-তুমি পাঁচিল টপকে ঢুকেছ, তাই তোমাকে আটকে রেখেছি—
–আমি আমার কথা বলছি না। আমি বলছি পাঁচু হালদারের বাড়ির মেয়েটির কথা।
–আই সী! ও, আজ বুঝি তুমি টমাস বেকেটের চরিত্র অভিনয় করছ না? নাইটহুড শিভ্যালরি, এ? এ লেডি ইন ডিস্ট্রেস! বন্দিনীকে উদ্ধার করতে এসেছ?
ভিন্সেন্ট জবাব দেয় না।
নাথানিয়াল আর এক পাত্র গলাধঃকরণ করে। পাইপটা নিভে গিয়েছিল–টেবিলের উপর থেকে প্রকাণ্ড মোমবাতিটা টেনে নিয়ে পাইপটা ধরায় ফের। রূপার সৌখীন মোমদানে রক্ষিত হাতখানেক লম্বা মোটা মোমবাতি এ-ঘরে একমাত্র আলোর উৎস। নীলাভ ধোঁয়ায় নাথানিয়াল ভাসিয়ে দেয় তার পরবর্তী বক্তব্য, -পাঁচুবাবুর বোনঝি স্বেচ্ছায় এখানে এসেছে।
–আপনি তাকে ডাকুন। আমি তার কাছ থেকে স্বকর্ণে শুনে যেতে চাই।
–তুমি কি তার গার্জেন?
এ প্রশ্ন অবান্তর।
–অবান্তর মোটেই নয়। এ কৈফিয়ত তুমি দাবী করছ কোন্ অধিকারে?
–সে আমার বাগদত্তা। আমি তাকে বিবাহ করব বলে প্রতিশ্রুত। এই অধিকারে।
নাথানিয়াল একটু থমকে যায়। সামলে নিয়ে বলে, প্রতিশ্রুত ছিলে! এখন এ অবস্থায় নিশ্চয় তুমি তাকে বিবাহ করতে চাও না?
–একথা জেনেও সে আজ তিন মাস ধরে আমার রক্ষিতা?
রক্ষিতা! কী অবলীলাক্রমে ঐ কুৎসিত শব্দটা উচ্চারণ করল নাথানিয়াল। ভিন্সেন্টের চোখ দুটি জ্বলে ওঠে। তবু শান্তভাবে বলে, –তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আপনি তার উপর পাশবিক অত্যাচার করেছেন! এজন্যে তার কী অপরাধ? ওকে ডেকে দিন। আমি নিয়ে যাব।
এবার স্পষ্টই বিচলিত হয়ে পড়ে নাথানিয়াল। এতটা বোধকরি সে আশঙ্কা করেনি। একবার পিছন ফিরে ওদিকে পর্দাটার দিকে তাকায়। হয়তো পর্দার ও-প্রান্তে উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা করছিল সেই মেয়েটি, যার ভাগ্য নিয়ে এরা দুজন ছিনিমিনি খেলছে! একটু নড়েচড়ে বসে নাথানিয়াল। বলে, তুমি ভুল করছ হে ছোকরা। মেয়েটাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমি এখানে আটকে রাখিনি। তুমি নিজে খেতে পাও না, ওকে কি খাওয়াবে, অ্যাঁ? আমি তাকে রাণীর হালে রেখেছি। শাড়ি, গহনা
-চুপ করুন। আমি বিশ্বাস করি না। আপনি তাকে এখানে ডেকে আনুন। সে আমাকে বলুক যে, সে এখানেই থাকতে চায়; আমি স্বকর্ণে শুনে চলে যাব।
হঠাৎ ক্ষেপে ওঠে নাথানিয়াল, –গো, গো! গেট আউট, য়ু ভ্যাগাবণ্ড!
ভিন্সেন্ট নিশ্চল পাথরের মূর্তি।
নাথানিয়ালের হাত দুটি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, -তোমাকে খুন করব আমি! য়ু আর ইনকরিজিব্ল!
ভিন্সেন্ট অবিচলিতভাবে বলে, তাতে লাভ হবে না মিস্টার নাথানিয়াল। আপনি ভুলে গেছেন, পর্দার ও পাশে একজন সাক্ষী আছেন। শাড়ি-গহনা দিয়ে ওর মুখ আপনি বন্ধ করতে পারবেন না। ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার চার্জ! ফাঁসীর দড়িতে ঝুলতে হবে আপনাকে!
নাথানিয়ালের দৃষ্টি আবার ফিরে যায় পিছনের পর্দাটার দিকে। হাওয়ায় সেটা দুলছে। উঠে পড়ে চেয়ার ছেড়ে। ঘরময় পায়চারি করে বার কতক।
ভিন্সেন্ট বলে ওঠে, তার চেয়ে ওকে ডেকে দিন। আমি ওর সঙ্গে কথা বলি।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে নাথানিয়াল। ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, কিন্তু তুমি তো ওকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে। তুমি ওকে চিঠি লিখে সেকথা জানাওনি?
ভিন্সেন্ট অবাক হয়ে যায়। ও লোকটা কি কয়লাকুঠির চৌহদ্দির ভিত্র যেখানে যা। কিছু ঘটছে তার খবর রাখে? সত্যকে অস্বীকার করতে পারে না সে, বলো লিখেছিলাম। সেটা ভুল হয়েছিল আমার। আমার ডান হাতখানা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। আমার মনের কথা সে লেখেনি।
ডান হাতখানা সে আলোর সামনে বাড়িয়ে ধরে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে হাতটার দিকে।
হঠাৎ হো হো করে হেসে ওঠে মাতালটা। বলে, বটে! বেশ মেলোড্রামাটিক কথা বলতে পার তো হে ছোকরা! ডান হাতখানা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, অ্যাঁ? তা সেই বিশ্বাসহন্তার কী শাস্তির ব্যবস্থা রেছ?
ভিন্সেন্ট কেমন যেন বদলে যায়। হাতখানা আলোর সামনে বাড়িয়ে ধরে কী যেন দেখতে থাকে। জবাব দেয় না। কী দেখছে সে হাতের দিকে তাকিয়ে। তার চোখে। উন্মাদের দৃষ্টি!
নাথানিয়াল এতক্ষণে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। ভিন্সেন্টের ছিদ্রটা তার নজরে পড়েছে। তাহলে শুধু নাথানিয়ালের একারই নয় ঐ আদর্শবাদীটার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও বিশ্বাসঘাতকতা করে? তবে আর ও লোকটাকে সমীহ করে চলার কি আছে? এতক্ষণে খোশ মেজাজে সে আবার গিয়ে বসে তার আরাম কেদারায়। এক পাত্র পানীয় ঢেলে নিয়ে তার আক্রমণের পদ্ধতিটা পালটে ফেলে। হাসতে হাসতে বলে, বাবু! আমার সঙ্গে চালাকি কর না। ও মেয়েটাকে যে আর বিয়ে করা চলে না তা আমিও জানি, মেয়েটাও জানে, আর তুমিও জান! কেন মিছে কথা বলছ?
–আমি ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়ে বলছি
–ঈশ্বর! সেটা আবার কে? শুনেছি তুমি নাকি ঈশ্বরে বিশ্বাস কর না আজকাল!
–আই টেক মাই ওথ অব অনার– চিত্রলেখাকে আমি বিবাহ করতে চাই।
হঠাৎ আবার হেসে ওঠে মাতালটা। বলে, বাজে কথা। সেদিন তোমার হাত-খানা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, আজ জিহ্বাটা করছে। সোজা কথা বল না বাবু, মেয়েটাকে নিয়ে দুদিন ফুর্তি করতে চাও! তা আমার সখ মিটে যাক–উচ্ছিষ্ট যা থাকবে–
-সাট আপ!–গর্জে ওঠে ভিন্সেন্ট।
নাথানিয়াল কিন্তু রাগ করে না। চোখ তুলে একবার শুধু তাকায়।
–আপনি ওকে ডেকে দিন। বেশি সময় আমি নেব না! কতটা সময় তুমি নেবে বাবু?
