প্রায় মাসখানেক পরের কথা। একদিন বাজারে দেখা হয়ে গেল শান্তি দেবীর ফুলদার সঙ্গে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে বলেন, ডাক্তারবাবু না? কই, আর তো আসেন না আপনি? কেমন আছেন?
সৌজন্যবোধে বলতে হল, –ভাল আছি। ওঁরা কেমন আছেন প্রশ্ন করা মাত্র ফুলদা যেন লাফিয়ে ওঠেন, –আমাদের কথা আর বলবেন না ডাক্তারবাবু। গগনটা তো মানুষ নয়, চামার! কোথায় কোথায় ঘোরে পাত্তাই পাওয়া যায় না। ছেলেমেয়েগুলোও হয়েছে। তেমনি। শিক্ষার বালাই নেই। আমি হলাম গিয়ে তোদের মামা, তা আমাকেও ছেড়ে কথা বলে না। ফুলমামা বাজার থেকে ফেরার সময় একটা খাতা কিনে এন, ফুলমামা আমার জন্য একটা লাল ফিতে কিনে এন। কেন রে বাবা? আমি কি তোদের খানাবাড়ির চাকর? আসল কথা কি জানেন–আসলে মায়ের শাসন না থাকলে ছেলেমেয়েগুলো কখনও মানুষ হয়? নিজের বোন হলে কি হয় ওর নাম শান্তি নয়, অশান্তি হওয়া উচিত—
বাধা দিয়ে বলি, -শান্তি দেবী আপনার নিজের বোন?
না, নিজের বোন নয়। মামাতো বোন। তাও দূর সম্পর্কের মামা নয়, ওর বাবা হল আমার মায়ের আপন পিসতুতো ভাই। একান্নবর্তী পরিবারে মানুষ কিনা।
পিসতুতো ভাইয়ের আপন পিসতুতো বোন? সম্পর্কটা ঠিক বোধগম্য হল না। একান্নবর্তী সংসারটা কার ছিল? কার অন্ন কে ধ্বংস করত? তা অতীতের সে কথা বোঝা না গেলেও বর্তমানটা বেশ পরিষ্কার। বর্তমানে ফুলদা ঐ শান্তি দেবীর অন্ন ধ্বংস করে থাকেন এবং তিনি যে বাজার-সরকার নন এটা প্রমাণ দিতে তিনি উদগ্রীব।
পাশ কাটাবার জন্য বলি, আচ্ছা, চলি ফুলদা।
যাবেন? তা যাবেন বৈকি। আপনারা হলেন কাজের মানুষ। পথের মধ্যে দাঁড়িয়ে দুদণ্ড কথা বলারই বা সময় কই আপনার। তবে একটা কথা। আমি যে শান্তির নামে আপনাকে এসব কথা বলেছি তা যেন ওকে বলবেন না। ভারি অভিমানী মেয়ে তো!
ভয়ও করে তাহলে। করবে নাই বা কেন? বেকার মানুষটার ঐ তো একমাত্র ভরসাস্থল। পিসতুতো মামার মাসতুত বোনের কী একটা ক্ষীণ সম্পর্ক ধরে দুনিয়াদারী করতে হচ্ছে বেচারিকে। সর্বক্ষণই তাই সে কাঁটা হয়ে থাকে। হয়তো পদে পদে তাকে ধমক খেতে হয় কর্তার কাছে, গিন্নির কাছে, মায় ছেলেমেয়েদের কাছে।
-ডাক্তারবাবু!
আবার ফিরতে হল। একটু ইতস্ততঃ করে ফুলদা আবার বলেন, আপনার কাছে একটা টাকা হবে ডাক্তারবাবু? একখানা খাতা আর ফিতে নিয়ে যেতে বলেছিল ওরা, অথচ বাজার করতে সব ফুরিয়ে গেল।
বুঝতে পারি ফুলদার অবস্থা। আহার এবং আশ্রয় জুটেছে। হাত-খরচটাই সমস্যা। একটা আধুলি বার করে দিলাম। ফুলদা তৎক্ষণাৎ জানিয়ে দিলেন পরদিনই তিনি সকাল বেলায় এসে ধারটা শোধ করে যাবেন।
ভেবেছিলাম ঢাকা ছেড়ে চলে যাবার আগে শান্তি দেবীর সঙ্গে একবার দেখা করে যাব। গগন নয়, তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আসব। বাঁধাছাদা এবং নানান বৈষয়িক ব্যাপারে ব্যাপৃত থাকার সময় করে উঠতে পারিনি। হঠাৎ একদিন সকালে তার স্কুলে যাবার পথে গগ্যার ছেলে এসে হাজির। এবার আর হাতচিঠি নিয়ে আসেনি, মুখেই বললে, -মা আপনাকে একবার যেতে বলেছেন।
বললাম, হ্যাঁ যাব, দু-একদিনের মধ্যেই। আমি ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছি বাবলু। আর হয়তো তোমাদের সঙ্গে দেখাই হবে না কোনদিন।
বাবলুর তাতে কোন ভাবান্তর হল না। বললে, না, দু-একদিন পরে নয়, মা এখনই একবার আপনাকে যেতে বলেছেন।
-কেন? কারও অসুখ করেছে নাকি?
বাবলু মুখটা নীচু করে নখ খুঁটতে খুঁটতে বললে, না, অসুখ নয়। বাবা হঠাৎ দিন চারেক আগে কলকাতা চলে গেছেন। কী একটা বিশ্রী মামলা বেধেছে। আমি ঠিক জানি, না। আপনি এখনই একবার আসুন ডাক্তারকাকু।
–এখনই? কিন্তু এখন তো তোমার মা স্কুলে যাবেন?
না, মা আজ কদিন স্কুলে যাচ্ছে না। ছুটি নিয়েছেন।
–তোমার ফুলমামা কোথায়?
বাড়িতেই আছেন। ফুলমামাও কলকাতায় যেতে চেয়েছিলেন, মা যেতে দেননি। ঐ বাবার ব্যাপারে
হঠাৎ মাঝপথেই থেমে গেল বাবলু। অবাক হয়ে দেখি, ওর দুটি চোখ জলে ভরে উঠেছে। ব্যাপার কি? কিসের মামলায় জড়িয়ে পড়ল গগন? বাবলু আমার দিকে পিছন ফিরে চোখ দুটি মুছে নেয়। আর লজ্জা লুকাতে তখনই সাইকেলে চেপে রওনা হয়ে পড়ে। আমিও দোকান তালাবন্ধ করে পুরানো পল্টনের দিকে যাত্রা করি।
ওদের বাড়িতে গিয়ে যা শুনলাম তা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। ঘরে ঢুকতে প্রথমে দেখা হয়ে গেল ফুলদার সঙ্গে। আজ আর তাঁর সেই সাবেকি গোরুচোরের ভঙ্গি নয়। ক্যাম্বিসের ইজিচেয়ারে অর্ধশয়ান হয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে কী যেন গভীরভাবে চিন্তা করছিলেন তিনি। আমাকে দেখতে পেয়ে দগ্ধাবশেষ বিড়িটায় একটা অন্তিম সুখটান দিয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন জানলা পার করে।
আসুন, আসুন ডাক্তারবাবু, বসুন।
আমি বেতের একটা মোড়া টেনে নিয়ে ভাল করে বসতে না বসতেই একেবারে ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকে। যেন অত্যন্ত গোপন কোন কথা হচ্ছে এভাবে প্রায় আমার কানে কানে বলেন, -গগনের সঙ্গে আপনার শেষ কবে দেখা হয়েছে?
দিন দশেক আগে। মিসেস পাল কোথায়?
–ও, দশদিন আগে?-ফুলদা আবার লম্বমান হয়ে পড়েন ইজিচেয়ারে। আমার প্রশ্নটা ওঁর কানে যায়নি। আবার গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন উনি। চোখ দুটি বুজে যায়। বাঁ হাতের তর্জনী দিয়ে কপালে ধীরে ধীরে টোকা মারতে থাকেন।
