বোমার মত ফেটে পড়লেন ফুলদা, -ঈস! যা ভাবছ তা নয়! হোঁৎকা চেহারা হলেই শুধু চলে না। ছেলেবেলায় আমি স্যাণ্ডো করতাম, বুয়েছ! তাছাড়া এক্ষত্রে জোরটা হচ্ছে নৈতিক। ও স্কাউন্ড্রেলটা আমাকে দেখলে এখন ইঁদুরের গর্তে–
শান্তি দেবী আমার দিকে ফিরে বলেন, আপনাকে এ নোংরামির মধ্যে টেনে আনতে সত্যিই লজ্জা হচ্ছে ডাক্তারবাবু। তবু আমার অবস্থার কথা বিবেচনা করে আশা করি ক্ষমা করবেন। আপনি ওর বন্ধু হয়তো আপনি চেষ্টা করলে
সঙ্কোচে থেমে পড়েন মাঝপথেই। আমি বলি, আমার পক্ষে যেটুকু সম্ভব নিশ্চয়। করব; কিন্তু ব্যাপারটা কী, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারিনি!
শান্তি দেবী কোন সঙ্কোচ করেন না আর। মনকে শক্ত করে ধীরে ধীরে আদ্যোপান্ত ইতিহাসটা জানিয়ে দেন। যেন এ বিয়োগান্ত নাটকের নায়ক ও নায়িকা গগন আর শান্তি নয়দুটি অচেনা ছেলেমেয়ে। যেন মাসিক পত্রিকায় ছাপা একটা নিতান্ত জলো ছোটগল্পের কাহিনী উনি আমাকে শোনাচ্ছেন?
শান্তি দেবীর বাপেরবাড়ি যশোর। বাবা আছেন, মা আছেন। বাবা সম্পন্ন গৃহস্থ। তিনি বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন গগনের সঙ্গে। সেখানে এখনও শান্তি দেবী কিছুই জানাননি। জানিয়ে লাভ নেই কিছু। ওঁর বাপ বৃদ্ধ–ছোট ছোট ভাইবোনেরা আছে। তারা কী সাহায্য করতে পারে? এদিকে গগনের পৈতৃক পরিবারেরও কেউ নেই, যাকে জানানো যেতে পারে। সুতরাং নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে কোন সাহায্য তিনি প্রত্যাশা করেন না। আর অর্থনৈতিক সাহায্যের জন্য তাঁর অতটা মাথাব্যথা নেই। আসল সমস্যা হচ্ছে ব্যাপারটা কী, তাই ঠিক মত বুঝে নেওয়া। হঠাৎ এভাবে গগন সংসার ত্যাগ করে গেল কেন?
–কেন আবার? সেই মেয়েটা! জি. এস.! মাঝখানেই ফোড়ন কাটেন ফুলদা।
সে কথায় কান দিলেন না শান্তি দেবী। আমিও উপেক্ষা করলাম মন্তব্যটা। বস্তুত মিসেস পালের সহজ-স্বাভাবিক বিশ্লেষণে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি। এতবড় আঘাতটা কি অপরিসীম উদাসীনতায় গ্রহণ করেছেন তিনি। বেশ বুঝতে পারছি মর্মান্তিক অপমানে, অবর্ণনীয় অভিমানে তাঁর অন্তঃকরণ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। অনেকটা দমে গেছেন তিনি, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। না হলে অন্তত এরপর আঁচল খুলে একটি আনি বার করে তিনি তাঁর ফুলদাকে একটি দেশলাই কিনে আনতে বলতেন; কিন্তু সে মনের জোর আজ আর তার নেই। তবু ভেঙে পড়েননি। শান্তি দেবী শুধু শিক্ষিতাই নন, সত্যিকারের আধুনিকা। শ্রদ্ধায় আমার অন্তঃকরণ আপ্লুত হয়ে গেল। বলি, যাবার আগে কোন চিঠিপত্র লিখে রেখে গেছে?
না। চিঠিপত্র কিছুই সে লিখে রেখে যায়নি। গৃহত্যাগের দিনও যথারীতি সকালে দুটো নাকে-মুখে গুঁজে দোকানে গিয়েছিল। দোকানে বসেনি কিন্তু। প্রফুল্লকে সে বলেছিল, হঠাৎ বিশেষ প্রয়োজনে তাকে বাইরে যেতে হচ্ছে, কবে ফিরবে তার স্থিরতা নেই। কোথায় যাচ্ছে, তা বলেনি। দোকানের ক্যাস থেকে বত্রিশটা টাকা সে নিয়ে গেছে। বাড়িতে কাউকে কিছু বলেনি। রাত্রে সে না ফেরায় এঁরা উদ্বিগ্ন হলেন। দাঙ্গা-জনিত কারণে এখানে-ওখানে মাঝে মাঝে খুন-জখম হচ্ছে। তাই রাত্রেই শান্তি দেবী বাবলুকে পাঠিয়েছিলেন প্রফুল্লর বাড়িতে। বাবলুই খবর নিয়ে আসে, গগন হঠাৎ কোথায় চলে গেছে। পরদিন প্রফুল্ল এসে সব কথা জানালো। বাবু কোথায় গেছেন, কেন গেছেন কিছুই সে জানে না। শান্তি দেবী স্তম্ভিত হয়ে যান। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন গগন একটি ক্যাম্বিসের ব্যাগ নিয়ে গেছে, তাতে নিয়েছে খানকতক ধুতি-জামা। আর দু-একটা টুকিটাকি। মায় তার দাড়ি কামানোর ক্ষুরটা পর্যন্ত নিয়ে যায়নি। আলমারি খুলে দেখেন টাকাপত্র সে কিছুই নিয়ে যায়নি। সবচেয়ে মজার কথা, গগনের একটা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল–শান্তি দেবী লক্ষ্য করে দেখেন তার চেক বইতে গগন প্রতিটি পৃষ্ঠায় তারিখহীন স্বাক্ষর রেখে গেছে।
আমি বলি, কিন্তু এ পর্যন্ত যা বলেছেন, তা থেকে তো আমার মনে হচ্ছে না যে, এর পেছনে নারী-ঘটিত কোন ব্যাপার আছে।
এই প্রথম লক্ষ্য করলাম শান্তি দেবী লজ্জা পেয়েছেন। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে উনি নীরবই রইলো এবং সেই নীরবতার সুযোগ গ্রহণ করে আসরে এতক্ষণে অবতীর্ণ হলেন তাঁর ফুলদা; বলেন, তার কারণ শান্তি সব কথা গুছিয়ে বলতে পারছে না। আমি আপনাকে কি কি বলেছি ডাক্তারবাবু? গগন যে ঘুড়ির প্রেমে পড়েছে।
শান্তি দেবী উঠে গেলেন। যাবার সময় একটা আতো কৈফিয়ৎ ফেলে রেখে গেলেন স্থানত্যাগের। বললেন, –একটু চা করে আনি।
চায়ের প্রয়োজন ছিল না। এই মারাত্মক অবস্থায় চা-পানের সৌজন্যও নিষ্প্রয়োজন; কিন্তু শান্তি দেবীর অন্তরালে যাওয়ার অছিলাটাকে উড়িয়ে দিতে পারলাম না। ফুলদাকে সাড়ম্বরে সায় দিলেন, হ্যাঁ, বেশ কড়া দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এস বরং। আসুন ডাক্তারবাবু, ততক্ষণ বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিন।
সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটি বাড়িয়ে ধরেন ফের।
-কি বলছিলাম যেন? ও হ্যাঁ, গগন যে মাগীর প্রেমে পড়েছে তার সম্বন্ধে আমি কি কি বলেছি। প্রথম কথা মেয়েটি বড়লোকর ঘরের; দ্বিতীয়তঃ, সে ছবি আঁকতে পারে; তিন নম্বর তার নামের আদ্যক্ষর হচ্ছে–জি. এস.! এই তো? শুনুন এবার।
ফুলদা আকৈশোর গোয়েন্দা গল্প পড়েছেন। অপরাধ-বিজ্ঞান জিনিসটা তাঁর। নখদর্পণে। এতদিন এ বাড়ির সকলের সম্মিলিত ধমকে ছাইচাপা আগুনটা কারও নজরে পড়েনি। এখন তিনি স্বয়ংপ্রকাশ। বাড়ির কর্তা অন্তর্হিত হওয়ার পরেই উনি উঠে-পড়ে লেগেছেন। সমস্ত বাড়িটা সার্চ করেছেন। বাড়িতে অবশ্য কোন প্রেমপত্র-ফত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে দোকানে। প্রফুল্ল ছোঁড়া কিছুই জানে না। ও কী বুঝবে এসব ঘোরপ্যাঁচের? গগন সাড়ে নটার মধ্যে নাকে-মুখে খেয়ে দোকান যাচ্ছি বলে রওনা হত, আর দোকানে গিয়ে পৌঁছাত কখনও বিকেল চারটেয়, কখনও পাঁচটায়। তাহলে সারাটা দুপুর সে থাকে কোথায়? করে কি? যদি বল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে গিয়ে বই পড়ে, তাহলে প্রশ্ন হবে-বইটা দোকানে নিয়ে এসে পড়লেই চলে। যদি বল, নির্জনে গিয়ে সাধন-ভজন করে, তাহলে জিজ্ঞাসা করব বাড়ি কি দোষ করল? তোর বউ যায় মেয়ে ঠেঙাতে, ছেলে-মেয়ে ইস্কুলে বাড়ির চেয়ে তোর নির্জন জায়গা কোথায়? ফুলদা সুতরাং সিদ্ধান্তে এসেছেন–ব্যাপারটা তাহলে নিষিদ্ধ কোন কিছু আছে। কী হতে পারে? হয় প্রেম, নয় বোমাবাজি। মাত্র কমাস আগে পার্ক স্ট্রীট আর চৌরঙ্গীর মোড়ে বিপ্লবী গোপীনাথ সাহা টেগার্টভ্রমে একজন ইংরজেকে গুলি করে মেরেছে। দেশের আকাশ বাতাসে তারই গোপন অনুরণন। ফুলদার প্রথম সন্দেহ হয়েছিল বিপ্লবীদের সঙ্গে গগনের যোগাযোগ আছে। কিন্তু দোকানখানা তল্লাসী করে ব্যাপারটা জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। দোকানের এক গোপন দেরাজ থেকে বার হল একগাদা ছবি। হাতে আঁকা ছবি, পেনসিলে, কলমে অথবা লাল নীল রঙিন পেনসিলে আঁকা ছবি। সব জাতের ছবিই আছে। মাঠ-ঘাট, ফুল-গাছ, মেয়ে-মদ্দ। সব ছবির নিচেই লেখা আছে–টু পল গগা, উইথ লাভ ফ্রম জি. এস.। আর আছে তারিখ। গত তিন-চার মাসের। ফলে ব্যাপারটা স্পষ্টই বোঝা গেল। প্রফুল্লকে চেপে ধরলেন ফুলদা। ছোঁড়া শেষ-মেষ স্বীকার করে ফেলল–ছবির কথা যদিও সে জানে না, তবে বাবু যাবার আগে একটা ঠিকানা দিয়ে গেছেন। বলেছেন, তাঁর অবর্তমানে অনেক পাইকার এসে হয়তো মিথ্যা বিল পাঠাবে, দোকানের নামে। সে-ক্ষেত্রে প্রফুল্ল যেন ওর সঙ্গে পত্রালাপ করে এই ঠিকানায়।
