ওঁর এই গাম্ভীর্যে বিরক্তবোধ করি। হঠাৎ এই ভাব পরিবর্তনটাও কেমন যেন বিসদৃশ লাগে। তাই পুনরায় বলি, মিসেস্ পালকে একটু ডেকে দিন। শুনলাম গগন কী একটা বিশ্রী মামলায়
চোখ দুটি খুলে যায় ফুলদার। বিচিত্র হেসে বলেন, -কে বলেছে? বাবলু? ও জানে না।
কী হয়েছে বলুন তো?
উৎসাহে আবার উঠে বসেন। চোখ দুটি মিটমিট করে। বলেন, গগন সটকেছে।
-সটকেছে? তার মানে?
ইলোপমেন্ট কেস্ মশাই। নারী-ঘটিত ব্যাপার!
আমি তো স্তম্ভিত। লোকটা বলে কি! কিন্তু আমাকে কোন প্রশ্ন করতে দিলেন না উনি। পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে হাত বাড়ালেন আমার দিকে, –দিন, একটা বার্ডস আই ছাড়ুন। বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিয়ে দেখি–
এ আর ভিক্ষা নয়। রীতিমত উপার্জন। প্যাকেটটা বার করে দিলাম। একটি তুলে নিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরেন। প্যাকেটটা উনি নিজের কাছেই রাখলেন। বুদ্ধির গোড়ায় বোধকরি ভবিষ্যতে ধোঁয়া দিতে হবে ওঁকে।
বাধ্য হয়ে আলাপ চালিয়ে যেতে হল, কী বলছেন মশাই গগনের বয়স যে প্রায় চল্লিশ?
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে হাসি হাসি মুখে ফুলদা বলেন, এ কি সরকারী চাকরি ডাক্তারবাবু, যে বয়সের বাধা হবে? প্রেমে পড়ার আবার বয়স আছে নাকি? ওর তো সবে চল্লিশ। ষাট বছরের বুড়োও যে ঘাড় গুঁজড়ে পড়ে। যার যাতে মজে মন বুয়েছেন না?
আমার আদৌ বিশ্বাস হয়নি। বারো-তের বছরের ছেলে আছে ওর–পনের-ষোলো বছর বিবাহিত জীবনের পর গগন নারীহরণের মামলায় জড়িয়ে পড়বে, এ যে অবিশ্বাস্য! একটা ঢোক গিলে বলি, –মেয়েটি কে?
জ্বলন্ত সিগারেটের আগুনটার দিকে তাকিয়ে ফুলদা গম্ভীর হয়ে বলেন, –পুরো নামটা এখনও জানা যায়নি। তবে কতকগুলো ক্লু পেয়েছি যা থেকে অনেকগুলি সিদ্ধান্তে আসা গেছে। প্রথমতঃ, মেয়েটি বড়লোকের ঘরের; দ্বিতীয়তঃ, সে ছবি আঁকতে জানে; তৃতীয়ত, তার নামের আদ্য অক্ষর দুটি হচ্ছে জি. এস.।
এ যে রীতিমত গোয়েন্দা কাহিনী!
এই সময়ে এসে উপস্থিত হল গগনের দোকানের সেই কর্মচারী ছোকরা। প্রফুল্ল। রোদে রোদে ঘুরে বেচারির মুখচোখ লাল হয়ে উঠেছে। তাকে দেখতে পেয়েই ফুলদা নূতন করে উৎসাহিত হয়ে ওঠেন।
–এই যে প্রফুল্ল, তুমি এসে গেছ। কী খবর? অমলেন্দু সেনের বাড়ি গিয়েছিলে?, না, ইতস্ততঃ করার কিছু নেই। ডাক্তারবাবু আমাদের ঘরের লোক। তুমি অসঙ্কোচে সব কথা বলতে পার।
প্রফুল্ল কোঁচার খুঁটে মুখটা মুছতে মুছতে বললে, না, অমলেন্দুবাবুর বাড়িতে কিছুই হয়নি। তার মেয়ে গীতা বাড়িতেই আছে।
তুমি নিজে চোখে দেখেছ? না শুনে এলে?
না। গীতাই দরজা খুলে দিয়েছিল।
–আই সী! গীতা সেন নয় তাহলে? বেটাচ্ছেলে খুব ভোগাবে মনে হচ্ছে!
ফুলদা আবার চোখ দুটি বুজে খানিকক্ষণ কি যেন চিন্তা করেন। তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি নোটবই বার করে দেখে নিয়ে বলেন, বেশ, এবার তুমি একবার জীতেনবাবুর বাড়ি যাও। জীতেন সামন্ত। ওঁর মেয়ের নাম অবশ্য কমলা। তা হোক—
হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বলেন, –জি দিয়ে কোন ডাকনাম থাকতে পারে। তাছাড়া প্রেমিক-প্রেমিকা অনেক সময় আপোষে নিজেদের আদরের নাম রাখে, কি বলেন?
প্রফুল্ল খিঁচিয়ে ওঠে, আপনারা আর কাউকে পাঠান। আমার দ্বারা হবে না।
-কেন কেন? তোমার কি অসুবিধা হচ্ছে?
-অসুবিধা নয়? ওভাবে কি বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞাসা করা যায়–ওগো তোমাদের মেয়ে ভেগেছে কিনা একটু দেখে বলবে!
–আহা ওভাবে জিজ্ঞাসা করবে কেন? একটু ঘুরিয়ে
হঠাৎ ভিতরের দিক থেকে এবার দৃঢ় প্রতিবাদ শুনলাম, না! যাও প্রফুল্ল, তুমি বাড়ি যাও। আর কোথাও যেতে হবে না তোমাকে।
ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখি অন্দরমহলের দরজার পর্দা সরিয়ে শান্তি দেবী এসে দাঁড়িয়েছেন। সঙ্কোচে তার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারলাম না। ফুলদা রীতিমত ধমক দিয়ে ওঠেন, তুমি আবার কেন উঠে এলে শান্তি? তোমাকে বললাম না চুপচাপ শুয়ে থাকতে? যা করবার আমি করছি।
শান্তি দেবী এ কথার জবাব দিলেন না। প্রফুল্লকেই পুনরায় বললেন, তুমি যাও প্রফুল্ল। আজও দোকান খুলতে হবে না। কাল একবার এস সকালে। ডাক্তারবাবু কতক্ষণ এসেছেন?
এবার চোখ তুলে দেখতে হল। প্রফুল্ল চলে গেল। দশদিন আগে যে শান্তি দেবীকে চিনতাম এ মহিলার সঙ্গে তাঁর আকাশপাতাল তফাত। চুলগুলো রুক্ষ, চোখ দুটি টকটকে লাল। কিন্তু এখন অশ্রুর বাষ্পমাত্র নেই। বোধকরি এ কয়দিনে মনের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া সেরে নিয়েছেন তিনি। ভেঙে পড়লে তার চলবে না, এটা বুঝেছেন। সংসারের অর্থনৈতিক সমস্যাটা তার তত বড় নয়, আসল সমস্যা হচ্ছে লোকলজ্জা। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে, তবু এখনও তারা কিছু জানে না। কেমন করে খবরটা তাদের বলবেন? কেমন করে গোপনই বা করে রাখবেন? কতদিনই বা এই ফুলদার মোড়লি সহ্য করতে হবে?
–তুমি যদি আমার কথা না শোন শান্তি, তবে তো আমাকে এ ব্যাপারে হাত ধুয়ে ফেলতে হয়!
শান্তি দেবী ক্লান্ত বিষণ্ণ দুটি চোখে মিনতি মেলে চুপ করে বসে থাকেন। বুঝতে পারি কতদূর অসহায় হয়ে পড়েছেন উনি। ঐ পরগাছা ফুলদার ধমকও আজ তাকে মাথা পেতে মেনে নিতে হচ্ছে।
ফুলদা পুনরায় বলেন, তুমি আমাকে কলকাতায় যেতে দিলে না, না হলে ঠিক ঘাড় ধরে স্কাউলেটাকে নিয়ে আসতাম এখানে।
শান্তি দেবীর চোখ দুটি হঠাৎ দপ্ করে জ্বলে ওঠে। বলেন, –পথে-ঘাটে যদি তার দেখা পাও ফুলদা, তাহলে ও দুঃসাহস কর না। টুলের উপর না উঠলে ওর ঘাড়ের নাগাল তুমি পাবে না, সে কথা নয়–নিজের ঘাড়টার কথা খেয়াল রেখ!
