চন্দ্রভান খবর পেয়ে যখন খাদ-ভসকার সামনে এসে দাঁড়াল, তখন সেখানে চাপ ভীড়। অসহায় মানুষগুলো ছোটাছুটি করছে, আর্তকণ্ঠে বিলাপ করছে, খাদে নামতে চাইছে। গুর্খা সেপাইয়ের দল কাঁটাতারের বাইরে ওদের ঠেকিয়ে রেখেছে। ভিতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ভীড় হঠাও-তফাৎ যাও!
চন্দ্রভান হঠাৎ দেখতে পায় বাতিঘর থেকে লণ্ঠন নিয়ে এককড়ি এদিকেই আসছে ছুটতে ছুটতে। চন্দ্রভান ছুটে এসে চেপে ধরে ওর বাহুমূল। বলে, কতজন আছে খাদের ভিতরে?
-বারোটা সেল। প্রতি সেলে পাঁচজন।
–ওদের বাঁচানো যাবে না?
–তা কেমনে বলব? হাত ছাড়ুন, আমি নিচে যাব।
আমাকেও সঙ্গে নাও সরখেল।
না। এলেমদার না হলে চলবে না। আপনি উপরে থাকুন। আরও চারজন এক্সপার্ট হেল্পারের সঙ্গে এককড়ি সরখেল নেমে গেল অগ্নিগর্ভ খাদের ভিতরে।
কাঁটাতারের ওপারে একটা অবর্ণনীয় দৃশ্য। ভয়ে আতঙ্কে হতাশায় মানুষগুলো দিশেহারা। শিশু আর নারীর দল বীভৎস চিৎকার জুড়েছে। কারও মরদ, কারও জেনানা, কারও বাচ্চা নিচে আছে। গুর্খা সেপাইয়ের শাসন ওরা মানছে না, কাঁটাতারের বাধা মানছে না, ভীড় ঠেলে বারে বারে এগিয়ে আসছে।
-মুনিয়া রে! এ মেরা মুনিয়া!
কারও মুনিয়া, কারও না, কারও বুলাকি। মায়ের প্রাণ, ওরা মানবে কেন?
একটু পরেই খাঁচাটা উঠে এল উপরে। খাঁচা থেকে ধরাধরি করে তিনটি অচৈতন্য অগ্নিদগ্ধ দেহ নামিয়ে আনে হেল্পারের দল। দুটি বাচ্চা, একটা পূর্ণদেহী মানুষ। সর্বাঙ্গ পুড়ে গেছে।
-কৌন হ্যয়? কৌন? জিন্দা ইয়ে মুর্দা?
–নাম বুলছ না কেনে গ তুমরা?
নাম বলবে কেমন করে? চিনতেই কি পেরেছে ছাই! খাদের আগুনে শুধু রূপ নয়, নাম ও রূপ দুই-ইবিসর্জন দিয়ে এসেছে যে ওরা। সনাক্তের অতীত। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত এমনভাবে ঝলসে গেছে যে, তারা এখন-পরিচয়ের বাইরে। গেটের সামনে ওদের নামিয়ে দিয়ে রেসকিউ-পার্টির ছেলেগুলো আবার ছুটে ফিরে গেল খাঁচায়। আবার নিচে যাবে ওরা।
আতঙ্কের যে তুঙ্গশীর্ষে উঠলে মানুষের হিতাহিত বোধ হারিয়ে যায় ওরা সেখানে এসে পৌঁছেছে। আত্মীয়-বিয়োগব্যথা ভুলে মানুষগুলো ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় ঐ অগ্নিদগ্ধ বীভৎস মূর্তি তিনটি দেখে। চন্দ্রভান চিৎকার করে ওঠে, কি দেখছিস তোরা? তেল, তেল, কিছু নারকেল তেল নিয়ে আয় শীগগির! ঢেকে দে পোড়া ঘাগুলো, হাওয়া না লাগে!
গায়ের সুতির চাদরটা খুলে সে প্রথমেই ঢেকে দেয় পূর্ণাবয়ব মানুষটির সর্বাঙ্গ।
চারদিকে তাকিয়ে দেখে ভীড়ের মাঝখানে যারা আছে তাদের সঙ্গে লেংটি অথবা খাটো ধুতি। মেয়েদের একটি করে লাজবস্তু। একেবারে উলঙ্গ না হলে ওরা একটুকরো কাপড় দিয়েও সাহায্য করতে পারবে না। তাছাড়া ওদের কাপড় কয়লায় ভর্তি, ময়লায় ভরা। ঐ কাপড়ে অগ্নিদগ্ধ অঙ্গগুলি ঢেকে দিলে সেপটিক হয়ে যেতে পারে। ইতিমধ্যে কে বুঝি কোথা থেকে এক বোতল নারকেল তেল এনে ফেলেছে। চন্দ্রভান নিজের হাফসার্টটা খুলে ফেলে, গেঞ্জিটাও। ফালা ফালা করে ব্যাণ্ডেজ বানায়। তেলে ডুবিয়ে বাচ্চা দুটোকে আপাদমস্তক বেঁধে ফেলে।
সমস্ত দিনরাত এবং তার পরের পুরোটা দিন উদ্ধারকারীর দল কাজ করে গেল। বরাকর, আসানসোল থেকে গাড়ি করে সাহেবরা এলেন। খাদের ত্রিসীমানায় মালকাটাদের যেতে দেওয়া হল না। সর্বসমেত এগারোটি মৃতদেহ উঠিয়ে আনতে পেরেছিল ওরা। প্রথম খেপে যে তিনজন উঠেছিল তার ভিতর বাচ্চা দুটি বাঁচেনি। শুধু বেঁচেছিল তখনও ঐ পূর্ণাবয়ব মানুষটা। দুর্জয় প্রাণশক্তি তার। শেষ পর্যন্ত, অবশ্য তাকে সনাক্ত করা গেছে। দেহটা তিন নম্বর পিটের মালকাটা যোসেফ মুর্মুর। একমাত্র সেই বেঁচে ফিরেছে। তবে এবার সেজন্য তাকে অভিনন্দন জানাবার কেউ নেই। যোসেফের বউ, বড় ছেলে এবং কিষ্টো রয়ে গেছে খাদের নিচে!
আটচল্লিশ ঘন্টা একটানা উদ্ধারকার্য চালানোর পর এ ব্যর্থ প্রয়াস বন্ধ হল। এখন আর ওদের উদ্ধারের চেষ্টা করা পণ্ডশ্রম। এতক্ষণ ওরা বেঁচে থাকতে পারে না। পারা সম্ভবপর নয়। আগুনে যদি নাও পুড়ে থাকে, বাতাসের অভাবে এতক্ষণে মারা গেছে নিশ্চয়।
শেষ মৃতদেহ যেটি ওরা উঠিয়ে আনল সে দুর্ঘটনায় মরেনি। কারণ সে পিটে নেমেছিল বিস্ফোরণের আধ ঘন্টা পরে। লোকটা ওভারম্যান এককড়ি সরখেল।
নিদারুণ শোকের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেল জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির জীবন-যাত্রা। বলয়ার হাউসে আগুন নিভল, পিট-হেড গিয়ারের বিরাট চাকাটা থেমে রইল, সিটি বাজল না সকাল সন্ধ্যায়। ঘরে ঘরে শুধু মড়াকান্না। কারও মরদ, কারও স্ত্রী, কারও বা সন্তান। ইনিয়ে বিনিয়ে কাদা ছাড়া আর কি জানে ওরা? যোসেফ মর্মু বেঁচে আছে। এখনও, জ্ঞান আছে, কথা বলতে পারে না। হাসপাতাল বলে কোন কিছু নেই জোড় জাঙ্গালে। যোসেফ আছে তার নিজের ছাপরায়। একাই পড়ে আছে। ওর একটা বাচ্চা আশ্রয় পেয়েছে ঈশাকের কাছে; দ্বিতীয়টা নিয়ে গেছে বাতাসী। আশ্চর্য মেয়েটা! মান্ধুর মৃত্যুতে আছাড় খেয়ে পড়েছিল প্রথমটায়। কিন্তু সামলে নিতে সময় লাগেনি তার। দুদিনেই উঠে বসেছে আবার। তার শূন্য ঘর আবার পূর্ণ করেছে যোসেফের মা মরা শিশুটিকেই আশ্রয় দিয়ে। ভিন্সেন্ট ঘরে ঘরে-ঘুরে মরে। কী সান্ত্বনা জানাবে ভেবে পায় না। ঈশাক রুহিদাসের মেয়ে যোসেফের সেবার ভার নিয়েছে। বাতাসীর ছাপরায় ভিন্সেন্ট যখন গিয়ে দাঁড়াল, মেয়েটা ছুটে এসে লুটিয়ে পড়ল তার পায়ের উপর। ওর পায়ের উপর মুখ ঘষতে ঘষতে বললে, কেনে? কেনে? কেনে? তু তো বুতিস ভগবান দয়াময়? তাইলে কেনে উ মোর নানকুরে পুড়ায়ে মারলে? তু বল্ ফাদারদা– কী এ্যান্যায়টো করছিলম মোরা?
