দাঁড়াও হে আইন-বিশারদাঁ ছোকরা!
ভিন্সেন্ট চৌকাঠের উপরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঘুরে তাকায়। উত্তেজনায় নাথানিয়াল হাঁপাচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে বললে, –আইনের কেতাব তুমি অনেক পড়েছ দেখছি! ইতিহাস কিছু পড়েছ? নীলকুঠির সাহেবের ইতিহাস? ঐ গীর্জার চৌহদ্দির মধ্যেই তোমাকে কেটে খণ্ড খণ্ড করে আমি সিঙারণে ভাসিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখি, এটুকু কি জানা আছে তোমার?
এবার হাসল ভিন্সেন্ট। বলে, আছে। তা ইতিহাসের কথাই যখন তুললে নাথানিয়াল, তখন আমিও জিজ্ঞাসা করি–তুমি হেনরি দি সেকেন্দ্রে ইতিহাস পড়েছ? তোমার চেয়ে নোকটার ক্ষমতা আর দম্ভ কোনটাই কম ছিল না। তোমার মত কোন কোম্পানির চাকুরে ছিল না সে, ছিল একটা দেশের রাজা! গীর্জার চৌহদ্দির মধ্যে সেও একটা কুকর্ম করে বসেছিল ঠিক যেমন ইঙ্গিত তুমি এই মাত্র দিলে। ফল কি হয়েছিল জান? তিনশো আটানব্বই ঘা চাবুক খেতে হয়েছিল ইংলণ্ডেশ্বরকে নতজানু হয়ে, নগ্ন গাত্রে! উলঙ্গ অবস্থায় ঐ যোসেফ মুর্মুর মত মানুষের হাতে ক-ঘা চাবুক তুমি সহ্য করতে পারবে নাথানিয়াল?-কি হল? বুঝলে না? আমি সেন্ট টমাস বেকেটের ইতিহাসটা তোমাকে পড়ে দেখতে বলছি। আইনের বই নয়, ইতিহাস!
ধীরপদে বেরিয়ে গেল ভিন্সেন্ট।
নাথানিয়াল তখনও ভাষা খুঁজে পায়নি।
নিজের ডেরায় এসে মালপত্র বেঁধে-ছেঁদে নেয়। অন্ধকারের মধ্যে গুটিগুটি এসে দাঁড়ায় লেংটিসার কতকগুলি উলঙ্গ মানুষ–মালকাটার দল। ওরা সব খবর রাখে। ওরা জানে ওদের ফাদারদার ডাক পড়েছিল বড়সাহেবের ঘরে; জানে, সাহেব ওকে চলে যেতে বলেছে। তাই অন্ধকারের মধ্যে সার দিয়ে দাঁড়িয়েছে ওরা–ঈশাক, ভিখু, বুধন, নবা, এককড়ি, আন্টুনি। যোসেফ বলে, তুমার ব্যবস্থা হই গেছে ফাদারদা। ইখানে তুমি থাকতে পারবে, তা আমরা তখনই বুঝছি। চল কেনে, ব্যবস্থা হই গেছে।
না, মালকাটার কুলি-ধাওড়ায় নয়। ওরা জানে সেখানেও ওদের ফাদারদাকে থাকতে দেবে না কোম্পানির সেপাইরা। ইতিমধ্যে ওরা বিকল্প ব্যবস্থা করে ফেলেছে। ওরা ফাদারদাকে রাখবে জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির চৌহদ্দির বাইরে। সিঙারণ নদীর ওপারে তেঁতুলডাঙা মাঠের মাঝখানে একটি পরিত্যক্ত কুটিরে। ঐ জোড়া-অশ্বত্থের তলায় গতবছর বর্ষার আগে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন একজন ভবঘুরে সন্ন্যাসী মৌনীবাবা। বরাকরের এক বর্ধিষ্ণু ব্যবসায়ী লালাজী ঐ সন্ন্যাসীর জন্য একটি পর্ণকুটির তৈরী করে দিয়েছিলেন কিছু পুণ্য সঞ্চয়ের লোভে। সন্ন্যাসী কবে চলে গেছেন, পড়ে আছে শূন্য কুটির। ওটা কোলিয়ারি সীমানার বাইরে, আর ওর মালিক লালাজী। ভিন্সেন্ট বলে, -অতদূরে যাওয়ার কোন দরকার নেই যোসেফ। আমি ঐ গীর্জায় গিয়ে আশ্রয় নেব। গীর্জার মালিক নাথানিয়াল নয়–যীসাস্ নাজারেথ!
সে রাত্রেই ওরা ওর মালপত্র গীর্জায় পৌঁছে দিয়ে এল। যোসেফ বলেছিল, এমন একা একা তার এখানে থাকাটা ঠিক হবে না। ভিন্সেন্ট কর্ণপাত করেনি। একাই সে আছে গীর্জায়। আশ্চর্য, কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে কোন আপত্তি হল না, কোন উপদ্রব হল না। পরদিন থেকে পাঁচু হালদারের বাড়ি খেতেও আর গেল না। অসুবিধা নেই কিছু। মালাকাটর দল ওর দায়িত্ব নিল যৌথভাবে। কি হিন্দু, কি মুসলমান, কি খ্রীষ্টান। ওকে খাবার দিয়ে যায়, লণ্ঠন দিয়ে যায়, খাবার জল ভরে দিয়ে যায়। সামর্থ্যে যেটুকু না কুলায় সহানুভূতিতে পুষিয়ে দেয়। ভিন্সেন্ট যথারীতি কুলিবস্তীতে ঘুরে ঘুরে তার সেবাধর্মের কাজ করে যায়। এখানেও কর্তৃপক্ষ থেকে কেউ বাধা দিতে এল না। ভিন্সেন্টের উনিশ বছরের তারুণ্য একটা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হয়ে বসেছিল; কিন্তু ও-পক্ষ একেবারে উদাসীন। এমন তো হবার কথা নয়? অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার নাথানিয়াল এতবড় অপমানটা বেমালুম হজম করে যাবে এটা যে অবিশ্বাস্য। ভান গর্গ সতর্ক হয়, তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে সে অনুভব করে আঘাত ঘনিয়ে উঠছে নেপথ্যে।
হয়তো ওর আশঙ্কা অমূলক নয়, হয়তো ওর উপর গোপন আঘাত হানবার আয়োজন সত্যই ঘনিয়ে উঠছিল নেপথ্যে; কিন্তু তার আগেই এল একটা প্রকাণ্ড ঝড় একেবারে অপ্রত্যাশিত দিক থেকে। জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারীটা সে ঝড়ের ক্ষ্যাপামিতে একেবারে তছনছ হয়ে গেল। এমন দুর্ঘটনা সব কোলিয়ারিতেই হয়–পাঁচ-দশ বছর অন্তর। সেবার হল জোড়-জাঙ্গালে। সাতান্নজন মালকাটা নিঃশেষে মুছে গেল সে। দুর্ঘটনায়। উনিশশো আট সালের সতেরই জানুয়ারী। কোলিয়ারির ইতিহাসে একটা চিহ্নিত তারিখ।
কিন্তু দুর্ঘটনা যেদিন ঘটল তার আগের দিন রাত্রে গীর্জার ভিতরে ঘটেছিল আর একটি নাটকীয় ঘটনা, যেটার কথা আগে বলা দরকার ।
রাত তখন কত হবে? ঘড়ি নেই ওর, প্রথম প্রহরের যাম-ঘোষণা হয়ে গেছে। শীতের রাত। জোড় জাঙ্গাল কোলিয়ারিতে এমন মাঘের রাতে এক প্রহরেই মধ্য রাত্রি। কয়লা কাটার কাজ অবশ্য দিবারাত্রি চলে; কিন্তু কাঁটাতারের বাইরের জীবনে সেই কয়লা কাটার স্পন্দন শোনা যায় না। চারদিক নিযুতি। খড়ের বিছানায় সতরঞ্চি পেতে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়েছিল চন্দ্রভান। গীর্জার দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ। হঠাৎ ওর মনে হল কে যেন ধীরে ধীরে সেই রুদ্ধদ্বারে টোকা মারছে। চট করে উঠে বসে। এত রাত্রে কে এল? লণ্ঠনটা নিবিয়ে রেখেছিল, সেটা জ্বেলে দেয়। সাড়া দেয়, কে?
