ভিন্সেন্টও এমন অবাক দুনিয়া সৃজন করবে!
ওর ব্যাগে ছিল কিছু কাগজ আর একটা পেন্সিল। ভিন্সেন্ট সাঁকো পার হয়ে জোড় জাঙ্গালে প্রবেশ করল গুটিগুটি। কেউ তাকে কিছু বলে না। সে আপন মনে বসে পড়ে পথের ধারে, কয়লা স্কুপের উপর, কখনও বা কারও দাওয়ায়। যা দেখে তাই আঁকে। শুধু যা দেখে তাই নয়, যা দেখলে সে খুশি হত তাও। মালকাটার দল সার বেঁধে চলেছে, টেবিল থেকে কয়লার টুকরো বেছে তুলছে, মালবোঝাই টব ঠেলে নিয়ে চলেছে। দ্রুত হাতে স্কেচ এঁকে যায় ভিন্সেন্ট। আঁকে আর দেখে। পছন্দ হয় না। ছিঁড়ে ফেলে। আবার আঁকে। মনের মত হয় না। আবার ছেড়ে।
হঠাৎ খেয়াল হল, আচ্ছা অবসর নেবার পর দেবনারায়ণবাবু তো আসানসোলেই থাকেন। ঠিকানাটা ঠিক জানা নেই, কিন্তু খুঁজে নিতে পারবে না? আসানসোল এখান থেকে পঁচিশ ক্রোশ, মানে পঞ্চাশ মাইল। ট্রেন ভাড়ার সম্বল নেই কিন্তু এটুকু পথ হেঁটে যেতে আর কতক্ষণ লাগবে? বড় জোর দুদিন। সকাল সকাল রওনা হলে পরদিন সন্ধ্যের মধ্যেই পৌঁছে যাবে। পরদিন প্রত্যুষেই সে বার হয়ে পড়ল খানকতক স্কেচ হাতে নিয়ে। তখনও সূর্যোদয় হয়নি।
খালি গা, খালি পা, কদিন অনাহারে শরীরও বেশ দুর্বল। তা হোক। ছবির বাণ্ডিলটা নিয়ে সে চলল আসানসোল মুখো।
.
ভিন্সেন্ট ফিরে এল প্রায় তিন মাস পরে। এবার তার গায়ে জামা, পায়ে জুতো, — হাতে রঙ, তুলি, ক্যানভাস, কাগজ। দেবনারায়ণবাবু ওকে নূতন মন্ত্রে দীক্ষা দিয়েছেন। ভান গর্গ জীবনের নূতন অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। অধরাকে ধরবার কৌশল শিখে এসেছে। সে শিল্পী হতে চায়। নূতন পৃথিবী সৃজন করবে সে এই। চাক্ষুষ বাস্তব। জগতের মত ক্লেদাক্ত, পঙ্কিল, অন্ধকার, দুনিয়া নয়–তার মনোমত নূতন ত্রিভুবন! ঈশ্বর-বিশ্বাসী ঈভানজেলিস্ট ভিন্সেন্ট গর্গ আজ স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী! দাউ শ্যাল ক্রিয়েট দ্য ক্রিয়েটার।
দেবনারায়ণবাবু প্রথমটা ওকে চিনতে পারেননি। তার দোষ নেই। খালি গা, খালি পা, একমাথা রুক্ষ চুল, একমুখ খোঁচা খোঁচা গোঁফ-দাড়ি-ভিখারী ভেবেছিলেন তাকে। পথশ্রমে ক্লান্ত ধূলি-ধূসরিত মানুষটা যে সেই জমিদার বাড়ির আলালের ঘরের দুলাল এ কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যা হোক, শেষ পর্যন্ত ওর কাছে সব কথা শুনেছিলেন। দেবানারায়ণবাবু নিজেও একদিন সংসার ছেড়ে এভাবে বেরিয়ে এসেছিলেন। গোঁড়া কায়স্থ পরিবারের সন্তান তিনি-দীক্ষা নিয়েছিলেন ব্রাহ্মধর্মে। শিবনাথ শাস্ত্রীর সাক্ষাৎ শিষ্য। ছবি আঁকার সখ ছিল দেবনারায়ণবাবুর। শিখেছিলেন আর্ট স্কুলে। শিক্ষকতা করেছেন আর্য মিশনে, সংসার করেছেন, উপাসনা করেছেন, উপার্জন করেছেন–আজ অবসরপ্রাপ্ত জীবনে আশ্রয় নিয়েছেন ছেলের সংসারে। ছেলে রেলের মালবাবু–রেলের কোয়ার্টার্স পেয়েছে। ছাত্রকে চিনতে পারার পর তাকে কোলে টেনে নিয়েছিলেন দেবনারায়ণবাবু। ওর আগ্রহ দেখে প্রাণ ঢেলে শিখিয়েছেন এ কদিন। পরিপ্রেক্ষিতে মূল সূত্র, টেম্পারা আর ওয়াশ পদ্ধতির পার্থক্য, ট্রান্সফারিং, তেলরঙের কাজ। অসীম উৎসাহ তাঁর ছাত্রের। দিনের মধ্যে আঠারো ঘন্টা কাজ করত সে। ছোট্ট রেলের কোয়ার্টার্স। দু কামরার বাড়ি। একটিতে থাকে পুত্র পুত্রবধূ, দ্বিতীয়টায় থাকতেন বিপত্নীক বৃদ্ধ। চন্দ্রভানকে থাকতে দিয়েছিলেন সেখানেই।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতাটা ভিন্সেন্ট কোনদিন ভুলবে না।
চন্দ্রভান যে ক্রমাগত ওঁর ড্রইংক্লাসে ফাঁকি দিত একথা দেবনারায়ণবাবু ভোলেননি। পরীক্ষায় নম্বরও সে কোনদিন বেশি পায়নি। ওদের ক্লাসে ফার্স্ট হত বটুকেশ্বর, কখনও বা দ্বৈপায়ন। ফঁকিবাজ চন্দরটা আজ ছবি আঁকা শিখবার জন্য তার কাছে এভাবে ছুটে এসেছে শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ। বলেছিলেন, কতদিন হল এ ভূত ঘাড়ে চেপেছে?
–দিন পনের হল, স্যার।
— হঠাৎ ছবি আঁকার জন্য এমন পাগল হয়ে উঠলি কেন রে?
-ঐ যে বললাম স্যার। কোলিয়ারির মালকাটাদের লড়াইয়ে মাথা গলিয়েছিলাম। হেরে গিয়ে মনটা একেবারে ভেঙে পড়ল। সময় কাটাবার জন্য একদিন ছবি আঁকতে বসেছিলাম। অদ্ভুত ভাল লাগল। তারপর ক্রমাগত অনেকগুলো ছবি এঁকেছি। কিন্তু ঠিক মনোমত হয়নি। আঁকতে ভীষণ ভাল লাগে, অথচ, আঁকতে পারছি না। কোথায় ভুল হচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। তখন আপনার কথা মনে হল
আর অমনি পঞ্চাশ মাইল পথ হেঁটে চলে এলি? পাগল কোথাকার!
ভিন্সেন্ট একটি স্কেচ বের করে দেখায়। টেবিলের স্তূপ থেকে একটি মেয়ে কয়লার টুকরো বেছে ঝুড়িতে ভরছে, ছবিখানা দেখে উচ্চৈঃস্বরে হেসে ওঠেন অভিজ্ঞ আর্টিস্ট। বলেন, –চন্দ্র! কিছু মনে করিস নে বাবা! তোর দ্বারা হবে না! এ কিছুই হয়নি।
ছবিটা যে ঠিকমত আঁকা হয়নি এ বোধ ভিন্সেন্টের নিজেরই ছিল। সে মাথা নিচু করে বসে থাকে। দেবনারায়ণবাবু তার দৃঢ় ভাষণে বোধহয় ঈষৎ লজ্জিত হয়ে পড়েন, সামলে নিয়ে বলেন, মানে, অনেক দিন মকসো করতে হবে। এ ছবি কিছু হয়নি। ফিগর অব এইট হেডস্ কাকে বলে জানিস?
ভিন্সেন্ট মাথা নাড়ে।
একটি প্রামাণিক বিলাতি বই বার করে দেবনারায়ণবাবু ওকে দেখাতে থাকেন হিউম্যান ফিগার আঁকার মূলসূত্রগুলি। একটা মানুষের মুখটা যত বড় তার গোটা দেহের উচ্চতা তার আটগুণ। কেন্দ্রবিন্দু তার যৌনমণ্ডলউপর দিকে চার ভাগ, নিচের দিকে চার ভাগ। ফিমার-বোন দু-ভাগ। হাঁটু থেকে গোড়ালি দু-ভাগ। তেমনি উপর দিকে যৌনমণ্ডল থেকে নাভি, নাভি থেকে স্তনবৃন্তের সংযোজন-রেখা, সেখান থেকে চিবুক, এবং চিবুক থেকে ব্রহ্মতালু এরা প্রত্যেকে দৈর্ঘ্যে সমান একভাগ। এই হল পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মতে মানবদেহের অক্টেভ। এই সারেগামা-পাধানিসার ছন্দে গ্রীক ভাস্কর্য থেকে রেনেসাঁ, সেখান থেকে মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগে নানান সঙ্গীত গেয়েছেন চিত্রকরের দল। এই প্রপোর্সান হচ্ছে মানবদেহ অঙ্কনের মূলসূত্র। আবার দেখ প্রাচ্য পণ্ডিতদের হিসাব। প্রাচীন হিন্দু শিল্পশাস্ত্রকারেরা বললেন, সব মূর্তি এক রকম হবে না। প্রথমে দেখতে হবে কী ভাবের ব্যঞ্জনা করতে চাইছ। সাধারণ নরমূর্তি হবে দশতল; ক্রূর মূর্তি দ্বাদশতাল; আসুর মূর্তি–যোড়শতাল। আবার যদি স্নিগ্ধভাব ফোটাতে চাও, তাল কমাও। কুমার মূর্তি ষট্তাল, বালামূর্তি পঞ্চতাল। তাল কি? তাল হচ্ছে একটা মাপ। শিল্পীর নিজমুষ্টির এক-চতুর্থাংশকে বলে এক আঙুল। এই রকম দ্বাদশ আঙুলে, বা তিন মুষ্টিতে হয় এক তাল। দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে শেষে বলেন, তাহলে বুঝে দেখ চন্দর, তোর এই কুলি রমণীটি না পাশ্চাত্য আদশে না ভারতীয় আর্দশে কোনভাবেই কোন তাল-লয়-মান মেনে আঁকা হয়নি!
