পঙ্খিরাজ নয়, আজ ফাদারদা বলেই ডাকল ওকে।
কোনদিন বাতাসীর গাত্রস্পর্শ করেনি। আজ ঐ কুলটা মেয়েটির বাহুমূল ধরে ভিন্সেন্ট ওকে উঠিয়ে বসায়। কোঁচার খুঁটি দিয়ে ওর কয়লামাখা মুখটা মুছিয়ে দেয়, রুক্ষ চুলে হাত বুলায়। কী সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায় না।
চারদিনের দিন আবার সিটি বাজছে কারখানার হাজরি-ঘরে। শোকসম্বরণের নির্দেশ। যে-যার কাজে যাও। মৃত্যু যেন জীবনের পথরোধ করে না দাঁড়ায়। পৃথিবীর বুক থেকে কালো-হীরে আহরণের এ বিরাট উদ্যোগ তো চিরকাল বন্ধ হয়ে থাকবে না কজন মালকাটার অকাল মৃত্যুতে। পেট বড় অবুঝ। সেই পেটের দায়ে ফিরে এসো আবার। চোখের জল মোছ, তুলে নাও গাঁইতা আর খাঁচিয়া। আর ডেভিস-ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোকবর্তিকা। নেমে যাও গুটিগুটি অবক্ষয়ী জীবনের ঐ অতল খাদে!
ওরা সে নির্দেশ মানল না। কেউ হাজিরা দিতে এল না।
স্ট্রাইক কাকে বলে ওরা জানে না, ধর্মঘট কথাটা ওরা শোনেনি। কেউ কোন নির্দেশ দেয়নি, মিটিং করেনি, কারও পরামর্শ অথবা প্রচারের প্রয়োজন হল না। কলয়াখনির হাজিরার ভেঁা বেজেই গেল। ওরা কাজে এল না কেউ।
কোলিয়ারির কাজ বন্ধ রইল। একদিন। দুদিন।
পাঁচু হালদারের দল এল ধাওড়ায়। বোঝালো। শাসালো। নতুন মালকাটা আমদানি করার হুমকি দেখালো। এরা কোন জবাব দিল না। জবাবদিহি করল না। ভিন্সেন্ট ওদের কাজ বন্ধ করার কথা বলেনি, সে কথা ওর মনেও আসেনি। ও শুধু ওদের সকলকে ডাক দিল গীর্জায়। সন্ধ্যাবেলা সকলকে সমবেত হতে বলল। যে আটান্নজন মানুষ ঐ দুর্ঘটনায় মারা গেল, যাদের আর দেখা যাবে না এই জোড়-জাঙ্গাল কয়লাকুঠিতে তাদের আত্মার সঙ্গতি কামনায় ওরা সমবেত প্রার্থনা করবে। ব্যাপারটা ওরা বুঝতে পারল না ঠিক। এমন কথা ইতিপূর্বে ওরা শোনেনি। আত্মার সঙ্গতি কামনা আবার কি? নিদারুণ শোকে এমনিতেই ওরা বিহ্বল। তবে নাকি ওদের ফাদারদার আহ্বান। তাই সাড়া দিল ওরা। সন্ধ্যাবেলা গুটিগুটি এসে হাজির হল শোকবিহ্বল শীর্ণকায় নগ্নগাত্র কজন মানুষ। সাঁওতাল, উঁইহার, কুর্মি, কোল, বাগদি, নমশূদ্র। হিন্দু-মুসলমান এবং খ্রীষ্টান। উবু হয়ে বসল গীর্জার ভিতর।
দুর্ঘটনা ঘটার পর পাঁচদিন কেটে গেছে। এ কদিন বস্তুত চন্দ্রভানের পেটেও কিছু অন্নজল পড়েনি। পাঁচু হালদারের বাড়ির ব্যবস্থা তো অনেকদিন ঘুচে গেছে। এতদিন মালকাটারাই তাদের মুখের গ্রাস থেকে যা তোক কিছু দিয়ে যেত। এখন তাও বন্ধ। তাদের মাথার ঠিক নেই। বাতাসীও তার সকালের দুধের যোগান দিতে আসে না। নানকুর মৃত্যু আর যোসেফের শিশুর ব্যাপারে সেও ভুলে গেছে ফাদারদার কথা। এ কদিন কি খেয়েছে মনে নেই ওর। কোথাও কারও ছাপরায় কেউ যদি হাত বাড়িয়ে কিছু দিয়ে থাকে অভ্যাসবশে মুখে পুরেছে। চোখদুটো তার কোটরে বসে গেছে। গালে গজিয়েছে কদিনের না কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি। খালি গা, খালি পা। কোঁচার খুটটা জড়িয়েছে গায়ে। খ্রীষ্টান শোকাঁচার নয়-মহাগুরুনিপাতের অশৌচ পালন করছে যেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ।
উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। খড়ের বিছানাতেই আধশোয়া অবস্থায় সামন দিল ভিন্সেন্ট ভান গর্গ। জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির ঈভানজেলিস্ট। খাদের ভিতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে, দম বন্ধ হয়ে যারা মারা গেছে তাদের আত্মার সদ্গতি কামনা করল। এ দুনিয়ায় এসে সেই হতভাগ্য মানুষগুলো শুধু বঞ্চনাই সয়ে গেছে, যন্ত্রণাই ভোগ করে গেছে যে করুণাময় ঈশ্বর! এবার তুমি তাদের কোলে টেনে নিয়েছ, তোমার স্বর্গরাজ্যে তারা যেন শান্তি পায়।
কালি-ওঠা লণ্ঠনের ভূতুড়ে আলোয় মানুষগুলো উবু হয়ে বসে আছে। যোসেফ রোগশয্যায়। অনুপস্থিত। না হলে হয়তো শোনা যেত, –আমিন! ওরা কেউ কিছু বলল না। মাথা নিচু করে বসেই রইল।
হঠাৎ তীব্র একটা আলোর ঝলকানি। জোরালো একটা আলোর ধুমকেতু সমস্ত চত্বরটার উপর ঝাটা বুলিয়ে গেল। গীর্জার সামনে এসে দাঁড়ায় একটা হাওয়া গাড়ি। তারই হেডলাইটের আলো। মম ভারি জুতোর শব্দ। লোক লো ভয়ে কুঁকড়ে যায়। টর্চের আলো এসে পড়ে ভিন্সেন্টের মুখে। হাত দিয়ে সে চোখটা আড়াল করে। চিনতে পারে সে। কোনক্রমে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায়। আগন্তুকদল বিশিষ্ট অতিথি। ওঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে পাঁচু হালদার। ভিন্সেন্ট কোনক্রমে বলে, –আসুন রেভারেণ্ড মার্লো, আসুন ব্রাদার দাভিদ। আপনারা ঠিক সময়েই এসে পৌচেছেন। জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির আজ বড় দুর্দিন। দুর্ঘটনায় যে আটান্নজন দুর্ভাগা মানুষ মারা গেছে–
ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ভীড়ের পিছন থেকে নাথানিয়াল বলে ওঠে, — আটান্নজন নয়, এগারোজন!
তাকেও থামিয়ে দেন রেভারেণ্ড মার্লো। বলেন, আপনি শান্ত হন মিস্টার নাথানিয়াল। লেট মি ট্যাকল দ্য সিচুয়েশন।
রেভারেণ্ড দাভিদের দিকে ফিরে বলেন, –এ যে অবিশ্বাস্য! আমরা কি ভারতবর্ষে আছি, না আফ্রিকার জঙ্গলে এসে পৌঁছেছি?
মাথা নেড়ে দাভিদ বলেন, জানি না কতটা ক্ষতি ও করেছে। এ মানুষগুলোকে আবার কোনদিন ক্রিশ্চিয়ান করা যাবে কিনা তাই ভাবছি আমি।
রেভারেণ্ড মার্লো পঞ্চাননকে বলেন, ঐ লোকগুলোকে চলে যেতে বল।
ইংরাজি আদেশটা অনুবাদ করা প্রয়োজন হল না। লোকগুলো বুঝতে পারে। তারা উঠে দাঁড়ায়। আতঙ্কতাড়িত মানুষগুলো দ্বারের দিকে এগিয়ে যায়।
