ভিন্সেন্ট আপত্তি তোলে, -সে কি! আমাদের ফিউনারাল সার্ভিস এখনও শেষ হয়নি!
-তুমি থাম তো হে ছোকরা!–ধমক দিয়ে ওঠেন রেভারেণ্ড মার্লো।
মালাকাটর দল সদলবলে বেরিয়ে যায়।
ঘর খালি হতে রেভারেণ্ড মার্লো মুখোমুখি দাঁড়ালেন অনশনক্লিষ্ট কঙ্কালসার মানুষটার সামনে। রেভারেণ্ড সাহেবের নিখুঁত পাদ্রীর পোশাক। ভিন্সেন্টের অনাবৃত দেহটা আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলেন, –তোমার লজ্জা হয় না! হ্যাভ য়ু নো সেন্স অফ ডিসেন্সি অর ডেকোরাম? খালি পা, খালি গা, তুমি সার্মন দিচ্ছ শুয়ে শুয়ে মেথডিস্ট চার্চে! প্রভু যীসাসের মহিমা তুমি কোন্ আস্তাকুড়ে লুটিয়ে দিয়েছ বুঝতে পার না? তুমি কি পাগল?
-পাগল নয়, শয়তান! ডেভিল!–ফোড়ন কাটে নাথানিয়াল।
ভিন্সেন্ট কি যেন বলতে যায়, পারে না।
রেভারেণ্ড মার্লো গম্ভীরস্বরে বলেন, মঁসিয়ে ভান গর্গ, আমি দুঃখিত; কিন্তু এই মুহূর্তে আমি আপনাকে বরখাস্ত করছি। পবিত্র মেথডিস্ট চার্চের সঙ্গে অতঃপর আপনার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। আপনি আপনার মালপত্র নিয়ে এ চার্চ ছেড়ে এখনই চলে যান। একে আর অপবিত্র করবেন না।
এবারেও কোন জবাব দিল না ভিন্সেন্ট।
–ওয়েল, মঁসিয়ে ভান গর্গ, আত্মপক্ষ সমর্থন করে আপনার কি কিছুই বলার নেই?
একমাথা রুক্ষচুল সমেত মাথাটা নেড়ে ভিন্সেন্ট জানায়, না!
আপনাকে ফিরে যাবার ট্রেন ভাড়াটা দিয়ে যাব কি?
নিচু হয়ে বিছানাটা গুটিয়ে তুলছিল সে। এবারও মুখ না তুলে মাথা নেড়ে অস্বীকার করে।
রেভারেণ্ড এবার নাথানিয়ালের দিকে ফিরে বলেন, এ লোকটি বেরিয়ে গেলে দরজায় তালা দিতে বলুন। যতদিন আমরা পুনরায় কোন ক্রিশ্চিয়ান মিনিস্টার পাঠাতে না পারছি ততদিন চার্চ বন্ধ থাকবে।
নাথানিয়াল একটি অভিবাদন করে বলেন, –যথা আজ্ঞা ফাদার। এবার দয়া করে আমার গরীবখানায় চলুন। ওখানে সব ব্যবস্থা হয়েছে।
ওঁরা সদলবলে বেরিয়ে গেলেন।
চন্দ্রভানও তার বিছানার বাণ্ডিল ও ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতে আবার পথে নামে।
সামনে নীরন্ধ্র অন্ধকার।
.
০৬.
নতুন করে জীবনের সালতামামি করতে বসেছে ভিন্সেন্ট। সব কিছুই শূন্য হয়ে গেছে হঠাৎ। উনিশ বছরের জীবনেই সব কিছু ফুরিয়ে গেল যেন। বাপ মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল শৈশবে-দুরন্ত অভিমানে সব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল; জীবনের নূতন অর্থ খুঁজে পেয়েছিল ফাদার শারদাঁর আশীর্বাদে। ঈশ্বরের উপর নির্ভর করতে শিখেছিল। দৃঢ় বিশ্বাসের সম্বলটুকু নিয়ে এখানে এসেছিল সেবা করতে, ঈশ্বরের জয়গান গাইতে। বাধা পেল দুদিক থেকেই। চার্চ থেকে বিতাড়িত হল, গীর্জায় তার প্রবেশ মানা। মুখ ফিরিয়ে নিল কুলি-ধাওড়ার মানুষগুলো–যাদের সেবা করতে, যাদের ভালবাসতে সবকিছু ছেড়ে সে ছুটে এসেছিল এখানে। সে আঘাতটাই বেশি করে বেজেছে ওর।
দুর্ঘটনায় ওরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তিল তিল করে ওদের স্বাভাবিক করে তুলবার চেষ্টা করছিল ভিন্সেন্ট! যোসেফ মুর্মু নেই, এককড়ি সরখেল মারা গেছে– ওরা ওদের ফাদারদাকেই দলপতি ঠাওরালে। ভিন্সেন্ট শ্রমিক আন্দোলনের কিছুই জানে না; সাধারণ বুদ্ধিতে ওর মনে হয়েছিল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে কব্জা করতে হলে এদের দলবেঁধে প্রতিবাদ করতে হবে। বেশি কিছু চায়নি তারা কিছু নিরাপত্তার ব্যবস্থা, ভরপেট খাওয়ার মত মজুরি, আর দুর্ঘটনায় মৃত মালকাটাদের অসহায় পরিবারবর্গের জন্য কিছু সাহায্য। কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করল না। ভিন্সেন্ট ওদের ঘরে ঘরে গিয়ে পরামর্শ দিয়েছিল, কেউ কাজে যাবি না, দেখি ওরা কতদিন কয়লাকুঠি বন্ধ করে রাখতে পারে?
নিদারুণ অভিমানে ওরা সায় দিয়েছিল, হঁ! ই কি মঘের মুলুক বটে? মোরা কেউ যাবক নাই!
ফলে যা হয়ে থাকে। তিল তিল করে অনশনের মুখে এগিয়ে যায় মানুষগুলো। অর্ধাহার, অনাহার–পেট বড় অবুঝ! জমানো পুঁজি কারও নেই। ধার মেলে না। ওরা মরিয়া হয়ে ওঠে।
ভিন্সেন্ট বলে, –তোরা ধাওড়া ছেড়ে নিজের নিজের দেশঘরে ফিরে যা!
দেশঘর? সেটা আবার কি? ওরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এই ধাওড়াই তো তাদের দেশঘর। এখানেই জন্মেছে, এখানেই মরতে দেখেছে বাপ-জ্যাঠাদের। জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির বাইরে যে দুনিয়া আছে এটা ওরা জানেই না। মাঝে মাঝে গেছে রাণীগঞ্জ, বরাকর, আসানসোল; কিন্তু সেখানে কে ওদের খেতে দেবে? থাকতে দেবে?
শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে হল। মাথা নিচু করে বারোদিন অনশনের পরে ওরা গুটি গুটি এসে হাজির হল কয়লাকুঠির ফটকের সামনে।
পাঁচু হালদারের দল হেসে বলে, –সেই তো পানি খেলি, তবে কেন জল ঘোলালি?
সবচেয়ে করুণ অধ্যায়–এ নিদারুণ পরাজয়, এ অপমানের জন্য ঐ মালকাটার দল ঈশ্বরকে অভিশাপ দিল না, কর্তৃপক্ষকে গাল পাড়ল না, উল্টে দায়ী করল তাদের ফাদারদাকে। সেই তো কাজ বন্ধ করার পরামর্শটা দিয়েছিল প্রথমে! ওরা তাকে এড়িয়ে যায়। পাঁচু হালদারের দলও তাই চায়, বলে, –ঐ ফাদারদার সাথে যে বাৎ করবে তারে ছাঁটাই করব কিন্তু!
গীর্জা থেকে বিতাড়িত হয়ে ভিন্সেন্ট এসে উঠেছে তেঁতুলডাঙার মাঠে, সন্ন্যাসীর পরিত্যক্ত কুটিরে। হেরে গেছে সে। সব দিকে। কোলিয়ারিতে সে অবাঞ্ছিত। কর্তৃপক্ষ, চার্চ-সম্প্রদায়, মায় মালকাটারাও তাকে পরিহার করে চলে। এ-পাশে তেঁতুলডাঙার কোলিয়ারি। মাঝখানে সিঙারণ নদী। ভিন্সেন্ট আজ অন্তেবাসী। একা।
