সেদিন সন্ধ্যায় নিজেকে এত দুর্বল লাগল যে, বিছানা থেকে মাথাটা আর তুলতে পারল না। ভীষণ তৃষ্ণা পেয়েছিল; কিন্তু উঠে গিয়ে জল গড়িয়ে খাবার মত সামর্থ্য আর বাকি নেই। হঠাৎ ভিন্সেন্টের মনে হল খোলা দরজায় কার যেন ছায়া পড়ল। চোখ তুলে দেখবার চেষ্টা করে। উন্মুক্ত দ্বারপথে একমুঠো আকাশের পশ্চাৎপটে মনে হল কে যেন দাঁড়িয়ে আছে। মৃত্যু কি আসন্ন? ঐ কি মৃত্যুর রূপ? কিন্তু তা কেমন করে হবে–যে এসেছে সে তো যমদূতের মত ভয়াবহ নয়? সে যে আঠারো বছরের তরুণ। বলিষ্ঠ দীর্ঘকায় সুপুরুষ একজন।
–কে? কে তুমি?–আর্তকণ্ঠে বলতে গেল ভিন্সেন্ট। কথা ফুটল না।
আগন্তুক এগিয়ে এল। নিচু হয়ে দেখল একবার। তারপর হাঁটু গেড়ে বসল ওর সামনে। তুলে নিল ওর মাথাটা নিজের কোলে। হাত বুলিয়ে দিল ওর জ্বরতপ্ত কপালে।
যীসাস ক্রাইস্ট! হ্যাঁ; কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ শীর্ণকায় দুর্বল প্রৌঢ় মানুষটা নন মিকেলাঞ্জেলোর স্বপ্নে দেখা বৃষস্কন্ধ মহাকায় যীসাস! অ্যাপালোর মত, ডেভিডের মত আঠারো বছরের তারুণ্যে ভরপুর!
জল!-অস্ফুটে বলল ভিন্সেন্ট।
লোকটা ওর মুখের কাছে ধরল জলের পাত্র!
যীসাস! তুমি এসেছ? এতদিনে সময় হয়েছে তোমার?
লোকটা ঝরঝব করে কেঁদে ফেললে। বললে, দাদা! আমাকে চিনতে পারছ না? আমি সূরয!
মৃত্যু আপাতত হার স্বীকার করল। মরা হল না ভিন্সেন্টের। সূরয ওকে মরতে দিল না, দিতে পারে না। সাত রাজ্য ঘুরে সে এসে পৌচেছে ঠিক সময়ে। চন্দ্রভান। গর্গের লক্ষ্মণভাই সূরযভান গর্গ!
জোড়-জাঙালের জীবন শেষ হয়ে গেল ভিন্সেন্টের। সূরয ইতিমধ্যে চাকরিতে ঢুকেছে। ইতিমধ্যে ওদের কাকার মৃত্যু হয়েছে। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে শুধু খ্রীষ্টান ভিন্সেন্ট একাই নয়, তার ভাইও বঞ্চিত হয়েছে। তাতে দুঃখ নেই সুরযের। সেও সব ছেড়েছুঁড়ে চলে এসেছে। কলকাতায় একটি মেস বাড়িতে থাকে। নর্মান অ্যাণ্ড হ্যারিস কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে। অল্প আয়, তা হোক, দাদার দায়িত্ব নেবার ক্ষমতা সে রাখে। দাদাকে সে নিয়ে গিয়েছিল তার কলকাতার মেসে। ভিন্সেন্টের জীবনে শুরু হল আবার এক নূতন অধ্যায়।
০৭-৮. গগন পালের গল্প
গগন পালের গল্প বলি এবার। গগন চরিত্রটিকে আমি ঠিকমত বুঝে উঠতে পারিনি। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে যা শুনেছি তাই লিখে যাওয়া। দাদু বলেছিলেনঃ
..বুঝলে নরেন, গগন ছেলেটা চিরকালই ছিল একটু ডাকাবুকো ধরনের। আপনমনে থাকত সে, কারও সাতে-পাঁচে নেই। পড়াশুনায় মন ছিল না। টিকিয়ে ঢিকিয়ে ক্লাস প্রমোশন পেত। মাস্টার মশাইদের হাতে চড়টা-চাপড়টা ছিল তার নিত্য বরাদ্দ; কিন্তু অসুরের মত শক্তি ছিল ওর গায়ে—চড়-চাপড়ে বড়-একটা কিছু হত না। খুব চাপা। ধরনের ছেলে; আমরা আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার কথা আলোচনা করতাম, ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন দেখতাম এবং বন্ধু মহলে তাই নিয়ে কথাবার্তাও হত। সে সব আড্ডায় গগনটা স্রেফ চুপচাপ বসে থাকত, অথবা মাঠ থেকে চোরকাটা উপড়ে নিয়ে তার উঁটি চেবাতো। গায়ে পড়ে কেউ যদি তাকে জিজ্ঞাসা করে বসে বড় হয়ে সে কী হতে চায়, তবে জবাবে বলত, ঝাঁট দে ওসব কথা! ঐ তার এক মুদ্রাদোষ! সব কথাতেই শুধু ঝাঁট দে! ভালমন্দ সব কিছুই সে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চায়। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে একমাত্র সেই ফেল করে। কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। কদিন তার দেখাই পাইনি। পরে শুনলাম, সে দেশে চলে গেছে। দেশ কোথায়, সেখানে কে আছে কিছুই জানতাম না। এমন চাপা ধরনের ছেলে ছিল সে। প্রথম প্রথম আমরা আশা রেখেছিলাম, দেশে গিয়ে সে নিশ্চয় আমাদের চিঠি দেবে। তা সে দেয়নি। এতদিনের স্কুল-জীবনের বন্ধুত্ব সে বুঝি ঝেটিয়েই বিদায় করে দিল।
মাঝে মাঝে হয়তো ওর কথা উঠে পড়ত। কেউ হয়তো বলত, –পল্ গগ্যার খবর জানিস?
আমরা বলতাম, –সে বেটা দেশে গিয়ে ম্যালেরিয়ায় উজাড় হয়েছে নিশ্চয়। না হলে একটা পোস্টকার্ড অন্তত লিখত।
গগন পালের ডাকনাম ছিল গগ্যা। আমরা ওর উপাধিটা সামনের দিকে পাচার করে মাঝে মাঝে সাহেবি-ঢঙে ওকে ডাকতাম পল্ গগ্যা। তা সেই পল গগ্যার সাক্ষাৎ আবার পেয়েছিলাম অনেক অনেকদিন পরে। ঢাকা শহরে। সেটা বোধহয় উনিশশো তেইশ বা চব্বিশ। তার মানে তখন আমার বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ; গগন চল্লিশ ছোঁয় ছোঁয়। ডাক্তারী পাস করে আমি তখন ঢাকায় প্র্যাকটিস্ করি। বুড়িগঙ্গার সমান্তরালে একটি খাল বেঁকে এসে শেষ পর্যন্ত ঐ বুড়িগঙ্গাতেই পড়েছে। রেলগুমটি থেকে খোয়া বাঁধানো যে পাকা রাস্তাটি ঐ খালকে অতিক্রম করে সদরঘাটের দিকে চলে গেছে তারই উপর রায়সাহেবের বাজার। ওখানেই ছিল আমার ডিপেনসারী। জনসন রোডের উপর, মসজিদটার কাছাকাছি। ঢাকা কোর্ট থেকে নবাবপুর রোড পর্যন্ত অনেকগুলি পরিবারেই আমি ছিলাম পারিবারিক চিকিৎসক। জনসন রোডের পশ্চিমপারে মোটামুটি হিন্দুদের বাস, পূর্বপারে মুসলমানদের। আমার ডাক্তারখানাটা ছিল মুসলমান মহল্লার কাছাকাছি। সবাই শ্রদ্ধা করত, সম্মান করত। পসারটা ক্রমে রেললাইনের ওপারেও বিস্তৃত হতে শুরু করেছিল। এই সময় একদিন পুরাননা-পল্টন এলাকা থেকে আমার একটি ডাক এল। ডাকতে এসেছিল বছর বারো-তের বয়সের একটি কিশোর ছেলে। অসুখ তার ছোট বোনের। ছেলেটিকে দেখেই মনে হয়, এ যেন আমার চেনা-চেনা! মুখের আদলটা যেন আমার পরিচিত। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি, এ আমাদের সেই গগন পালের ছেলে। চুলগুলো রুক্ষ, চোখ দুটো উজ্জ্বল। ও এসেছিল একটা সাইকেলে চেপে। সীটে বসতে পারে না, হাফ-প্যাড করতে করতে এতটা পথ চলে এসেছে। আমাকে ডেকে নিয়ে যেতে। আমিও তখন সাইকেলে চেপে রুগী দেখতে যেতাম। ব্যাগটা কেরিয়ারে বেঁধে নিয়ে আমি রুগী দেখতে গেলাম। ঐ ছেলেটিই পথ চিনিয়ে নিয়ে গেল। এতদিন পরে অবশ্য ঠিক মনে নেই, মেয়েটির কী অসুখ করেছিল, তবে সে আমার চিকিৎসাতেই শেষ পর্যন্ত সেরে ওঠে। ঐ সূত্রে আলাপ হয়ে গেল পরিবারটির সঙ্গে। ছেঁড়া-বেড়ার দেওয়াল, উপরে করগেট-টিন-পাশাপাশি দু-খানি ঘর। পিছনে উঠান পার হয়ে রান্নাঘর। দরজার ধারে লক্ষ্য পড়েছিল নেমপ্লেটটার উপর। তাতে গৃহস্বামীর নয়, গৃহকত্রীর পরিচয়টাই ঘোযিত। মিসেস্ শান্তি পাল, বি. এ.। স্থানীয় মেয়েদের স্কুলে শিক্ষয়িত্রী ছিলেন তিনি। বছর ত্রিশেক বয়স, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা, বেশ সপ্রতিভ এবং সুরুচিশীলা। বাইরের ঘরেই রোগিণী শুয়েছিল। সে ঘরে খান-তিনেক ছবি-রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও শরৎচন্দ্রের। পিছনের দেওয়ালে হুক থেকে টাঙানো একটি কিংখাবে মোড়া সেতার অথবা সরোদ। জানলার পর্দাতেই সেলাই-এর কাজ। সে-আমলে সেলাই-এর কাজ বলতে আমরা বুঝতাম কার্পেটের অথবা চটের উপর পাড়ের সুতো দিয়ে বোনা পতি পরম গুরু জাতীয় গুরুতর বাণী। মনে হল, এ ভদ্রমহিলার রুচি সূক্ষ্মতর।
