এ কোন্ নরকে পবিত্র খ্ৰীষ্টধর্মের প্রচার করতে এসেছে ভিন্সেন্ট? এদের সে কোন্ মুখে বলবে–দুঃখটা মায়া, ওটা কিছু নয়, ওকে অস্বীকার কর! মৃত্যুর পরে স্বর্গরাজ্যে যাবে তোমরা, আর রক্তচোষা মালিকগুলো যাবে নরকে। কেমন করে এই থিওরিটা গলাধঃকরণ করবে ওরা? পৌষ পার হয়ে মাঘ শুরু হয়েছে। হাড়কাঁপানো শীত। নেংটি-সার-মানুষগুলো কেমন করে লড়বে ঐ শীত দৈত্যের সঙ্গে? বাচ্চগুলো? কয়লার রাজ্য, অথচ একফোঁটা কয়লা পায় না ওরা। কুড়িয়ে আনে ঝরা শালপাতা, কাঠকুটো; তাই জ্বেলে আগুন করে। কুকুরছানার মত উলঙ্গ বাচ্চাগুলো শুয়ে থাকে সেই আগুনের চারপাশে। সর্দিজ্বর আর কাশি তো আছেই- নিমুনিয়ায় মারা গেল কটা বাচ্চা। চন্দ্রভান মরিয়া হয়ে শেষ-মেষ দরবার করতে গিয়েছিল খোদ নাথানিয়াল সাহেবের এজলাসে। এমনভাবে চলতে পারে না। জীবনধারণের জন্য একটা সর্বনিম্ন স্তর আছে কয়লাকুঠির স্বার্থেই অন্তত সেই সমতলে ঐ মালকাটাদের উন্নীত করতে হবে। দয়া ভিক্ষা নয়, কোম্পানির প্রয়োজনে। কোম্পানির খরচে একজন ডাক্তার থাকা উচিত, বিনামূল্যে ঔষধ দেওয়া উচিত, জ্বালানির কয়লা ওদের বিতরণ করা উচিত। হাজরির হার এমন হওয়া চাই যাতে খেটে খাবার মত শারীরিক সামর্থ্য ওদের বজায় থাকে।
ভ্রূকুঞ্চিত হয়েছিল সাহেবের। কড়া সুরে তাঁর বিচিত্র ভাষায় বলেছিলেন, তুমি এখানে ট্রেড ইউনিয়নিস্ট হিসাবে আসনি বাবু, এসেছ ধর্মপ্রচার করতে। ওসব ব্যাপারে তোমাকে নাক গলাতে হবে না।
মাথা নিচু করে ফিরে এসেছিলে ভিন্সেন্ট।
খবরটা তার পরদিনই পেল। যোসেফ মুর্মুর মেজ ছেলে প্রবল জ্বরে বেহুঁস। খবর পেয়েই যোসেফের ছাপরায় ছুটে যায়। যোসেফ ছিল না; তার বড় ছেলেও অনুপস্থিত। খাদে নেমেছে ওরা। যোসেফের বউ বাধ্য হয়ে কামাই করেছে। অচৈতন্য কিষ্টোর শিয়রে বসে আছে নির্বাক। বাকি বাচ্চা তিনটে কুঁকড়ি মেরে বসে আছে খড়ের বিছানায়। একটা কথা নেই, একটা ছেঁড়া কম্বল নেই। চট বিছিয়েছে হিমশীতল মাটির মেঝেতে। ভিন্সেন্ট বুঝতে পারে, বাচ্চাটার নিমুনিয়া হয়েছে। ওকে বাঁচাতে হলে ঔষধ নয়, সবার আগে ওকে শোয়াতে হবে একটা তোশকের উপর, গায়ে চাপাতে হবে একখানা কম্বল।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল। একটু পরেই যোসেফ আর রবার্ট ফিরে এল। বিনা ভূমিকাতে ভিন্সেন্ট বলে ওঠে, –আমার একটা কাজ করে দেবে যোসেফভাই?
সমস্ত দিনমান খাদ-দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করেছে যোসেফ মুর্মু। ক্লান্তিতে এখন ভেঙে পড়তে চাইছে তার দেহ। এদিকে ঘরে তার অচৈতন্য সন্তান কিষ্টো। তবু। ফাদারদার কথায় সে বিরক্ত হল না কিছুমাত্র। বলে, কী কাজ ফাদারদা?
তুমি একটু এস আমার সঙ্গে। বাইরে দুরন্ত হিমেল হাওয়া। যোসেফ বিনা প্রতিবাদে ওর পিছন পিছন নেমে আসে পথের উপর। কোথায় যেতে হবে, কেন যেতে হবে একবারও জানতে চায় না। ভিন্সেন্টের গায়ে একটা খদ্দরের হাফ-সার্ট, মোটাসূতোর আলোয়ান; আর একপ্রস্থ কয়লার পলেস্তারা ছাড়া যোসেফের গায়ে কোন আবরণ নেই। ওরা নীরবেই পথটি অতিক্রম করে। নিজের আস্তাবলের ডেরায় পৌঁছে চন্দ্রভান বলে, তুমি ঐ খাটিয়াটার ওধারটা ধর যোসেফ ভাই; একা আমি এটা বয়ে নিতে যেতে পারছি না।
যোসেফ শুধু বলে, –ও! অ্যাই বিত্তান্ত!
লোকটা ঘুরে দাঁড়ায়। আর কিছু বলে না। চলতে শুরু করে তার জখম ঠ্যাখানা টানতে টানতে।
একি হল যোসেফ? চলেছ কোথায়? এটা ধর!
যোসেফ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। হঠাৎ উচ্চকণ্ঠে হেসে ওঠে আচমকা। বলে, — কিতাবের বুলিটো এক্কেরে ভুলি গেল ফাদারদা? এ দুনিয়ায় আমরা তো মুসাফির গ? দুশক কষ্ট কিছু লয়! মরি গেলি কিষ্টো তো সিরেফ বেহেস্তে যাবেগ গ!
চন্দ্রভান ছুটে এসে চেপে ধরে ওর ক্লয়লামাখা হাতখানা। আর্তকণ্ঠে বলে, -না না যোসেফ! সে অর্থে আমি ওকথা বলিনি! কিষ্টোকে আমরা মরতে দেব না। মরণ কি অত সোজা?
ওরই বাঁধা বুলি। তাতে কোন ভাবান্তর হয় না যোসেফের। হাতখানা ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নেয়। অনুচ্চকণ্ঠে বলে, ভগবান কিষ্টোর মায়েরে পাঁচ-পাঁচটো বাচ্চা দিছে। একটো মরি গেলি চারটো বাকি থাকবে, লয়? সে দুকু কিষ্টোর মায়ের সইব, আমারও সইবে। কিন্তুক, গোটা জোড়-জাঙ্গালের লেগে ঐ কিপটে ভগমান দিছে একটি মাত্তর ফাদারদা! সেটি নিমুনিয়া হই মরি গেলি আমাদের সইবে না। পথ ছাড় কেনে।
চন্দ্রভানের চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে।
হাত বাড়িয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী খঞ্জ মানুষটা ন্যাংচাতে ন্যাংচাতে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যায়।
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটা বিরোধ যে অনিবার্যভাবে অলক্ষ্যে ঘনিয়ে উঠছে এটা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে বুঝতে পারছিল ভিন্সেন্ট। অনেকেই সাবধান করে দিয়েছে তাকে। এককড়ি ওভারম্যান বলেছেনাথানিয়াল সাহেব ভিন্সেন্টের পিছনে গুপ্তচর নিয়োগ করেছে। সে কোথায় যায়, কি করে, কোথায় কি বলে তার রিপোর্ট সংগ্রহ করছে। আনি একদিন পূর্বতন পাদ্রীসাহেবের বিতাড়নের কাহিনীটা সবিস্তারে ওকে শুনিয়ে দিল। আগেকার পাদ্রীসাহেবও ঐ একই দোষ করেছিলেন–মালকাটাদের ভাল করতে চেয়েছিলেন। এমন কি পাঁচু পর্যন্ত ওকে অবাঞ্ছিত কিছুটা উপদেশ বর্ষণ করল। জলে বাস করে কুমীরের সঙ্গে বিবাদ করাটা যে নীতিশাস্ত্র বিরোধী এ সংবাদটা ওকে শুনিয়ে দিল। কিন্তু চন্দ্রভান নিরুপায়। তার নিজের অন্তরেই একটা সংশয় জেগেছে। প্রভু যীশুর বাণী সে কি ভুল বুঝেছে? এ দুনিয়ার হাটে সব দুঃখ কষ্টকে নতমস্তকে স্বীকার করে নেওয়াই কি প্রকৃত খ্রীষ্টানের একমাত্র কাজ? মৃত্যুর পর স্বর্গবাসের পুরস্কার কি শুধুমাত্র একটা ধোঁকাবাজি? অন্যায়ের বিরুদ্ধে যাতে ওরা দল বেঁধে রুখে না দাঁড়ায়। তাই কি ও এসেছে এখানে? প্রতি রবিবার এক এক ডেলা আফিং খাইয়ে ওদের ঘুম পাড়িয়ে রাখাই কি তার ধর্মপ্রচারের মূখ্য উদ্দেশ্য?
