ভিন্সেন্ট বলে, তাইতো হবে স্যার।
তা আঁকবার চেষ্টা করেছিস মাত্র। যা দেখেছিস তা আঁকতে পারিসনি।
তা হবে। আচ্ছা আপনি হলে ঐ মেয়েটিকে কিভাবে আঁকতেন?
আমি? আচ্ছা দেখাই তোকে। দেখ।
দেবনারায়ণবাবু এক টুকরো কাগজে ঐ কুলি রমণীকে পুনরায় আঁকতে শুরু করেন। মেয়েটির ভঙ্গি ভিন্সেন্টের চিত্রের অনুকরণে নিচু হয়ে কয়লার টুকরো বাচছে। প্রথমেই স্কেল ফেলে প্রপোর্সান ঠিক করে নিলেন। প্রায় আধ-ঘন্টা সময় লাগল ভিন্সেন্টের কুলি রমণীটিকে পুনরায় আঁকতে। ভিন্সেন্ট তীব্র আগ্রহ নিয়ে পেনসিলের প্রতিটি টান লক্ষ্য করতে থাকে। আঁকা শেষ করে দেবনারায়ণবাবু খুশি হয়ে বলেন, এবার লক্ষ্য করে দেখ, প্রপোর্সান নিখুঁত হয়েছে।
ভিন্সেন্ট মুখে কিছু বলল না। তার নিজের আঁকা ছবিটা আর মাস্টার মশায়ের সদ্যসমাপ্ত স্কেচটা ঈসেলের উপর বসিয়ে দেয়। একটু পিছনে সরে এসে দেখতে থাকে। কি যেন বলতে চায়, কিন্তু বলে না। দেবনারায়ণবাবু একদৃষ্টে দেখছিলেন পাশাপাশি রাখা ছবি দুটো। হঠাৎ বলে ওঠেন, বুঝেছি, কী বলতে চাইছি! আমি ঐ কুলি-মেয়েটিকে ঠিকমত প্রপোর্সান দিয়েছি বটে, কিন্তু ওর ক্যারেকটারটা কেড়ে নিয়েছি!
ভিন্সেন্ট এবারও কিছু বললে না।
মাস্টার মশাই আরও কয়েক মিনিট চুপ করে ছবি দুটো দেখলেন। তারপর বলে ওঠেন, না রে চন্দর, তোর ছবিখানা খুব খারাপ হয়নি, বুঝেছিস! ওর সারাটা শরীরই বেটপ, মুখটা তো একেবারেই যাচ্ছেতাই–তা হোক, তবু ঐ কদাকার মেয়েটাকে আমার কি জানি কেন ভাল লাগছে। কেন এমন হচ্ছে বল তো চন্দর? মনে হচ্ছে ওকে যেন কোথাও দেখেছি
–কোন কয়লাকুঠিতে অমন মেয়ে দেখে থাকবেন স্যার। ওরা আসানসোলেও আসে–
–হুঁ! আসলে কি জানিস, তোর ছবিটা টিপিক্যাল কয়লাকুঠির মালকাটা-মেয়ের। আমার আঁকা মেয়েটার হাতে একটা হাতা বা খুন্তি ধরিয়ে দিলে মনে হবে রান্না করছে। এমনকি সুদৃশ্য টি-টপ এঁকে দিলে মনে হবে ও চা ঢালছে; মানে আমার আঁকা মেয়েটি একটা সুন্দরী মেয়ে, সে যে কোন পরিবেশে ঠিক মানিয়ে নিতে পারবে নিজেকে। কিন্তু তোর ঐ কদাকার মেয়েছেলেটা তা নয়। ও টিপিক্যাল কুলির মেয়ে! ও জীবনভর কয়লা ঘেঁটেছে, কয়লা ঘাঁটবে! ওর হাতে হাতা-খুন্তি বই-টি-পট কিছুই ধরানো চলবে না!…হেত্তরি! আমার স্বীকার করতে লজ্জা হচ্ছে চন্দর, কিন্তু…কি বলব…তোর ছবিখানা সত্যিই ভালরকম উৎরেছে।
চন্দ্রভান বলে, –স্বীকার করতে লজ্জা হচ্ছে কেন স্যার?
হবে না? বলিস কি তুই! এ একখানা ছবি হয়েছে? কিছু হয়নি! ছবি আঁকার সব আইন কানুন তুই যে চুলোর-দোরে পাঠিয়েছিস! পার্সপেকটিভ ভুল, প্রপোর্সান ভুল–ড্রইং পরীক্ষায় এমন একখানা ছবি কেউ দাখিল করলে আমি স্রেফ গোল্লা দিতাম! কিন্তু..মানে…না রে চন্দর! আমি স্বীকার না করে পারছি না–তোর ছবিখানা অপূর্ব হয়েছে।
প্রাণ ঢেলে এ কদিন শিখিয়েছেন ওকে। জামা-জুতো কিনে দিয়েছেন, রঙ-তুলি ক্যানভাস কিনে দিয়েছেন। গুরুগৃহে এককালে যেভাবে শিষ্যরা ব্রহ্মবিদ্যা শিখত তেমনি যত্ন করেই শেখাতে চেয়েছিলেন ওকে। ভিন্সেন্ট কিন্তু ওখানে আর বাঁধা পড়তে চায়নি। সে শুধু হালধরা, পাল-খাটানোটুকুই শিখতে চেয়েছিল–কোন্ দরিয়ায় নাও ভাসাবে তা শুধু সেই স্থির করবে। ভিন্সেন্ট বোধকরি আশঙ্কা করেছিল আরও দীর্ঘদিন দেবনারায়ণবাবুর স্নেহচ্ছায়ায় থাকলে তার স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে, অথবা ফাদার শারদাঁর চিঠি এল কিনা জানবার জন্য মনটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল কিম্বা হয়তো কয়লাকুঠির আকর্ষণটা সে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মোটকথা মাস তিনেক পরে আবার সেই তেঁতুলডাঙার পর্ণকুটিরে ফিরে এল চন্দ্রভান।
ফিরে এসেই প্রচণ্ড একটা আঘাত পেল। বাওয়ালী থেকে ইতিমধ্যে একটা পোস্টকার্ড এসেছে ওর নামে। ফাদার শারদাঁ লেখেননি; লিখেছে ওর সর্দার পোড়ো রাখাল রুহিদাস। আঁকাবাঁকা হরফে সে নিবেদন করেছে কয়েকটি মর্মন্তুদ দুসংবাদ। ফাদার শারদাঁ ইতিমধ্যে দেহ রেখেছেন। হঠাৎ সন্ন্যাস রোগে মারা গেছেন। ওখানেই কবর দেওয়া হয়েছে তাকে। ওদের পাঠশালাটি উঠে গেছে, অনাথ আশ্রমটাও। ন’পিসি কোথায় চলে গেছে রাখাল তা জানে না। সে নিজে এখন মণ্ডল মশায়ের ক্ষেতে কাজ করে। জনমজুর। সাহেবের টালির ঘর, জমি বাড়ি বাগান সব বিক্রি হয়ে গেছে। সাহেবের ভাইঝি ঊর্মিলা ঐ সম্পত্তিটা পেয়েছিল। রাখেনি। অমন অজ পাড়াগাঁয়ে ঐ সম্পত্তি রাখার কোন অর্থ খুঁজে পাননি ডেভিডসন সাহেব। মানে ঊর্মিলার স্বামী!
ছোট্ট চিঠি। ছোট খবর। রাখাল রুহিদাসের প্রথম পত্র। কিন্তু ভিন্সেন্টের বুকে সেটা শেল হানল। ঊর্মিলার স্বামী ডেভিডসনকে আর কেমন করে দোষ দেওয়া যায়? তিনি তো ফাদার শারদাঁর স্বপ্নের কথা কিছুই জানেন না। কিন্তু ঊর্মিলা কেমন করে রাজী হল? সে যে আবাল্য ঐ পরিবেশে মানুষ হয়েছে। একটু মায়া হল না? কিম্বা। কি জানি, এই বোধহয় জগতের নিয়ম। সেও তো আবাল্য মানুষ হয়েছে। পাগলাচণ্ডীতে। সেখানকার রাধাকান্তজীর মন্দির, দয়ের ছবি, দিগন্ত অনুসারী ধানের। ক্ষেতের কথা কি এখন দিনান্তে একবারও মনে করে? যাক, ফাদার শারদাঁ তাহলে শান্তি পেয়েছেন! ঈশ্বরের করুণায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি–তার ক্রোড়েই ফিরে গেছেন। হয়তে। ভিন্সেন্ট নতজানু হয়ে মনে মনে বলল, -ফাদার! তোমার আত্মার শান্তি কামনায় আমি তোমার পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতে পারছি না কারণ আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারিয়েছি। আজ জানি না, ঈশ্বর আদৌ আছে কি না। আর থাকলেও তিনি কারও প্রার্থনায় আদৌ কর্ণপাত করেন কি না। কিন্তু তোমার দেওয়া পতাকাকে আমি ধূলায় লুটাতে দেব না, ফাদার! তুমিই আমাকে প্রথম দেখিয়েছিলে কীভাবে রঙে আর রেখায় একটা নূতন জগৎ গড়ে তোলা যায়। তুমিই আমার আদি গুরু। তোমার সে পতাকা আমি কাঁধে তুলে নিয়েছি।
