রোজ ভোরবেলা উঠে চন্দ্রভান বেরিয়ে পড়ে তার রঙ-তুলি নিয়ে। কয়লা কুঠির জীবনছন্দকে আবদ্ধ করে ক্যানভাস অথবা কাগজের চতুঃসীমায়। মালকাটাদের জীবনের ছবি রূপায়িত করে নূতন করে। ওরা কয়লা ঢোলাই করছে, টব ঠেলে নিয়ে। যাচ্ছে, গাঁইতা চালাচ্ছে; টেবিলের স্তূপ থেকে কয়লা বাচছে বাচ্চা ছেলে-মেয়ের দল। মালাকাটার বস্তীতে গিয়েও এঁকেছে ওদের নানান জীবনযাত্রার ছবি। ওরা কুয়ো থেকে জল তুলছে, গল্প করছে, ঝগড়া করছে, বিশ্রাম করছে। ঈশাকের ছাপরায় সেদিন এঁকেছে একটা অনবদ্য ছবি–পোটাটো ইটাস বা আলুর ভোজ!
বিষয়বস্তুটা করুণ। ভিন্সেন্ট সেদিন সন্ধ্যায় ঈশাকের ছাপরায় গিয়ে দেখে ওরা সপরিবারে নৈশ-আহারে বসতে যাচ্ছে। ভিন্সেন্ট অনেকদিন পরে এসেছে ওদের বাড়িতে। ঈশাক ওকে বলল, কি ফাদারদা, মোদের সাথে টুক্ খায়ে লিবেন নাকি?
আসেন, বসেন!
ভিন্সেন্ট দেখে ওদের গোল হয়ে বসার বিচিত্র ভঙ্গিটা। বলে, না ভাই ঈশাক। তোমরা সকলে বরং খেতে থাক। আমি তোমাদের একটা ছবি আঁকি।
-আরে, পেরথমে খায়ে লেন টুক!
ঈশাক-মালাকাটার ভাঁড়ারে সেদিন মা লক্ষ্মী বাড়ন্ত। আটা-ময়দার জোগাড় নেই যে রুটি বানাবে। ঈশাকের বউ এক কড়াই আলু সিদ্ধ করেছে। ওরা সবাই মিলে দাওয়ায় গোল হয়ে বসেছেনুন দিয়ে আলু সিদ্ধ খাচ্ছে। এই আজ ওদের নৈশভোজের আয়োজন! মাঝখানে জ্বলছে একটা কেরোসিনের টেমি। এপাশে ঈশাক, ওপাশে তার বউ। ঈশাকের মা আর দিদিও আছে। আর আছে যোসেফ মুর্মুর অনাথ মেয়েটি মেরী! বাপ-মা মরা আবাগীটাকে ঈশাকই আশ্রয় দিয়েছিল। সে এখন এ পরিবারভুক্ত। ঈশাকের মা দুটি খোসা ছাড়ানো আলু অতিথির দিকে বাড়িয়ে ধরে। বিনা বাক্যব্যয়ে ভিন্সেন্ট সে দুটি মুখে পোরে। ঐ সঙ্গে সে বসে যায় ওদের নৈশ-ভোজের এই বিচিত্র দৃশ্যটা তেলরঙে আঁকতে।
ঈশাক হাসে। ফাদারদা যে নতুন খেয়ালে মেতেছে দিবারাত্র কয়লাকুঠির ছবি এঁকে বেড়াচ্ছে সবাই তা জানে। ঈশাকের তা অজানা নয়। এতদিনে আবার ফাদারদা তিল তিল করে ফিরে পাচ্ছে কুলি-ধাওড়ায় তার হারানো সম্মানের আসর। আলুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে ঈশাক বলে, –মেরীটা যে আপনকার দিকে পিছন ফিরে বসিছে ফাদারদা। অরে ইবাগে লয়্যা আসি? নইলে অর মুখটা যে আঁধারে পড়ি যাবেক!
যোসেফ মুর্মুর সাত বছরের মেয়ে, মেরী। মেয়েটি বসেছিল দৃশ্যপটের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে–আলোর নিচেই; অথচ তার দেহের যে অংশ চিত্রকরের গোচর সে অংশে আলো পড়েনি। সে আছে অন্ধকারে। ভিন্সেন্টের মনে হল এর গূঢ় ব্যঞ্জনা আছে। ঈশাক তার হা-ভাত সংসারের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে বসাতে চেয়েছে প্রতিবেশীর ঐ বাপ-মা মরা আবাগীটাকে! বসিয়েছে আলোর নিচেই। কিন্তু ঈশ্বরের বিধানে মেয়েটিকে ঘিরে আছে শুধুই অন্ধকার। জীবনের দিকে পিছন ফিরিয়ে ঈশ্বর তাকে বসিয়ে দিয়েছেন। অদ্ভুত ঘটনাচক্র। আপনমনেই হেসে ওঠে ভিন্সেন্ট। বলে, না ঈশাকভাই, মেরী যেখানে আছে ওখানেই থাক। ওর পিছন-ফেরা ছবিই আঁকব আমি।
ওরা আপনমনে আলুর ভোজে আত্মনিমগ্ন হয়ে পড়ে। ঈশাক তার কোলিয়ারির পোশাকটি ছাড়েনি। মায় মাথার টুপিটাও খোলেনি। ঈশাক আর তার বউ দৃশ্যপটের দুপ্রান্তে দুজন বসেছে মুখোমুখি–যেন গতরে খেটে মাঝের ক-জনকে ওরা এ আলুর ভোজে ডেকে এনেছে। মেরী কেন্দ্রস্থলে, ঘন অন্ধকারে। কিন্তু না! খোদার উপর খোদগিরি করবে ভিন্সেন্ট। মেরীর মাথায় আর দুধের উপর, ঘাড়ের কাছে বাঁ দিকে কয়েকটি ক্ষীণ আলোর রেখা এঁকে দিল সে। এই তার বিদ্রোহ! এই তার ফরিয়াদ! প্রতিদ্বন্দ্বী ঈশ্বরের বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। ও মনে মনে বললে, তুমি যতই ওকে অন্ধকারে টেনে আন না কেন, আমি আমার শিল্পীর চোখ দিয়ে দেখছি, ওর মাথায় আর কাঁধে লেগেছে আলোর ছোঁওয়া। এ আলোকপাত তোমার কোন কীর্তি নয়! তুমি ওর মাকে মেরে ফেলেছ খাদের অন্ধকূপে, বাপকে পুড়িয়ে মেরেছ দশদিনের যন্ত্রণা ভোগের। পর! ঐ সাত বছরের মেয়েটিকে পেড়ে ফেলেছ নীরন্ধ্র অন্ধকারে! এই তোমার কীর্তি। কিন্তু সেখানেই তো মেরীর ইতিহাস শেষ নয়–ওকে ঐ ঈশাকের বউ বুকে টেনে নিয়েছে–ঈশাক ওকে এনে বসিয়েছে তার অর্ধাহারের আলুর ভোজে! ওর মাথায় ঐ যে আলোকবিন্দু তা ঐ ঈশাক পরিবারের আশীর্বাদ!
আলুর ভোজ ভিন্সেন্টের এক অমর কীর্তি!
কিন্তু ওর প্রতিদ্বন্দ্বীও অত সহজে হার মানার পাত্র নন! কঠিনতর আঘাত হানলেন তিনি ভিন্সেন্টের মস্তক লক্ষ্য করে। আঘাতে আঘাতে উন্মাদ না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যেন করুণাময় ঈশ্বরের ক্লান্তি নেই!
এ তিন মাসে এই জোড়-জাঙাল কয়লাকুঠির জীবনযাত্রায় আরও পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে থেকে তা ঠিকমত ঠাওর হয় না। ক্রমে ক্রমে সব কথা সে জানতে পারে। এককড়ি সরখেলের শূন্যপদে উন্নীত হয়েছে পাঁচু হালদার। মেটমুন্সি থেকে ওভারম্যান। বিরাট উন্নতি। এ খবরটা শুনে ভিন্সেন্ট ভেবেছিল মালকাটাদের বিদ্রোহের সময় পাঁচু হালদার যে প্রভুভক্ত কুকুরের ভূমিকাটা নিয়েছিল এই রুটির টুকরোটা বুঝি তারই পুরস্কার। কিন্তু কানাঘুষায় শুনতে পেল, ওর ওই বিরাট উন্নতির মূলে আরও গূঢ় কিছু রহস্য আছে। পাঁচুবাবু কি এক বিচিত্র কায়দায় খোদ নাথানিয়াল সাহেবকে একেবারে খুশি করে দিয়েছে। কী করে? তা ওরা বলেনি–মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেছে শুধু!
