যেন অনেক দূর থেকে জবাব দেয় চিত্রলেখা, এখন আর তা সম্ভব নয়।
আলবাৎ সম্ভব! কে বাধা দেবে? আমার অবশ্য কোন রোজগার নেই। আমি বেকার। তা হোক, যা পাব দুজনে ভাগ করে খাব। ঐ কামুক পাষণ্ডটার–
আবার একই কথা বললে চিত্রলেখা, বললাম তো! আজ আর তা হবার নয়!
-কেন অসম্ভব?
–সেকথা মুখ ফুটে বলতে পারব না আমি!
বুঝেছি। বলতে তোমাকে কিছুই হবে না লেখা। আমি ওসব মানি না। তুমি আমার স্ত্রী। তোমাকে এভাবে মরতে দেব না আমি।
চিত্রলেখা তার হাতটা ছাড়িয়ে নেয়। বলে, -মরার আর কিছু বাকি নেই আমার।
কী আশ্চর্য! বুঝছ না কেন তুমি? ওসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করি না আমি।
–আমি করি! আজ আর আমি রাজী নই!
ভিন্সেন্ট আরও কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলা হয় না। দেখতে পায় আরও কজন পথচলতি লোক এদিকে আসছে। চিত্রলেখা ধীর পদে পাকদণ্ডী বেয়ে টিলার মাথায় উঠে যায়। চন্দ্রভান চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে আসে তার। কুঁড়েঘরে।
পরের কটা দিন কোথা দিয়ে কেটে গেছে খেয়াল নেই ভিন্সেন্টের। ছবি আঁকাতেও মন দিতে পারছে না। জিনিসটা নিয়ে যতই ভেবেছে ততই নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়েছে। ও বুঝতে পেরেছে চিত্রলেখাকে ঐ নরক থেকে উদ্ধার করতে না পারলে তার মনের শান্তি কোনদিনই ফিরে আসবে না। চিত্রলেখাকে সব কথা বুঝিয়ে বলা দরকার। যেটাকে সে দূরতিক্রম্য বাধা বলে মনে করেছে সেটাকে ভিন্সেন্ট আদৌ আমল দিতে চায় না। একথাটা ওকে ভাল করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার। ভিন্সেন্ট সুযোগ খুঁজতে থাকে। পর পর তিনদিন ঐ সাহেববাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করেছে কিন্তু চিত্রলেখাকে দেখতে পায়নি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে ওখানে আসে না। বরং ঐ বাড়িতেই থাকে আজকাল। না হলে এ তিনদিনের মধ্যে একবার সে তাকে পথের ভিতর ধরতে পারত।
অবশেষে মরিয়া হয়ে ভিন্সেন্ট একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসে। প্রাচীরবেষ্টিত সাহেব কুঠির ফটক দিয়ে প্রবেশ করতে না পেরে সে শেষ পর্যন্ত একদিন পাঁচিল টপকালো। সন্ধ্যার অন্ধকারে সে লাফিয়ে নামল পাঁচিল থেকে। কিন্তু যা ভেবেছিল তা। হল না। ধরা পড়ে গেল। গুখ সেপাইদের হাতে নির্মম প্রহারে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। চিৎকার চেঁচামেচিতে সাহেবের সান্ধ্য-অবকাশ বিঘ্নিত হয়। দ্বিতলে বসে মদ্যপান করছিলেন সাহেব, নেমে এলেন বাধ্য হয়ে। পরনে তার সৌখিন সিল্কের গাউন, মুখে পাইপ, হাতে টর্চ, ভূযুগলে বিরক্তির আভাস।
-ক্যা হুয়া হ্যায় ব্রীজ সিং, এৎনা হল্লা কেঁউ মচাতা?
ব্রীজ সিং এগিয়ে এসে লম্বা সেলাম করে। সবিনয়ে নিবেদন করে একটা চৌট্টা কুঠিতে খুঁসেছিল এবং ব্রীজ সিং-এর অতন্দ্র পাহারায় লোকটা ধরা পড়েছে। সাহেব হুকুম করলেন চোরকে আলোর সামনে নিয়ে আসতে। দুজন সেপাই দু-দিকে ধরে নিয়ে এল প্রহারজর্জর মানুষটাকে আলোর সামনে। বছর উনিশ কুড়ি বয়স, একমাথা রুক্ষ চুল, হাফ-সার্টটা ছিঁড়ে ফালা ফালা, ঠোঁটের কষ বেয়ে নেমেছে রক্তের একটা ধারা। সন্ধ্যা থেকে বেশ কয়েক পেগ বিলাইতি ওঁর পাকস্থলীতে আশ্রয়লাভ করেছিল, তবু চিনতে অসুবিধা হল না নাথানিয়াল সাহেবের। এক চিলতে একটা পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠে তার ওষ্ঠপ্রান্তে। বলেন, হ্যাল্লো! ওয়েলকাম সেন্ট টমাস বেকেট!
ভিন্সেন্ট জবাব দেয় না। তার দু-চোখে আগুন। স্থির দৃষ্টে সে তাকিয়ে থাকে।
ব্রীজ সিং পুনরায় সেলাম করে বলে, -সাব?
অর্থাৎ নূতন করে প্রহার শুরু করার অনুমতি চায়।
সাহেব কিন্তু অনুমতি দিলেন না। বোধকরি দৈহিক পীড়নের চেয়ে অন্যভাবে পীড়ন করার একটা বাসনা জাগল তাঁর। সান্ধ্য কৌতুকটা লোভনীয় মনে হল বুঝি। নাথানিয়াল পাকা ঘুঘু কলয়াকুঠির সব সংবাদ তাঁর নখদর্পণে; এমন কি ঐ বাউণ্ডুলে ছেলেটা যে তার গৃহবন্দিনীর সঙ্গে প্রেম করত সে খবরও তার অজানা নয়। তাই ব্রীজ সিংকে সাহেব হুকুম দিলেন, ওকে তার ড্রইংরুমে পৌঁছে দিতে।
বাইরের ঘরে আরাম কেদারায় আরাম করে বসল নাথানিয়াল। এ সেই ঘর– পিছনে ফায়ার প্লেসে এখন অবশ্য আগুন নিভে গেছে; পড়ে আছে কিছু যীশুমূর্তির উপর ভারতসম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের ফ্রেমে বাঁধানো সেই সদম্ভ ভঙ্গিমা। নাথানিয়ালের খাস কামরা কুঠি সংলগ্ন। এখানে বসেই সে কয়লাকুঠির কলকাঠি নেড়ে থাকে।
নাথানিয়ালের নির্দেশে ব্রীজ সিং বিদ্রোহী বন্দীকে এ ঘরে পৌঁছে দিয়ে বাইরে চলে যায়। নাথানিয়াল ওয়াইন-গবলেটে হলুদ রঙের কিছুটা পানীয় ঢেলে হাসি হাসি মুখে তার বিচিত্র ভাষায় যে প্রশ্নটা করে তার নির্গলিতাৰ্থ—তুমি তো আইনের অনেক কেতাব। পড়েছ হে। অনধিকার প্রবেশের দায়ে পিনাল কোডের ধারায় কত বছরের মেয়াদের ব্যবস্থা আছে সেটা জান?
ভিন্সেন্ট কোন জবাব দিল না। ঠোঁটটা মুছে নেয়। হাফ-সার্টের বাঁ-হাতে কাঁধের কাছটা লালে লাল হয়ে ওঠে। রক্তক্ষরণটা বন্ধ হয়নি। নাথানিয়াল গম্ভীর স্বরে বলে, জবাব দিচ্ছ না কেন? পাঁচিল টপকিয়ে আমার কুঠিতে ঢুকেছ কেন?
সদর দরজা দিয়ে আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে।
বাঃ! বেশ যুক্তি তত তোমার? তোমাকে পুলিস ডেকে ধরিয়ে দিতে পারি, তা জান?
না, পারেন না। পুলিস ডাকলে আপনিও ধরা পড়ে যাবেন! –হোয়াট ডু য়ু মীন?
-ইণ্ডিয়ান পিনাল কোডে অনধিকার প্রবেশের জন্য যেমন সাজার ব্যবস্থা আছে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে আটকে রাখলেও তেমনি সাজার ব্যবস্থা আছে।
