ব্যাপারটা খোলাখুলি জানা গেল বাতাসীর কথায়। তার কোন ঢাক ঢাক্ গুন্ গুর নেই। স্পষ্টবাদিনী সে-ভালকে ভাল বলতে জানে, মন্দকে নির্ভেজাল গাল পাড়তেও তার কসুর নেই। বললে, –ঈ বাবা গ! তু জানিস নাই ফাদারদা? তা তখন আর শুনায়ে কী হবে? অমন সোন্দর সম্বন্ধটো করলম, তুর মন মানলেক নাই। সোনার কোসম লাগলেক ঐ চামারের ভোগে! চামার! চামার! উটা মানুষ লয় বটে!
-কী পাগলের মত বকছিস বাতাসী! কে চামার?
–হুই নাথানেল সাহেব গ!
–সে তো জানি। কিন্তু সোনার কুসুমটা কে?
–তু শুনিস নাই? পাঁচু মিতিরি কেমনে সাহেব হৈ গেল?
না। কেমন করে?
বুইনঝিটারে জবাই করলেক! হুই চামারটার ছামুতে
উত্তেজনায় রুখে ওঠে ভিন্সেন্ট, কী! কী বললি?
–ঈঃ! অখন কুলোপানা চক্কর দেখাইলে কী হবেক রে? মাইয়াটা তুর পায়ে আছাড়ি-পিছাড়ি পড়লেক, তুর দয়া হল নাই! হাত-চিঠি দিলেক, তু ফিরায়ে দিলি! সব জানে রে ই বাতাসী! অখন পাঁচু মাইয়াটারে বেচে দিলেক আর তু কুলোপানা চক্কর দেখাইছি–কী! কী বুললি! তু মরদ, না কী বটেরে! থুঃ!
পর্ণকুটিরের সামনে পথের উপর থুতু ফেলে চলে গিয়েছিল বাতাসী। সাঁওতালি মেয়েটার কাছে মরদের এ জাতীয় কাপুরুষতার বুঝি ক্ষমা নেই। চন্দ্রভান বজ্রাহত হয়ে যায়! চুপ করে বসে থাকে সে তার পর্ণকুটিরের দাওয়ায়!
ক্লান্ত সূরয ঢলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। চৈত্রের শেষ। শীত গেছে, এসেছে বসন্ত। এই কয়লা কালো জোড়-জাঙালেও দখিনা বাতাস আসে। দূরে দূরে পলাশ গাছের মাথায় মাথায় লেগেছে অস্তরবির ফাগ-আবীর। ভার্মিলিয়ান টিনট! উদাস হয়ে বসে থাকে ভিন্সেন্ট। সমস্ত ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে থাকে। ধীরে ধীরে এই ন্যক্কারজনক দুর্ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পেল এতক্ষণে!
চিত্রলেখার প্রগলভতায় সে রাত্রে ভিন্সেন্ট বিব্রত হয়েছিল। তার প্রেমপত্র পড়ে ক্ষেপে উঠেছিল আর একদিন; কিন্তু ভিন্সেন্ট একবারও ভেবে দেখেনি–কী মর্মান্তিক প্রয়োজনে এভাবে চিত্রলেখা ওর সাহায্য চাইতে ছুটে এসেছিল বারে বারে! চিত্রলেখা তার মামার চোখে দেখেছিল তার নিজের সর্বনাশের ছায়া। উদ্ভিন্নযৌবনা বোনঝিটাকে পাঁচু হালদার টৌপ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, ভেট হিসেবে উপহার দিতে চেয়েছিল নাথানিয়ালকে। মেয়েমানুষের স্বাভাবিক বৃত্তিবশে সে এ সত্যটা বুঝতে পেরেছিল অনেকদিন আগে থেকেই। তাই আকারে-ইঙ্গিতে এবং শেষের দিকে নিলজ্জের মত সাহায্য চেয়েছে চন্দ্রভানের কাছে। অথচ চন্দ্রভান নিপ্রাণ পাথরের মত বারে বারে মুখ ফিরিয়ে থেকেছে! কেন? মনের অগোচরে পাপ নেই। ভিন্সেন্ট নিজের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হল–সে সময় তার মনে ঊর্মিলার স্বপ্নের রেশ লেগেছিল। ঊর্মিলার গায়ের রঙ মেমসাহেবের মত ফর্সা, সে বারে বারে চন্দ্রভানকে নাকাল করেছে, তাই কি সে দুর্লভ; আর কালো-কোলো বাঙালী-ঘরের অনাথা মেয়েটি যেচে এসে ধরা দিতে চেয়েছিল বলেই সে সুলভ? চকমকির স্ফুলিঙ্গই শধু চোখে ধাঁধা লাগায়, নিবাত, নিষ্কম্প ঘৃতপ্রদীপের দীপ্তিটা নজরে পড়ে না? ঊর্মিলার আশায় অন্ধ ছিল বলেই চিত্রলেখার নীরব আত্মদানের মহিমাটা ওর নজরে পড়েনি। না; পাপ একা পাঁচু হালদার করেনি, করেছে চন্দ্রভানও।
তখনই উঠে পড়ে। ভুল-ভুলই। তাকে শোধরাতে হবে। এখনই, আজ রাত্রেই সে উদ্ধার করবে চিত্রলেখাকে ঐ কামুক পাষণ্ডটার কবল থেকে। বেরিয়ে পড়বে নিরুদ্দেশ যাত্রায়। নাথানিয়াল চিত্রলেখার ধর্ম নষ্ট করেছে? তাতে ভ্রূক্ষেপ করে না ভিন্সেন্ট। ধর্ম কি? বাইবেল-কোরান-উপনিষদ সব বুজরুকি! সতীত্ব ধর্মটাও তাই। ভিন্সেন্টের ধর্ম তার বিবেক! সেই বিবেকের নির্দেশেই সে গ্রহণ করবে চিত্রলেখাকে– দেবে সহধর্মিণীর মর্যাদা!
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। হনহন করে সাঁকো পার হয়ে ভিন্সেন্ট এসে প্রবেশ করে কয়লাকুঠিতে। কুলি-ধাওড়াকে বাঁ-হাতে রেখে এগিয়ে যায় টিলার দিকে। সাহেব কুঠির দিকে। বাধা পেল লোহার ফটকটায়। গুখ সেপাই হটিয়ে দিল তাকে। ঢুকতেই দিল পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সাহেব কুঠির চৌহদ্দিতে।
অগত্যা মাথা নিচু করে ফিরে আসছিল। কেমন করে চিত্ৰলেখার দেখা পাওয়া। যায়? কেমন করে ঐ পাঁচিল-দিয়ে-ঘেরা দুর্গের ভিত্র বন্দিনী নারীর কাছে সংবাদ পাঠানো যায়? বাতাসী কি পারবে ওর ভিতর ঢুকতে? আপনমনে পথ চলছিল, হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। টিলার নিচের দিক থেকে ধীর গতিতে উঠে আসছে চিত্রলেখা। একা। আশ্চর্য! সে তাহলে বন্দিনী নয়। প্রতি সন্ধ্যায় কি তাকে আসতে হয় এমনি করে বাবু কোয়ার্টার্স থেকে ঐ টিলার উপর! চিত্রলেখাও আপনমনে পথ চলছিল; খেয়াল করেনি উপর থেকে আর একজন নেমে আসছে। হঠাৎ ওকে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
–লেখা! কোথায় চলেছে এমন একা একা?
মুখটা ছাইয়ের মত সাদা হয়ে যায় মেয়েটির। দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরে। কয়েক মিনিট সময় লাগে তার নিজেকে সামলে নিতে। তারপর বলে, -সে খোঁজে আপনার কি প্রয়োজন?
প্রয়োজন আছে বলেই ছুটে এসেছি লেখা। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমার ভুল আমি বুঝতে পেরেছি। চল, আজ রাত্রেই আমরা পালিয়ে যাই এখান থেকে।
হঠাৎ ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল চিত্রলেখা। দু-হাতে মুখটা ঢাকা। ভিন্সেন্ট এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরে। বলে, –আমাকে ক্ষমা করেছ?
