হঠাৎ কি হল ভিন্সেন্টের। ডান হাতখানাকে আর সহ্য করতে পারল না। বিশ্বাসঘাতক হাতখানাকে তখনই শাস্তি না দিলে যেন ওর তৃপ্তি নেই। ধীরপদে এগিয়ে আসে সে। ডান হাতখানা বাড়িয়ে ধরে। বলে, –এই বিশ্বাসঘাতক হাতখানা যতক্ষণ তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারবে তার বেশি সময় আমি নেব না নাথানিয়াল!
হাতখানা সে হঠাৎ বাড়িয়ে ধরে জ্বলন্ত মোমবাতির শিখার উপর!
ঘরের আলো স্তিমিত হয়ে আসে। মোমবাতির শিখা ডানহাতের তালুতে প্রায়শ্চিত্তের একটা কালো দাগা বুলিয়ে দিল। কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যেই সেই কলঙ্কের কালো চিহ্নটা অনুশোচনায় লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে ওঠে। ভিন্সেন্ট যেন পাথরে গড়া একটা ভাস্কর্যের নিদর্শন। নিবাত নিষ্কম্প দীপশিখার মত সে অচঞ্চল! তার মর্মভেদী দৃষ্টি নাথানিয়ালের ভূ-মধ্যে সন্নিবিষ্ট! দু-সেকেণ্ড, তিন সেকেণ্ড, পাঁচ সেকেণ্ড! চামড়ার রক্তিম অংশটা স্ফীতকায় হয়ে ওঠে। জলভরা কাজলকালো চোখের মত টলটল করতে থাকে কার্বনের বেড়া দেওয়া প্রকাণ্ড একটা ফোস্কা! নাথানিয়ালের নেশা ছুটে যায়! চোখ দুটো তার ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। আপ্রাণ চেষ্টায় সে কিছু বলতে যায়–পারে না। কণ্ঠে তার স্বর ফোটে না। নাথানিয়াল বজ্রাহত। দশ সেকেণ্ড, পনের সেকেণ্ড! স্ফীতকায় ফোস্কাটা আর সহ্য করতে পারে না উত্তাপ—ফেটে গেল সেটা সশব্দে! নৈঃশব্দের মাঝখানে একটা ছোট্ট শব্দের তরঙ্গ রুদ্ধদ্বার কক্ষের বাতাসে ভাসতে থাকে। আর তখনই ঘরের পিছনের পর্দাটা বিদীর্ণ করে ভেসে এল একটা জান্তব আর্তনাদ!
সম্বিৎ ফিরে পেল নাথানিয়াল। এ কী হচ্ছে কি? বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত লাফ দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। অগ্নির উৎসটা সবলে আঁকড়ে ধরে। ছুঁড়ে ফেলে দেয় মোমবাতিটা ঘরের ও-প্রান্তে।
নীরন্ধ্র অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের মাঝখানে শোনা যায় আতঙ্কতাড়িত নাথানিয়ালের গর্জন, যু ক্রেসি ম্যান! য়ু ইনসেন ফুল!
কিন্তু সে শব্দকে খান্ খান্ করে জেগে ওঠে আর একটি আর্ত কণ্ঠস্বর। অন্ধকার ঘরের ও-প্রান্তে পর্দাটা ঠেলে কেউ প্রবেশ করেছে পূর্বমুহূর্তে। কায়াহীন একটা নারীকণ্ঠ চিৎকার করে ওঠে, –ওকে যেতে বল! ও পাগল! ও বদ্ধ উন্মাদ!
.
আরও পনেরটা দিন সে ছিল ঐ জোড়-জাঙালে, তেঁতুলডাঙা মাঠের মাঝখানে তার পাতায় ছাওয়া কুটিরখানিতে। এমন দুরন্ত অবসাদে আর কোনদিন তার দেহমন ভেঙে পড়েনি। আঘাত তো সে জীবনে কম পায়নি। মায়ের মৃত্যু, খুড়িমার অনাদর, কাকার কাছে অপমান। দুঃখ কী, তা ছেলেবয়স থেকেই বুঝতে শিখেছে। তারপর যত বয়স বেড়েছে ক্রমাগত আঘাত সইতে হয়েছে তাকে। ঊর্মিলার কৌতুক আর প্রত্যাখ্যান, গীর্জা থেকে বিতাড়ন, মালকাটাদের মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াও সয়েছিল। শারদাঁ ওকে দিয়েছিলেন দুঃখকে জয় করবার এক নূতন মন্ত্র–ঈশ্বরে বিশ্বাস। তাও ধোপে টিকল না। ঈশ্বরে বিশ্বাস হারালো। তবু ভেঙে পড়েনি ভিন্সেন্ট। নূতন তন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল দেবনারায়ণবাবুর কাছে। নূতন জগৎ সৃষ্টি করবার স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এসেছিল জোড় জাঙালে। কিন্তু নিয়তি আজও ওর পিছন ছাড়েনি। বিদায় নিলেন ফাদার শারদাঁ, সরে গেল ওর জীবন থেকে ঊর্মিলা। আর বিসর্জন দিয়ে এল চিত্রলেখাকেও। সে নাকি পাগল! সে নাকি বদ্ধ উন্মাদ!
ডানহাতের তালুতে দগদগে ঘা। ছবি আঁকার প্রশ্নই ওঠে না। তুলি ধরা বন্ধ থাকবে কতদিন কে জানে? সাঁকো পার হয়ে ইদানিং মালকাটার দল আর তেঁতুলডাঙার মাঠে আসে না ওর সন্ধান নিতে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বাতাসী। সেও আর আসে না। ভিন্সেন্ট জানতে পারেনি শীতের অন্তে ধাওড়ায় বসন্ত এসেছে তার ভীষণ রূপে। নিদারুণ মারী রোগে বাতাসী শয্যাগতা।
তিল তিল করে অনাহার-ক্লিষ্ট মানুষটা দুর্বল হয়ে পড়তে থাকে। কোনমতে বয়ে নিয়ে আসে খাবার জলটুকু। সারাদিন ঐ তার সম্বল। চুপচাপ শুয়ে পড়ে থাকে সারাদিন। এখন সে কি করবে? কলকাতায় ফিরে যাবে? ট্রেনভাড়া পাবে কোথায়? সূরযকে চিঠি লিখবে? কিন্তু সূরয কোথায় থাকে এখন? কি করছে সে?
ভিন্সেন্টের মনে হল, বিশ বছর বয়সেই সে ফুরিয়ে গেছে। আর তার কিছু করণীয় নেই। আজকাল সে বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেও পারে না। মাথার মধ্যে টলে ওঠে। অন্তত বাতাসীটাও যদি আসত! মনে পড়ে বার বার যোসেফ মুর্মুর কথা। যোসেফ মরতে চায়নি; তবু শেষ সময়ে মৃত্যুই তার একমাত্র কাম্য ছিল। ভিন্সেন্টও মরতে চায় নানা, আজও সে বাঁচতেই চায়। মনে পড়ে ফাদার শারদাঁর ঘরে টাঙানো সেই শেষ বিচারের ছবিখানা। মিকেলাঞ্জেলোর অনবদ্য সৃষ্টি-সিস্টিন চ্যাপেলে আঁকা শেষ বিচারের দৃশ্য। ঈশ্বর অলীক; কিন্তু যীসাস তো ঐতিহাসিক সত্য। মিকেলাঞ্জেলোর স্বপ্ন কি সার্থক হবে না কোনদিন! আঠারো বছরের ন্যায়াধীশ তরুণের বেশে সাধুদের পরিত্রাণ করতে, আর দুষ্কৃতদের নয়কে পাঠাতে যীসাস কি সত্যিই একদিন ফিরে আসবেন না? আর মনে পড়ে কোম্পানির বাগানে দেখা সেই সন্ন্যাসীকে। তিনি বলেছিলেন, পূর্বজন্মে ভিন্সেন্ট নাকি বৈকুণ্ঠবাসের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে স্বেচ্ছায় ফিরে এসেছিল এই দুনিয়াদারির পঙ্কিল পরিবেশে। এবারকার খেলাও তো শেষ হয়ে এল। এবার যখন যমদূত এসে প্রশ্ন করবে তাকে, সে কী জবাব দেবে? আবার কি নতুন করে শুরু করতে চাইবে ঐ একই খেলা?
