিয়ে বসি গগ্যার ছাপরায়। বটুকেশ্বর একনাগাড়ে কিছুটা বকবক করে চলে। হগমার্কেটে দোকান দিয়েছে সে। নানান জাতের ছবি আঁকে। গত তিন-চার বছর ধরে সরকারী চিত্রশালার বার্ষিক প্রদর্শনীতে তার ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রাইজ এখনও পায়নি, তবে গত বছর তার প্রদর্শিত তিনখানি ছবিই বিক্রি হয়েছে। বেশ ভাল দামে। একটি একশোয় এবং বাকি দুটি পঞ্চাশে। এবার সে একখানা বড় ছবি আঁকছে। পাঁচ বাই তিন। অয়েল কালার। বিষয়বস্তুটা কী, তা সে বলবে না; আমাকে দেখে বলতে হবে। আমার খোঁজ-খবরও নিল। ঢাকা ছেড়ে কলকাতা আসছি শুনে খুব খুশি হল; বললে, তোর পাকাপাকিভাবে কলকাতা আগমনে আমি পার্টি দেব। পোলাও আর মাংস। ওঃ! হাঁড়ি কাবাব যা বানায় সুলেখা! সিমপ্লি সুপার্ব!
সুলেখা? তোর বউ? বিয়ে করেছিস?
চোখ দুটি ছোট ছোট করে বটুক তাকায়, বলে, –তুই কী, ভেবেছিলি বটুকের কোনদিন বে হবে না? কেন? এই খানদানি বদনখানির জন্যে?
বটুকেশ্বর দেবনাথের উচ্চতা পাঁচ ফুট এক ইঞ্চি। গগ্যার বুকের কাছে তার মাথা। মাথাটা দেহের তুলনায় বড়, এবং সেই মাথা ভরা টাক! কন্দর্পকান্তি নয় বটুক–এটা সেও জানে, আমরাও জানি। কিন্তু তার সাজ-পোশাকের বাহার আছে। কোট-প্যান্ট-টুপি চড়িয়েই সে এসেছে এই বরাহনগরের বস্তীতে। পায়ে তার চঞ্চকে গ্লেসড কিড জুতো
