তার চেয়েও করুণ অধ্যায় ওর বিশ্বাসের ভিতটা গেছে নড়ে। কোথায় তার দীনের বন্ধু পরম করুণাময় ঈশ্বর? কোথায় সেই শিষ্টপালন দুষ্টদমন ন্যায়াধীশ? সব মিথ্যা! সব ভুল! ঈশ্বর নেই! থাকলেও তিনি হয় মূক, নয় বধিরনাহলে উদাসীন! ধরা যাক যোসেফ মুর্মুর মৃত্যুর কথাটা। লোকটা মৃত্যুর উল্লেখ সইতে পারত না। কয়লাখনির আগুনের বেড়াজাল ভেদ করে বেরিয়ে এসেছিল ঠিক–অথচ বাঁচল না। কী প্রয়োজন ছিল ঈশ্বরের ঐ ধর্মভীরু মানুষটাকে বাইরে টেনে এনে ওভাবে দশ দিন। বাঁচিয়ে রাখার? সর্বাঙ্গে দগদগে ঘা নিয়ে লোকটা ক্রমাগত কাতরেছে আর মৃত্যু কামনা করেছে। জ্ঞান ছিল শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল তার। ভিন্সেন্ট বসেছিল ওর মৃত্যুশয্যার পাশে। ও শুধু দেখছিল ঐ অসহায় মানুষটাকে–যার একমাত্র কামনা ছিল, যন্ত্রণার অবসান-মৃত্যু! এই কি করুণাময় ঈশ্বরের লীলা? দশ দিন লোকটাকে ঐভাবে জিইয়ে রাখায়?
এরই মধ্যে ওর কাছে একটা হাতচিঠি পাঠিয়েছিল চিত্রলেখা। মালকাটাদের একটা বাচ্চার হাতে। প্রেমপত্র পড়ে মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল ভিন্সেন্টের। এরা কি মানুষ? কোলিয়ারির এতবড় সর্বনাশের সময় চিত্রলেখা গৃহত্যাগের স্বপ্ন দেখেছে! ঐ ছেলেটার হাতেই কড়াসুরে জবাব পাঠিয়েছিল ভিন্সেন্ট। লিখেছিল, এভাবে যেন ভবিষ্যতে চিত্রলেখা তাকে আর বিরক্ত না করে!
ফাদার শারদাঁকে কোন চিঠি দেয়নি এখানে আসার পর। এবার লিখেছে। সব লিখেছে। সব কথা জানিয়ে। নির্দেশ চেয়েছে এবার সে কি করবে। ফিরে যাবে? উত্তরের প্রতীক্ষায় দিন গুনছে ভিন্সেন্ট। কলাকুঠির জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কেউ ওর সঙ্গে কথা বলে না। একমাত্র ব্যতিক্রম ঐ নষ্ট মেয়েমানুষটাবাসী। রোজ সকালে এসে একঘটি দুধ সে আজও খাইয়ে যায় তাকে। নানকু নেইদুধের পরিমাণটা বেড়েছে। কমেছে প্রগম্ভতাটা। কৌতুকময়ী দেহোপজীবিনী যেন সে নয়, সন্তানহারা অভাগিনী আজ।
হাতে কাজ নেই, মনটা ফাঁকা, প্রতীক্ষা করছে ফাদার শারদাঁর নির্দেশের। অলস ভঙ্গিতে দিন কেটে যায়। একদিন হঠাৎ কি খেয়াল হল, এক টুকরো কাগজ আর পেন্সিল নিয়ে সামনের ঐ সেতুটা আঁকতে বসল। আর কিছু নয়, সময়টা তো কাটবে। এ-পারে তেঁতুলডাঙার ঊষর বন্ধ্যা মাঠ, ও-পাশে জোড়-জাঙ্গাল কেলিয়ারির নিষিদ্ধ জীবনছন্দ–মাঝখানে ক্ষীণ একটা কাঠের সেতু। কতকগুলি মালকাটা স্নান করছে। কাপড় কাঁচছে। একটা ছোট ডিঙি নৌকাও বাঁধা আছে। সাঁকোর উপর দিয়ে মাঝে মাঝে পার হয়ে যাচ্ছে এক ঘোড়ার গাড়ি, গো-যান।
সারাটা দিনমান ভিন্সেন্ট ঐ সাঁকোটার ছবি আঁকল বসে বসে।
আশ্চর্য একটা অনুভূতি। দিনটা কোথা দিয়ে কেটে গেল টের পায়নি। ও বিশেষ কিছু মনে করে আঁকতে বসেনি, চেয়েছিল শুধু সময়টা কাটাতে কিন্তু ছবিখানা শেষ করে ওর মনে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি এল।
কাগজের চতুঃসীমায় আবদ্ধ ঐ ছোট্ট ভূখণ্ডে ঈশ্বরের সৃষ্ট দুনিয়া নয়–এ তার নিজের সৃষ্ট জগৎ! এখানে তার হুকুমে সব কিছু চলবে। এখানকার মালকাটারা নেমকহারাম নয়, এখানকার যোসেফ মুর্মু আগুনে পুড়ে মরে না, এখানকার নানকুকে সে তার বারাঙ্গনা মায়ের কোল খালি করে পালাতে দেবে না! এ রাজ্যের একছত্র মালিক ভিন্সেন্ট ভান গর্গ–কোনও খেয়ালী, উদাসীন বিশ্বনিয়ন্তা নন!
আশ্চর্য! আশ্চর্য! এ এক অদ্ভুত অনুভূতি!
ছবিটার দিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ছবিটা ভাল হয়নি। চোখের সামনে যা দেখেছে তা ফুটে ওঠেনি কাগজের বুকে। পরিপ্রেক্ষিত সম্বন্ধে ওর ধারণা নেই। দৃশ্যপটের বিলীয়মান বিন্দু কাকে বলে জানে না। দেবনারায়ণবাবুর ক্লাসে যদি আর একটু মন দিয়ে ছবি আঁকা শিখত, তাহলে আরও ভাল করে আঁকতে পারত। তা হোক, ও তো ঐ সাঁকোটার হুবহু ছবি আঁকতে চায়নি। ও চেয়েছিল ওর মনগড়া একটা মিলন-সেতু রচনা করতে। ওর সেতু তেঁতুলডাঙার ঊষর বন্ধ্যা মাটির সঙ্গে জোড় জাঙ্গালের কোলিয়ারিকে যুক্ত করেনি করেছে ওর নিরীশ্বর নিরানন্দ উষর জীবনের সঙ্গে শিল্প-জগতের নূতন আনন্দলোকের। এ তার মনোময় সাঁকো, তার অন্তর্লোকের একটি ভাবরূপ সে মূর্ত করেছে ঐ কাঁচা হাতের ছবিখানায়।
একটা নূতন অনুভূতি, নূতন চেতনা। না, ভিন্সেন্টের সবকিছু শূন্য হয়ে যায়নি। সে নূতন মনোময় জগৎ সৃষ্টি করবে-কাগজের বুকে, ক্যানভাসের উপর! ফাদার শারদাঁ ওকে উপনিষদ থেকে পড়িয়েছিলেন-ব্ৰহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা! আজ অপরিসীম বেদনার মধ্যে দিয়ে ভিন্সেন্ট উপলব্ধি করল আর একটা নূতন সত্য ব্ৰহ্ম মিথ্যা, জগৎ সত্য!!
এ জগৎকে সে নূতন করে সৃষ্টি করবে। সে শিল্পী হবে, চিত্রকর হবে। এই তার জীবনের নূতন দীক্ষা!
মনে পড়ল সিস্টিন চ্যাপেলে আঁকা মিকেলাঞ্জেলোর শেষবিচারের সেই অনবদ্য চিত্রটির কথা। ঈশ্বর অলীক, ঈশ্বর মায়া–কিন্তু যীসাস বাস্তব সত্য! তার দুঃখ ভোগ কোন ধর্মযাজকের কল্পনাবিলাস নয়! মিকেলাঞ্জেলো সেই যীসাস ক্রাইষ্টকে চিরাচরিত পদ্ধতিতে আঁকেননি–অনশনক্লিষ্ট, শীর্ণকায়, নতশির প্রৌঢ় মানুষটি নন, তাঁর হাতেপায়ে পেরেকের দাগ আর আনত মস্তকে মৃত্যু-যন্ত্রণার ব্যঞ্জনা নয়–মিকেলাঞ্জেলো যীসাসকে এঁকেছেন উনিশ বছরের তরুণের রূপে। শালপ্রাংশু মহাভুজ তিনি, পেশীবহুল দীর্ঘ অবয়ব, গ্রীক দেবতা অ্যাপোলোর মত, গোলিয়াহ্ম ন ডেভিডের মত, নিমীয়া সিংহদলন হারকিউলিসের মত! এমন যীসাসকে ঈশ্বর গড়তে পারেননি, পেরেছেন। মিকেলাঞ্জেলো বুয়োনারতি! ঈশ্বর যা পারেন না, শিল্পী তাই পারে!
