গৃহকর্তা বলে যাকে প্রথমটা ভুল করেছিলাম দেখা গেল তিনি গৃহকর্তীর ফুলদা। ঝোলা গোঁফ, গলার কণ্ঠীটা কথা বলার সময় নড়তে থাকে, মাথায় পরিপাটি টেরি। তিনি অযাচিত কয়েকটি মন্তব্য করলেন। আমাকে ইনজেকশান দেওয়ার পরামর্শ দিলেন, এবং পথ্য সম্বন্ধে একটা মন্তব্য করবার চেষ্টা করতেই গৃহকত্রী তাঁকে বললেন, তুমি একটু বাইরে নজর রাখ ফুলদা, ওঁর সাইকেলটা নিয়ে কেউ না পালায়।
ফুলদা অতঃপর আমার সাইকেলটাই পাহারা দিলেন। ঔষধ-নির্দেশ ভদ্রমহিলাকেই দিতে হল। ভিজিটও তিনি দিলেন এবং রোগী দেখার পর সেই কিশোর ছেলেটি আমার পিছন পিছন ডাক্তারখানায় এল, এবং ওষুধটা সার্ভ করিয়ে নিয়ে গেল।
গৃহস্বামীর সাক্ষাৎ পাইনি। ভদ্রমহিলার সিঁথিতে নির্দেশ ছিল তিনি কোথাও না কোথাও আছেন। সম্ভবত ঢাকায় নেই-নাহলে সেকথা উঠত। ওঁরা সে প্রসঙ্গ যখন তুললেন না তখন আমিও তা তুলিনি। বস্তুত প্রথমদিন সেকথা আমার মনেই পড়েনি। পড়েছিল পরে। চার-পাঁচ বার ওবাড়িতে যেতে হয়েছিল আমাকে। কোনবারই গৃহস্বামীর সাক্ষাৎ পাইনি। কিন্তু নেপথ্যচারী গৃহস্বামীর উল্লেখ কেউ না করায় সৌজন্যবোধে আমিও কোনদিন ও-প্রশ্ন করিনি। করতে হল কদিন পরে। মেয়েটি ভাল হয়ে যাবার পর আবার একদিন সেই কিশোর ছেলেটি আমাকে আমন্ত্রণ করতে এল– সান্ধ্য চায়ের নিমন্ত্রণ। প্রশ্ন করলাম, হঠাৎ চায়ের নিমন্ত্রণ?
-মিষ্টি ভাল হয়ে উঠেছে কিনা, তাই মা সত্যনারায়ণ করেছেন।
–চা দিয়ে সত্যনারায়ণের সেবা হয় নাকি?
–ছেলেটি হাসল। জিজ্ঞাসা করি, তোমার নামটি কি?
–শ্রীরাধাগোবিন্দ পাল। ডাকনাম বাবলু।
সত্যনারায়ণের সির্নীর সঙ্গে গোকুল পিঠে, চন্দ্রপুলি, কড়াই শুটির কচুরি ও চা এল।
সেদিন প্রশ্ন করেছিলাম, মিস্টার পাল কোথায়?
শান্তি দেবীকে জবাব দিতে হয়নি। তাঁর ফুলদা আগ বাড়িয়ে বলে ওঠেন, সে গেছে দোকানে। সেই সক্কাল বেলা যায় দোকানে, আর ফিরতে যার নাম সেই রাত দশটা। মস্ত দোকান দিয়েছে যে ভায়া! দেখেননি? শান্তি স্টোরস-ঐ রমনার দিকে!
শান্তি দেবী বললেন, ফুলদা, একটা দেশলাই কিনে আন না!
আঁচল খুলে একটি একানি বার করে দিলেন তিনি।
ফুলদা বেজার হলেন; কিন্তু যেতে হল। এই ফুলদা ব্যক্তিটি সংসারে নিতান্ত উদ্বৃত্ত, এবং শান্তি দেবী তাকে আমার দৃষ্টির আড়ালে রাখতে চান। তাছাড়া হঠাৎ এখন দেশলাই কেনার এমন জরুরী প্রয়োজন কি হল তা বুঝে উঠতে পারিনি। শান্তি দেবীর কাছেই শুনলাম পালমশাই রমনার দিকে একটি মনিহারী দোকান দিয়েছেন। রমনা অঞ্চলে দ্রুতহারে হাল-ফেশানের নতুন নতুন বাড়ি উঠছে। দুদিনেই এলাকাটা জমজমাট হয়ে উঠবে। এই সুযোগে একটি দোকান খুলে বসেছেন মিস্টার পাল। আখেরে কাজ দেবে সেটা। তখনও কল্পনা করতে পারিনি, এই দোকানদারই আমার সহপাঠী সেই ঝাঁটদেনেওয়ালা গগন পাল।
সেদিনই ওঁর টেবিলের উপর একটা মাসিক পত্রিকা দেখেছিলাম। সেটা তুলে নিয়ে বলি, –প্রগতি? এটা কি ঢাকা থেকে বের হয়?
–বের হয় নয়; বের হল! ওটাই প্রথম সংখ্যা। খবর পাননি?
না, সাহিত্য আলোচনা করবার আর অবকাশ কোথায় আমার? আমি তো নিতান্ত ডাক্তার মানুষ। তবে এককালে খুব ঝোঁক ছিল।
আসুন না আমাদের প্রগতিতে। আসবেন?
বলি, আপনার ঘরে তিনজন দিকপাল সাহিত্যিকের ছবি দেখেই বুঝতে পেরেছি। আপনি সাহিত্যরসিকা; কিন্তু আমার কি সময় হবে?
শান্তি দেবী বিচিত্র হেসে বলেছিলেন, সময়ের অভাবটা উপলক্ষ-আসল কথা ইচ্ছেটা।
বলি, -দেখি, সুযোগ সুবিধা হয় তো–
আরও মাস তিনেক পরের কথা। মনে আছে সেটা চৈত্র মাস। বাবলু এসে আমাকে একটি হাতে-লেখা নিমন্ত্রণ-চিঠি দিয়ে গেল। মুক্তোর মত ঝরঝরে হাতের লেখা। বাবলুর মা আমাকে নিমন্ত্রণ করেছেন–ওঁর বাড়িতে সন্ধ্যায় একটি সাহিত্যবাসর হবে। তাতে যোগদানের জন্য।
আমি তখন সিউডো ব্যাচিলর। তোমার দিদিমা তখন কলকাতায় কল্যাণী অথবা খোকা সেবার হবে। সন্ধ্যার পর আমার অখণ্ড অবসর। শেষ রুগীটিকে বিদায় দিয়ে তাই সাহিত্য-আসরে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। আড্ডাটা ওঁদের বৈঠকখানায় বসেনি, বসেছিল বাড়ির পিছনের উঠানে। সমস্ত দিনমান দাবদাহের পর দিব্যি দখিনা বাতাস দিতে শুরু করেছে; রাতটাও চাঁদনি, শুক্লপক্ষের। শান্তি দেবী কয়েকজন নবীন সাহিত্যিকের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন। আট-দশজন পুরুষ আর জন-তিনেক মহিলা। গান হল, স্বরচিত কবিতা পাঠ হল, প্রবন্ধও পড়লেন কেউ কেউ। কোথা দিয়ে তিন-চার ঘন্টা সময় কেটে গেল টের পেলাম না। শান্তি দেবী নিজে কোন অংশ নিলেন না দেখে আমি বলি, -এবার আপনার একখানা গান হোক–
–গান? আমি জীবনে কোনদিন গান গাইনি! বলেন শান্তি দেবী।
আমি বলি, সেকথা কে বিশ্বাস করবে বলুন? আপনার বাইরের ঘরে কিংখাবে মোড়া যন্ত্রটা আপনার বিরুদ্ধে নীরব সাক্ষী।
যন্ত্র? কী যন্ত্রণা! ওটা আমি বাজাই না, উনি বাজান।
একজন আগন্তুক ভদ্রলোক বলেন, ভাল কথা, দাদা কোথায়? গগনদা?
গগনদা? আমি সচকিত হয়ে উঠি।
-হ্যাঁ। শ্রীগগনবিহারী পাল। এ বাড়ির খোদ কর্তা। আপনি যে গগন থেকে পড়লেন ডাক্তারবাবু!
আমি বলি, বলেন কি? গগন পাল? আচ্ছা, উনি কি কলকাতার আর্যমিশন স্কুলে পড়তেন?
প্রশ্নটা শান্তি দেবীকে। তিনি বলেন, -আর্য মিশনে পড়তেন কিনা জানি না, তবে ছাত্রাবস্থায় কলকাতাতেই ছিলেন, বাগবাজারের দিকে।
