হ্যাঁ, এ-প্রশ্নের জবাবে ঈভানজেলিস্ট ভান গর্গ তার অধিকার সীমা লঙ্ঘন করবে না। বলে, –আছে যোসেফ। সন্ত মার্ক লিখে গেছেন, প্রভু যীশুর জীবনের একটি ঘটনা। শোন বলি। যীশু তার শিষ্যদের বলতেন, একমাত্র ঈশ্বরকেই সেলাম বাজানো উচিত। তাই তাঁকে ফাঁদে ফেলবার জন্যে একবার দুজন পুলিসের অনুচর তাঁর কাছে এসে বললে, প্রভু, তাহলে আমরা কি সীজারের জয়গান গাইব না? সীজার কে তা বুঝেছ তো যোসেফ? প্রভু যীশুর আমলে সে ছিল জমিদার, মানে খোদ মালিক আর কি! ওরা ফন্দি করেছিল, যেই যীশু বলবেন না, সীজারকে সেলাম করার দরকার নেই, অমনি তারা ওঁকে বন্দী করবে। প্রভু ওদের সেই ফন্দিটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বললেন, আমাকে একটা পয়সা দাও দেখি! ওরা একটা পয়সা এনে দিল। প্রভু বললেন, এর উপর এই মুন্ডুর ছাপটা কার? ওরা বললে, মহামান্য সীজারের। তখন প্রভু বললেন, তাই তো! সীজারের মহিমা দেখছি একটা পয়সার উপর চকচক করছে, অথচ ঈশ্বরের মহিমা পয়সা দিয়ে মাপা যায় না। ফলে সীজারের যেটুকু প্রাপ্য তা সীজারকে দিতে হবে, আর ঈশ্বরের প্রাপ্য ঈশ্বরকে দিতে হবে!
সেন্ট মার্কের সুসমাচারের দ্বাদশ অধ্যায়ে এ কাহিনীটা পড়া ছিল ভিন্সেন্টের। হুবহু অনুবাদ সে ইচ্ছা করেই করেনি। ও জানত, এটুকু অদলবদল না করলে ওর শ্রোতার দল এ কাহিনীর অন্তর্নিহিত সত্যটা ধরতে পারবে না।
যোসেফ বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে বলে, হুঁ! বুঝলম।
পরদিন খোদ নাথানিয়াল সাহেবের এজলাস থেকে আহ্বান এল ভিন্সেন্টের। মালিক তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। এটা আশঙ্কা করাই ছিল। ভিন্সেন্ট প্রস্তুত হয়েই ছিল। মাথা সোজা রেখে সে এসে হাজির হল বড়সাহেবের খাস কামরায়। প্রকাণ্ড টেবিলের ও প্রান্তে গদি-আঁটা চেয়ারে বিশাল দেহটা এলিয়ে দিয়ে বসেছিলেন নাথানিয়াল। কী একটা রিপোর্ট দেখছিলেন। পরনে নিখুঁত সাহেবি-স্যুট, মুখে পাইপ। পিছনে ফায়ার-প্লেসে কয়লার ধিকি ধিকি আগুন। ম্যান্টেলপীসের উপর পোর্সেলিনের ত্রৈী ছোট্ট একটা যীশুর মূর্তি। তার উপর দেওয়ালে ঝোলানো আছে ইংলণ্ডেশ্বর সপ্তম এডওয়ার্ডের একটি প্রকাণ্ড চিত্র।
আর্দালি ভিন্সেন্টের আগমন ঘোষণা করার পরেও সাহেব মুখ তুলে চাইলেন না। একমনে রিপোর্টটা দেখতে থাকেন। ভিন্সেন্ট ঝকঝকে টেবিলের অপরপ্রান্তে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে বসতে বলা হয়নি। হঠাৎ মুখ তুলে সাহেব ওকে দেখতে পান। তাঁর বিচিত্র ভাষায় যা বলেন তা এই, –ও, তুমি এসেছ? মিস্টার গর্গ, এর আগেও তোমাকে আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম, কিন্তু তুমি কর্ণপাত করনি। তুমি ধর্মপ্রচারের নামে আমার কোলিয়ারিতে বিদ্রোহ প্রচার করছ। অতএব তোমাকে আমি বরখাস্ত করতে বাধ্য হচ্ছি। তুমি অবাঞ্ছিত ব্যক্তি।
ভিন্সেন্ট বুঝতে পারে তাকে বসতে বলা হবে না। নিজেই সে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বলে, –মিস্টার নাথানিয়াল, আপনি একটু ভুল করছেন না কি? আমি আপনার বেতনভুক কর্মচারী নই। আমাকে কি আপনি বরখাস্ত করতে পারেন?
-বাজে কথা বল না! তোমার যাবতীয় খরচ যোগাচ্ছে কোম্পানি। দুধকলা দিয়ে কালসাপকে আর আমরা পুষব না; আমি আজই ফাদার মার্লোকে লিখব তোমাকে এখান থেকে উইড্ৰথ করে নিতে। তোমার খাওয়া-থাকার বাবদে কোম্পানি আর একটি পয়সাও খরচ করবে না, বুঝেছ?
-না বোঝার তো কিছু নেই, কারণ এবার আপনি আইনসঙ্গত কথা বলেছেন। বেশ, আমি আজই আপনার আস্তাবল ছেড়ে দিচ্ছি।
হঠাৎ ক্ষেপে ওঠেন নাথানিয়াল। বলেন, -হ্যাঁ হ্যাঁ, সূর্যাস্তের আগে এই কোলিয়ারির ত্রিসীমানা ছেড়ে চলে যাবে। আমি তোমার মুখদর্শন করতে চাই না।
ভিন্সেন্ট শাঙ্কণ্ঠেই জবাব দেয়, আবার আপনি ভুল করছেন, মিস্টার নাথানিয়াল। এখানকার মাটির নিচেটাই আপনারা ইজারা নিয়েছেন, মাটির উপরের অংশটার মালিক আপনি নন–ঐ উনি, যাঁকে আপনি যীসাস ক্রাইস্টের উপরে স্থান দিয়েছেন-ভারত সম্রাট! আমার মুখদর্শন করতে না চাইলে আপনাকে নিজগৃহে অন্তরীণ হয়ে থাকতে হবে।
সাট আপ, য়ু পিগ হেডেড আর্চিন! এ কোলিয়ারির ত্রিসীমানায় তুমি ঢুকবে না। যাও!
ভিন্সেন্ট নীরবে উঠে চলে যাচ্ছিল। আবার তাকে ফিরে ডাকে নাথানিয়াল।
–তুমি এখনই চলে যাচ্ছ তো?
–আপনার আস্তাবল থেকে তো নিশ্চয়। কোলিয়ারি থেকে নয়। আমি ঐ গীর্জায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছি।
উঠে দাঁড়ায় নাথানিয়াল। চিৎকার করে ওঠে, আমার ধৈর্যের একটা সীমা আছে মিস্টার ভান গর্গ! এক কথা কতবার বলব? ঐ গীর্জাটা আমার এলাকার, ওটা কোম্পানির পয়সায় তৈরী, ওটার মালিক আমি। ওখানে তোমার স্থান হবে না। জাস্ট ক্লিয়ার আউট অব মাই টেরিটারি।
ভিন্সেন্ট কিন্তু উত্তেজিত হয়নি। একই ভাবে বলে, –আপনি ক্রমাগত বে-আইনী কথা বলে চলেছেন। আপনার দলিলপত্র ভাল করে পড়ে দেখুন। গীর্জাটা কোম্পানির পয়সায় তৈরী হয়েছে, কোম্পানির জমিতে নির্মিত হয়েছে এটা কোন কথাই নয়–তার চেয়ে বড় কথা কোম্পানি নিঢ় স্বত্বে মেথডিস্ট চার্চকে একদিন ওটা দান করেছিল। একটা কোলিয়ারির অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজার হয়ে আপনি এই সামান্য আইনের কথাটা বুঝতে পারছেন না? ওর মালিক আপনি নন, ওর মালিক মেডডিস্ট চার্চ, যার তরফে আমি কথা বলছি।
জোড়-জাঙ্গাল কোলিয়ারির চতুঃসীমার ভিতরেই কোন দ্বিপদী জীব যে এ-ভাষায় সর্বশক্তিমান অ্যাসিস্টেন্ট ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে পারে এ ছিল নাথানিয়ালের দুঃস্বপ্নেরও অগোচর। ভিন্সেন্ট আর দাঁড়ায়নি। দ্বারের দিকে এগিয়ে যায়। হঠাৎ পুনরায় পিছন থেকে ডাক শুনতে পায়।
