আমি বলি, -কী আশ্চর্য! এটা গগনের বাড়ি? গগন যে আমার…তা তিনি কখন ফিরবেন?
–ওঁর ফিরতে সেই যার নাম রাত দশটা। দোকান বন্ধ করে ফেরার পথে আজ উনি একটি টিউশানি সেরে আসবেন।
–ও বুঝি প্রাইভেটে ছেলে পড়ায়?
শান্তি দেবী বলেন, ছেলে নয়, মেয়ে; আর পড়ান নয়, গান শেখান।
তবে এ গগন পালই। প্রাইভেট ট্যুইশানি শুনে একটু হতাশ হয়েছিলাম। আর্য মিশনে যে জ্ঞান সে অর্জন করেছে তাতে ছেলে পড়ানোর আশা কম। কিন্তু হতভাগার গানবাজনার দিকে বরাবরই একটা ঝোঁক ছিল। খালি গলাতেই চমৎকার গাইতে পারত, আর পারত সুন্দর আড়বাঁশী বাজাতে। কিন্তু খবরটা কি করে জানা যায়? ওর বাবার নাম জানি না। কোথায় দেশ তাও জানি না। মরিয়া হয়ে বলি, –ওর কপালে কি একটা কাটা দাগ আছে?
শান্তি দেবী জবাব দেন না। নিঃশব্দে উঠে যান ঘরে। একটু পরে ফিরে আসেন একখানি বাঁধানো ফটো সমেত। বিয়ের পরে তোলা ছবি। যুগলে। বরবধূ বেশ। ক্যামেরাম্যানের নির্দেশটা বেশিমাত্রায় মেনেছে গ্যগা–এক গাল হেসেছে সে। লাফিয়ে উঠি আমি, -এই তো গগ্যা! এ যে আমার বিশিষ্ট বন্ধু!
দেবেনবাবু হেসে বলেন, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। বিশিষ্ট বন্ধু না হলে ঢাকা শহরের দুপ্রান্তে দুজনে এমন গা-ঢাকা দিয়ে ঘুরছেন?
সবাই সমস্বরে হেসে ওঠে।
চিড়ে ভাজার প্লেটটি নামিয়ে রেখে আমি উঠে পড়ি।
বলি, এখনও আমার দুচারটি রুগী মরতে বাকি আছে। ফেরার পথে তাদের একটু খোঁজখবর নিয়ে যেতে হবে। আজ উঠি। আপনাদের কাব্যালোচনা চলুক। শান্তি দেবীর দিকে ফিরে বলি, -গগ্যাকে বলবেন কাল সকালেই যেন আমার ডিপেনসারীতে এসে চা খেয়ে যায়। উফ্ কতদিন দেখিনি ওকে! আপনাদের সাহিত্যের ভাষায় শতাব্দীর পঞ্চমাংশ!
গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেলেন শান্তি দেবী। বিদায় নমস্কার করে বললেন, –আবার আসবেন।
-এবার তো আপনাদের যাওয়ার কথা। এখন তো আপনি আমার বন্ধুপত্নী। তবে আপনাকে এখনই আমন্ত্রণ করছি না। আমার বেটার হাফ কলকাতা গেছেন। তাই আপাততঃ কর্তাটিকেই পাঠাবেন রিটার্ন ভিজিট দিতে। কাল সকালেই।
-বলব। তবে আপনার খেয়ালী বন্ধুকে তো চেনেন!
বাগানটা পার হয়ে সাইকেলে উঠতে যাব, পিছন থেকে আওয়াজ হল, ডাক্তারবাবু নাকি?
দাঁড়িয়ে পড়ি। শান্তি দেবীর ফুলদা। খাপটি মেরে বসেছিলেন কালভার্টের উপর। এগিয়ে এসে বলেন, –মাচিস্ আছে ডাক্তারবাবু আপনার পকেটে?
দেশলাইটা বার করে দিলাম। ফুলদা সেটি গ্রহণ করে নিজের ফতুয়ার পকেট তল্লাশি করে বললেন, -দূর ছাই, বিড়ির বাণ্ডিলটাও ফেলে এসেছি।
বাধ্য হয়ে প্যাকেট থেকে একটি বার্ডস-আই বার করে দিলাম। উনি ধন্যবাদ জানিয়ে মৌজ করে সিগারেট ধরালেন। আমি রওনা দিলাম।
পরদিন সকালে কিন্তু গগ্যা এল না। তার পরদিনও নয়। ক্রমে দিন সাতেক কেটে গেল। আমিও ওদিকে যাবার কোন সুযোগ করতে পারিনি। দিন দশেক পরে রমনার দিকে যাচ্ছি রুগী দেখতে। সকাল তখন গোটা দশেক হবে। নবাবপুর রোড ধরে চলেছি সাইকেল চেপে। লেভেল-ক্রসিং পার হয়ে পুরানো পল্টনের ফাঁকা মাঠটা ডাইনে রেখে রমনার দিকে মোড় নিতে গিয়েই মনে পড়ল গগ্যার কথা। হতভাগাটা এল না কেন? শরীর খারাপ হয়ে থাকলে সবার আগে আমারই খবর পাওয়ার কথা। ডান দিকেই মোড় নিলাম। সেটা ছুটির দিন। শান্তি দেবী বাড়ি ছিলেন। ছেলেমেয়েরাও। আমাকে দেখতে পেয়ে মিষ্টি চিৎকার করে ওঠে, –মা, ডাক্তারবাবু এসেছেন।
আর ডাক্তারবাবু নয় রে, পাগলি! এবার থেকে ডাক্তারকাকু বলবি।
শান্তি দেবী বোধকরি রান্নাঘরে ছিলেন। হাতটা ধুয়ে আঁচলে মুছতে মুছতে এসে বসেন, আসুন, আসুন।
-না, আমি আসব না আজ। গগ্যা কোথায়?
–সে তো এই একটু আগেই দোকানে চলে গেল।
–আজ ছুটির দিনেও দোকান?
ছুটির দিন বলে কি আপনারই রেহাই আছে?
তা বটে। দোকানদার অথবা ডাক্তারের আবার ছুটির দিন কি? বলি, অভিযোগ আছে। এখন বলুন, আসামী কে? আপনি, না আপনার কর্তা? আপনিই বলতে ভুলেছেন, না সে-ই যেতে ভুলেছে?
-যায়নি সে?
–কেন, গেলে আপনি জানতে পারতেন না? ফিরে এসে গল্প করত নিশ্চয়?
বিচিত্র হেসে শান্তি দেবী বলেন, স্কুল জীবনে ও বুঝি খুব গপ্পুড়ে ছিল?
আমি জবাব দিইনি। দোকানের নামটা জানা ছিল। অবস্থানটা জেনে নিয়ে ফের রওনা হয়ে পড়ি। হতভাগাটাকে কষে গালাগাল দিতে হবে। ওকে খুঁজে বার করবই। শান্তি স্টোরস্ খুঁজে পেতে অবশ্য আমাকে বেগ পেতে হয়নি। যে আমলের কথা বলছি তখন ওখানে দোকান-পাট একেবারেই ছিল না। কিন্তু দোকানেও তার দেখা পেলাম না। দোকানে সে নেই। ছিল একজন কর্মচারী। বছর ষোলোসতেরর একজন কিশোর। নাম বললে, প্রফুল্ল। বললে–আজ্ঞে না, বাবু তো আসেননি।
ছোট্ট দোকান। বিস্কুট, লজেন্স, খাতা-পেন্সিল, স্নো-পাউডারের আয়োজন। কাঠের তাকে সাজানো। সামনে একটা গ্লাস-কেস। এতটুকু দোকানে এই জনহীন প্রান্তরে ওর কতই বা বিক্রি হয়, যে একজন কর্মচারী রেখেছে? যাক, আমার কি! প্রফুল্লকে নিজ পরিচয় দিয়ে বললাম, বাবু এলে বল–আমি এসেছিলাম। রুগী দেখতে যাচ্ছি। ফেরার পথে আবার খোঁজ নিয়ে যাব।
ফিরতে আমার রীতিমত বেলা হয়ে গেল। কিন্তু দোকানে তার দেখা পেলাম না। তখনও সে আসেনি। ফেরার পথে ওর বাড়িতে আবার খোঁজ নিলাম। শান্তি দেবী একটু অবাক হলেন যেন। বলেন, –সে কি! এখনও দোকানে আসেনি? কি জানি তাহলে কোথায় গেছে!
