–আমি! দরজা খুলুন!
–স্ত্রীলোকের কণ্ঠস্বর। বাতাসী? সে তো এমন রাতে আসে না কখনও? সকালবেলা যথারীতি এসে দুধ দিয়ে যায়। বারণ করলেও শোনে না।
–আমি কে?
দরজা খুলে দিন, আমি চিত্রলেখা!
বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় চন্দ্রভান। দ্বার খুলে দিতেই খোলা দরজা দিয়ে গীর্জায় ঢুকে পড়ে এক ঝলক ঠাণ্ডা হিমেল হাওয়া, আর সেই সঙ্গে একটি ভয়ত্রস্তা অভিসারিকা! একেবারে চন্দ্রভানের পায়ের উপর।
-ও কি করছ চিত্রলেখা? কী হয়েছে? এত রাত্রে তুমি কেমন করে এলে?
–আপনি আমাকে বাঁচান ফাদারদা!
বাঁচান? কেন, কী হয়েছে তোমার?
–আপনাকে ওরা মেরে ফেলবে। আপনি পালান!
তার মানে? ওঠ, উঠে বস তুমি। আমাকে ওরা মেরে ফেলবে, তাই তোমাকে বাঁচাতে হবে-কী আবোলতাবোল বকছ?
ওর কাধ ধরে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় দেখে চিত্রলেখার মুখে একবিন্দু রক্ত নেই। ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। থর থর করে একবার কেঁপে ওঠে সে। পরক্ষণেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ভিন্সেন্টের বুকের উপর। সবলে আঁকড়ে ধরে ওকে। বলে, –তুমি এখনই পালাও ফাদারদা, আজ রাত্রেই। আমাকেও নিয়ে চল!
সমস্ত শরীর অবশ হয়ে যায় চন্দ্রভানের। ওর উনিশ বছরের জীবনে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম। কোমল একটি নারীদেহের অমন অতর্কিত আলিঙ্গনে ভিন্সেন্ট একেবারে বিহ্বল হয়ে পড়ে। ওর বুকে মুখ লুকিয়ে চিত্রলেখা তখন ফুলে ফুলে কাঁদছে।
ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়। আস্তে আস্তে নিজেকে আলিঙ্গনমুক্ত করে মেয়েটিকে বসিয়ে দেয় খড়ের বিছানায়। বলে, –এত উতলা হচ্ছ কেন চিত্রলেখা? কী হয়েছে বল?
দুহাতে মুখ ঢেকে চিত্রলেখা বলে, –যা বলার তা তো বলেছি।
না, কিছুই বলনি তুমি। কেন আমি পালাব? কাকে ভয় করি আমি? আর তুমিই বা কেন যাবে আমার সঙ্গে? কোন্ অধিকারে তোমাকে আমি নিয়ে যাব? আমি খ্রীষ্টান, তুমি–
–আমিও যদি খ্রীষ্টান হয়ে যাই?
–তা কেন হবে চিত্রলেখা? কেন ধর্মত্যাগ করবে? আমার জন্য?
একটু চুপ করে থাকে মেয়েটি। কী ভাবে জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারে না। শেষকালে যে জবাবটা দেয়, তার অর্থ ঠিকমত বোধগম্য হয় না চন্দ্রভানের। সে নিজেই যদি অতটা উত্তেজিত না হয়ে থাকত তাহলে হয়তো বুঝবার চেষ্টা করত। চিত্রলেখা বললে, -মেয়েদের ধর্ম অন্য জিনিস! সেই ধর্ম বাঁচাতেই আমি ধর্ম ত্যাগ করতে চাইছি। তুমি আমাকে খ্রীষ্টান করে নাও।
-আমি যাজক নই। কাউকে ব্যাপটাইস করবার অধিকার আমার নেই।
একথা চিত্রলেখার উত্থাপিত প্রসঙ্গের পুরো জবাব নয়। চিত্রলেখার বক্তব্যের ভিতর কী একটা গূঢ় ব্যঞ্জনা ছিল, তার আত্মসমর্পণের ভঙ্গিটায়, তার ভাষায় সে আর কিছু একটা বলতে চাইছিল। সেটা নজর এড়াল চন্দ্রভানের। কেন? ওর কি তখন মনে পড়ে গিয়েছিল তার নিজের ধর্মত্যাগের ইতিকথা? এই কৃষ্ণসার অভিসারিকার ভিতর সে কি আর একটি গোরোচনা গোরিকে দেখতে পেয়েছিল তখন? বর্তমানের কি গলা টিপে ধরেছিল অতীত?
এতক্ষণে মুখ থেকে হাতখানা সরালো মেয়েটি। পূর্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলে, জানি, অত্যন্ত নিলজ্জের মত ব্যবহার করছি। কিন্তু জীবনে এমন পর্যায় আসে যখন মানুষ নিলর্জ হতে বাধ্য হয়। তাই জিজ্ঞাসা করছি, আমি কি আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম?
তুমি কী বুঝেছিলে তা আমি জানি না। কিন্তু একটা কথা বিশ্বাস কর। এখন আমি কিছুতেই এ কোলিয়ারি ছেড়ে যেতে পারব না। এভাবে পালাতে আমি রাজী নই। আমি শেষ পর্যন্ত লড়ে দেখতে চাই। কোলিয়ারির মালিকের কাছে এভাবে হার স্বীকার করাটা হবে যীসাসের অপমান! সে আমি পারব না। তুমি আমাকে মাপ কর।
চিত্রলেখা উঠে দাঁড়ায়। গায়ের কাপড়টা ঠিক করে নেয়। নিজের প্রগলভতায়, নিজের নির্লজ্জ ব্যবহারে এতক্ষণে সে যেন মরমে মরে যায়। বলে, মাপ করবেন। আমাকে। আপনি আপনার লড়াই করুন। আজ রাতে আমার এ নির্লজ্জতার কথাটা যদি ভুলে যেতে পারেন খুশি হব।
ধীরপদে চিত্রলেখা বেরিয়ে যায় হিমেল হাওয়ার অন্ধকারে।
–তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসব?
–থাক, দরকার হবে না। ফেরার পথ আমার জানা।
দুর্ঘটনাটা ঘটল তার পরদিন দুপুরে। উনিশশো আট সালের সতেরই জানুয়ারী বেলা এগারোটা দশে। জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির প্রাচীন নথিপত্র ঘেঁটে দেখতে পার, দেখবে ঐদিন এগারজন মালকাটাকে জীবন্ত কবর দিয়েছিল ঐ কয়লাখনির দৈত্যটা। কর্তৃপক্ষ চেষ্টার ত্রুটি করেননি। তিন শিফটে নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্ধারকার্য চালানো হয়েছিল কিন্তু মৃতদেহগুলি উদ্ধার করা যায়নি। আর উদ্ধার করা হলেই বা কি লাভ হত? কবর টেনে বার করে আর এক কবরে শুইয়ে দিতে হত তাদের। ধাওড়ার মালকাটারা অবশ্য অন্য কথা বলে। তাদের হিসাবমত ঐদিন কুলি-ধাওড়া থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছিল সাতান্নজন মানুষ–মেয়ে-মদ্দ বাচ্চা ছেলেমেয়ে। ঐ সাতান্নজন মানুষকে আর কোনদিন কেউ দেখেননি খোলা আকাশের নিচে। কর্তৃপক্ষের নথীপত্র সেকথা বলে না। তাঁদের হিসাবে বাকি ছেচল্লিশজন মানুষ আদৌ কোন দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। তারা তারপরেও কাজ করে গেছে, কেউ তিনদিন, কেউ সাত-দশদিন। বিশ্বাস হয় কোলিয়ারির খাতাপত্র দেখতে পার। হাজিরা খাতায় তাদের নাম আছে। পিট অ্যাটেন্স রেজিস্টারে তাদের নাম উঠেছে, বাতিঘরের হিসাব খাতায় তাদের নামে লণ্ঠন ইসু করা হয়েছে; সপ্তাহান্তে রীতিমত টিপ ছাপ দিয়ে তারা হাজরির টাকাও নিয়ে গেছে। তারপর তারা কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছে, কেন চলে গেছে তা কে জানে? কোলিয়ারির হিসাবে সাতান্ন নয়, এগারোজন মারা যায় ঐদিন।
