প্রসঙ্গটা একদিন হঠাৎ চিত্রলেখাও তুলে বসে। প্রতিদিন আহার্য পরিবেশনের অবকাশে দু-চারটে কথাবার্তা হয়। পাশের ঘরে আন্নাকালী উৎকর্ণ হয়ে পড়ে থাকে। চিত্রলেখা অবশ্য তাকে ভ্রূক্ষেপ করে না। মামীর মুখঝামটা তার গা-সওয়া। সে যেন সারাটা দিনমান প্রতীক্ষা করে থাকে অভুক্ত মানুষটার জন্য। সেদিন হঠাৎ বলে বসে, — একটা কথা বলব ফাদারদা? আপনার পিছনে নাথানিয়াল টিকটিকি লাগিয়েছে, জানেন?
ভিন্সেন্ট মৃদু হাসে।
আপনি জানেন, তা বুঝতে পারি। কিন্তু গোয়েন্দাটা কে তা জানেন?
না, কে?
–আমার মামা।
-ও।
চন্দ্রভান আর কথা বাড়ায়নি। নীরবে আহার-পর্ব সমাধা করে যায়। চিত্রলেখা অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করে, আর একটা কথা। আপনি ঐ বাতাসীর কাছ থেকে দুধ নেওয়া বন্ধ করুন।
-কেন বল তো?
–মেয়েটা ভাল নয়।
-আমি জানি। কিন্তু দুধ তো আমি পয়সা দিয়ে কিনি না। কোম্পানি ওকে পয়সা দেয়।
চিত্রলেখা আকাশ থেকে পড়ে। বলে, মামাকে জিজ্ঞাসা করব তো! তা পয়সা যেই দিক দুধ তো অন্য লোকের কাছেও পাওয়া যায়
চন্দ্রভান হেসে বলে, তুমি ওর উপর কোন কারণে রেগে আছ। ও কিন্তু তোমার উপকারই করতে চায়। বিশ্বাস না হয় ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখ–
-কী জিজ্ঞাসা করব?
–ও আমার কাছে তোমার নামে কি বলেছে!
আপনার কাছে আমার নামে লাগিয়েছে। ভারী আস্পর্ধা তো! আচ্ছা!
সাবধান কিন্তু শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি চন্দ্রভান। বরং পাঁচজনের কাছে বারে বারে শোনা সাবধানবাণী ওকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। কিসের ভয়, কাকে ভয়? সে ঈশ্বরের দূত, এসেছে যীশুর বাণী প্রচার করতে। ফাদার শারদাঁর মন্ত্র শিষ্য সেভয় করবে কেন? কাকে?
পরের রবিবার। সান্ধ্য উপাসনাসভায় ভিন্সেন্ট লক্ষ্য করে দেখে পিছনের সারিতে বসে আছে সপার্ষদ পঞ্চানন হালদার। নাথানিয়াল কেবলমাত্র সেই প্রথম দিনই এসেছিলেন। পাঁচুবাবু কখনও আসেনি। সন্ধ্যাবেলাটা সে অন্যত্র ব্যস্ত থাকে। ছুকরি পাড়ার একটি ঘরে সে বাঁধাবাবু। চন্দ্রভান বুঝতে পারে, সে আকর্ষণ ছেড়ে ওকে আজ এই উপাসনাসভায় যোগ দিতে হয়েছে নিতান্ত প্রয়োজনবোধে। সাহেবের কাছে চুলি কাটতে হবে। ভিন্সেন্ট কি বলে, কি করে সব তাকে জেনে যেতে হবে। তাই পিছনের সারিতে গা-ঢাকা দিয়ে বসে আছে চুপচাপ।
যেন প্রতিশোধ নিতেই ভিন্সেন্ট বেছে নিল সেন্ট মার্কের দশম অধ্যায়ের সেই অনবদ্য গল্পটি। বললে
প্রভু যীশুর সামনে হঠাৎ একজন বণিক ছুটে এসে নতজানু হয়ে বললে, মহান প্রভু, আপনি বলুন, কী করলে আমি সেই অনন্ত স্বর্গলোকে যেতে পারব? শুনে প্রভু বললেন, আমাকে কেন মিছিমিছি মহান প্রভু বলছ? একমাত্র ঈশ্বরই মহান। তাঁর দশটি আদেশ তো শুনেছ–পরের বউকে মায়ের মত দেখবে, কাউকে হিংসা করবে না, চুরি করবে না, মিথ্যা সাক্ষী দেবে না, অন্যায় করবে না, বাপ-মাকে ভক্তি করবে। শুনে বণিকটি বললে, এ সবই তো আমি ছেলেবেলা থেকে মেনে চলেছি প্রভু। তাহলে আমার। উদ্ধারের আর কোন বাধা নেই তো? প্রভু বললেন, না, আছে। তোমার একটিমাত্র দোষ। তুমি অনেক টাকার মালিক। যা কিছু সম্পদ তুমি জমিয়ে তুলেছ তা গরীব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দাও। এস, আমার সঙ্গে এই ক্রুশকাষ্ঠের ভার ভাগ করে নাও। আমাকে অনুসরণ কর। একথা শুনে লোকটি সরে পড়ল। অনেকের রক্ত-জলকরা অনেক টাকা সে জমিয়েছে। তার মায়া সে ছাড়তে পারল না।…তখন প্রভু তাঁর শিষ্যদের দিকে ফিরে বললেন, ছুঁচের ফুটো দিয়ে একটা উটের পক্ষে গলে যাওয়া অসম্ভব, কিন্তু তার চেয়ে অসম্ভব কোন ধনী ব্যক্তির পক্ষে এ স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করা!
— ঈশাক রুহিদাস দাঁড়িয়ে উঠে প্রশ্ন করে, ফাদারদা, সগ্গে কয়লাকুঠি আছে?
এমন প্রশ্নের জবাব বাইবেলে খুঁজে পায়নি ভিন্সেন্ট; কিন্তু এ-জাতীয় প্রশ্নের জবাবও তাকে দিতে হয়। সে জানে ঐ সব নিরক্ষর বাগদি, ভূঁইহার, সাঁওতাল, কোল মুণ্ডাদের কাছে বাইবেল বর্নিত স্বর্গরাজ্য ধারনার বাইরে। হিংসা দ্বেষ মাৎসর্যশূন্য একটা চিরশান্তির অমরধাম ওরা কল্পনা করতে পারবে না। তাই বলে, –থাকতে পারে, কিন্তু সেখানকার মালকাটারা দু-বেলা ভরপেট খেতে পায়, তাদের গায়ে জামা আছে, তাদের বাড়ির ছাদ দিয়ে জল পড়ে না, আর তারা কয়লার আগুনে রান্না করে।
আন্টুনি বলে, –ঈ বাবা! তা হেই ফাদারদা, সিখানকার খাদের লিয়মটো কি? সেলাম বাজাতে ভুল হই গেলি সিখানে কি হাজরি কাটা যাবেক লাই?
বোধহয় এ-জাতীয় অপরাধে আন্টুনির এ সপ্তাহে হাজরি কাটা গেছে। তাই ওটাই তার বেদনার স্থল। ভিন্সেন্ট বলে, না। সেখানে অমন ঘড়ি ঘড়ি সেলাম বাজানোর কানুন নেই। সেখানকার মালকাটারা কাউকে সেলাম করে না–মুন্সি সর্দার-গিনতিদার হলারম্যান-ওভারম্যান মায় ম্যানেজারকে পর্যন্ত সেলাম করে না। একমাত্র সেলাম বাজায় ভগবানকে, ঈশ্বরকে।
শ্রোতৃবৃন্দের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। এ বড় আজব কয়লাকুঠি তো! এবার উঠে দাঁড়ায় যোসেফ। বলে, বেহেস্তের বাতটো ছাড়ান দেন কেনে ফাদারদা। সিধে হিসাবটা আমারে বুঝায়ে দেন। ইখানে আমরা কারে সেলাম বাজাব? ভগমানরে, না ঐ উয়াদের?
নাটকীয়ভাবে হাতখানা সে বাড়িয়ে দেয় ওদিক পানে, যেখানে আঁধারে ঘাপটি মেরে বসে আছে পাঁচু হালদারের দল। ভিন্সেন্ট ইতস্ততঃ করে। এ-প্রশ্নের জবাব দেওয়া মানে প্রত্যক্ষ বিদ্রোহ–সে এখানে এসেছে ওদের আত্মার উন্নতি কামনায়। বিদ্রোহের আগুন জ্বালতে নয়। কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। ওর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অন্তর্হিত হল যোসেফের পরবর্তী প্রশ্নে, উ কিতাবটোর ভিতর ই-কথা কিছু লিখে নাই? দেখেন কেনে?
