.
পঙ্খিরাজ! হো পঙ্খিরাজ! উঠ! গো-রসটুক্ খাইকরি আমারে রেহাই দাও কেনে! ঐ এসেছে বাতাসী। রোজ এমন কাকডাকা ভোরে সে এসে ডেকে তোলে ভিন্সেন্টকে। কতবার বারণ করেছে। মেয়েটা শোনে না। বাতাসী সাঁওতালের মেয়ে। কারও স্ত্রী নয়, অথচ নানকুর জননী। নানকুর বয়স আট। এ বছরই হাতে কালি হয়েছে। বাবুদের যে বয়সে হাতে-খড়ি হয় প্রায় ঐ বয়সেই ধাওড়ার ছেলেমেয়েদের হাতে কালি উৎসব হয়। জীবনে প্রথম সে খাদে নামে, বাপ অথবা মায়ের হাত ধরে। নানকু আজ এক বছর হল খাদে নামছে। হাজরির খাতায় নানকুর নাম উঠেছে মাতৃ পরিচয়ে। খাজাঞ্চিবাবু ঋষি গৌতম নন, আর কোলিয়ারির কাজ কিছু ব্ৰহ্মবিদ্যাও নয়— তাই নানকুর পিতৃ-পরিচয় প্রসঙ্গটা ওঠেনি আদৌ! বয়সে বাতাসী ভিন্সেন্টের চেয়ে বছর পাঁচেকের বড়ই হবে। এক সন্তানের জননী; কিন্তু স্বাস্থ্যটি নিটোল। কুচকুচে কালো রঙ, মাথায় সব সময় একটি লাল ফুল, ঠোঁট দুটি পানের রসে রাঙা, ঊরুনিতম্ব, পীনোদ্ধত উরস। মূর্তিমতী কামনা। কবে কার হাত ধরে প্রথম এ জোড়-জাঙ্গালে এসেছিল মনে নেই কিন্তু জোড় ভেঙে গেছে অচিরেই। বাতাসী ক্ষীণকবাদিনী। তা ছাপড়ায় সে একাই থাকে নানকুকে নিয়ে। মাঝে মাঝে অভিসারে বার হয়। ফেল কড়ি-মাখ-তেলের আসন পেয়েছে। বয়ঃজ্যেষ্ঠরাও ঐ অষ্টদশবর্ষীয় ধর্মপ্রচারককে সমীহ করে চলে। একমাত্র ব্যতিক্রম ঐ বাতাসী। সবাই ওকে ডাকে ফাদারদা, ও ডাকে পঙ্খিরাজ। আস্তাবলে বাস করে বলে ঐ নামকরণ। সূর্যোদয়ের আগেই বাতাসী ছেলের হাত ধরে খাদে নামে। তার আগেই ভিন্সেন্টকে খাইয়ে যায় এক ঘটি গরম দুধ। বাতাসীর একটি গোরু আছে। রূপোপজীবিনীর পক্ষেই সম্ভব এ জাতীয় বিলাসিতা। সকালে দুধটা খাইয়ে বাড়ি বাড়ি বেচে আসে। নানকুকেও খাওয়ায়। দুধ খাওয়ার মত সামর্থ্য অবশ্য ভিন্সেন্টের ছিল না; বাতাসী ওকে বলেছিল–দুধের টাকা কোম্পানি দেবে। কোম্পানির নির্দেশেই সে নাকি ঐ এক পোয়া দুধের নিত্য যোগান দিয়ে যায়। সেটা যে ডাহা মিথ্যা কথা এটা ভিন্সেন্ট জানতে পেরেছিল অনেকদিন পরে। এটা ছিল বাতাসীর শ্রদ্ধার অর্ঘ্য, ভালবাসার দান!
-হেই পঙ্খিরাজ! উঠ কেনে! গো-রসটুক্ খাই লও!
দরজা খুলে বাইরে আসে ভিন্সেন্ট। বলে, কেন রোজ আমাকে বিরক্ত করতে আসিস বল্ তো? কাল থেকে আর আসবি না!
বাতাসী চোখ দুটি বড় বড় করে বলে, ঈ বাবা! পঙ্খিরাজ ক্ষেপি গেছে আজ। তা হেই বাবা পঙ্খিরাজ, তুর টু দয়া হয় না গ? গো-রস বেচি দুটি পয়সা কামাই ইটো তুর মন মানে না? একা মাইয়া লোগ বটি, মরদ লাই–তুর দয়া হয় না?
একা থাকতে কে তোকে মাথায় দিব্যি দিয়েছে? বিয়ে করলেই পারিস?
–ঈ বাবা! আমাকে কে বিয়া করবে বল? আমি তো সোন্দর নই–
ন্যাকামি করিস না! মরদগুলোর মাথা না খেয়ে কারও ঘরে পাকাপাকিভাবে যা–
.
খিলখিল্ করে হেসে একেবারে লুটিয়ে পড়ে বাতাসী। বলে, –মনের মানুষ না হলি কি পাকাপাকি কুথাও থাকা যায় রে?
–তা ধাওড়ায় এত মরদ রয়েছে, বেছে নে তোর মনের মানুষ!
হঠাৎ হাসি থামিয়ে গম্ভীর হবার ভান করে। লাস্যময়ী কটাক্ষ নিক্ষেপ করে বলে, একটো মরদরে তো মনে ধরিছে গো পঙ্খিরাজ কিন্তু সি যে মোরে কিবল খিঁচায়!
প্রগলভা মেয়েটির মুখের কোন আড় নেই। ভিন্সেন্ট ওর বাঁকা ইঙ্গিতটা বুঝতে পারে ঠিক, কিন্তু এ নিয়ে কথা বাড়ায় না। সে জানে ঐ ক্ষণিকবাদিনী রূপোপজীবিনী সকলেই ওকথা বলে সময়বিশেষে। ওর হাত থেকে ঘটিটা নিয়ে, ঢক্ করে দুধটা খেয়ে ফেলে।
বাতাসী উঠে পড়ে। চলতে গিয়েও কি ভেবে হঠাৎ ফিরে দাঁড়ায়। বলে, -তা হেই পঙ্খিরাজ, তু বিয়া করিস না কেনে? কারও নজরে ধরে না তুর?
-তাতে তোর কি? যা ভাগ, পালা!
–মনের মত বউ পাস লাই, লা রে? তু যদি রাজি হস একটো সম্বন্ধ করি। খুব সোন্দর বটে! কী? করবি বিয়া?
ভিন্সেন্ট হেসে ফেলে। বলে, -মেয়েটি কে? বাতাসী সুন্দরী তো?
–ঈ বাবা! অমন বাতটো আমি মুখে আনবার পারি? আমি তো সাঁওতাল বটি! লিখাপড়া শিখি নাই! আমি হুই পাঁচু-সর্দারের বুইঝির বাতটো বুলতেছিলম! হ!
ভিন্সেন্ট একটা ছড়ি উঠিয়ে ওকে ছদ্মতাড়না করে, যা ভাগ, হতচ্ছাড়ি!
ঈ বাবা গ!—ছদ্ম আতঙ্কের অভিনয় করে বাতাসী ছুটে পালায়। কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে চন্দ্রভান। কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে। কী ভুল, তা সে জানে না, কিন্তু বিশ্বাসের ভিতটাই টলে উঠেছে। ফাদার শারদাঁর সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে হত।
কয়লাকুঠির জীবন রহস্যের আরও গভীরে প্রবেশ করেছে ইতিমধ্যে। দেখেছে মালকাটাদের জীবন আরও নিবিড় করে, আরও নিকট থেকে। ওদের সেবা করতেই এসেছে এখানে। ঘরে ঘরে তার অবারিত দ্বার। ওদের সঙ্গে মিশেছে একাত্মভাবে। ওরাও ভিন্সেন্টকে আপনজন করে নিয়েছে। কাছে এসে ও দেখলকী অপরিসীম দারিদ্র্য, জীবনের কী অতলান্তিক অবক্ষয়ী রূপ। দু-মুঠো অন্নের জন্য কোথায় নেমে গেছে মানুষগুলো। তবু কি দু-বেলা দুমুঠো অন্ন জুটছে? সূর্যোদয়ের আগে নেমে যায় পাতালে, উঠে আসে দশ বারো ঘন্টা পরে পুঁকতে ধুঁকতে, আর কাশতে কাশতে। সপ্তাহান্তে নামমাত্র হাজরিতাও কাটা যায় নানান ছুতায়। টবে মাল কম হয়েছে, কয়লার বদলে টেরিল বেশি দেওয়া হয়েছে, হ্যাঁন হয়েছে, ত্যান হয়েছে। আসলে মেট-মুন্সি গিনতিদার-হলারম্যান-ওভারম্যানের দস্তুরি ঠিক মত না হলেই হাজরি কাটা যাবে। আবার সব ঘাটে দস্তুরি দিতে গেলেও নগদ প্রাপ্তিটা দাঁড়ায় শূন্যে! মরদগুলো সন্ধ্যা থেকেই পড়ে থাকে পচাইয়ের আড্ডায়। মেয়েগুলো কে কার খোয়াড়ে রাত কাটায় হিসাব থাকে না। বাচ্চাগুলো বেওয়ারিস। শুয়োরের ছানা যেন। অর্ধেকের উপর মালকাটা একা থাকে। বউ পুষবার খরচে কুলায় না। হপ্তায় একবার জৈবিক প্রয়োজনে যায় ও-পাড়ায়। ব্যবসায়ী মেয়ের দল একটা স্বতন্ত্র চালা জমিয়ে বসেছে। এ ছাড়াও আছে বাতাসীর মত সুখের পায়রা-ফ্রি লানসার! যাদের পয়সা নগদ কিছু জমেছে তারা আবার মাঝে মাঝে চলে যায় বরাকর, মুখ বদলাতে। হাঁটতে হয় না। জোড়-জাঙ্গাল থেকে বরাকর পর্যন্ত পাতা আছে ছোট রেলের লাইন। ক্রমাগত টব চলেছে তাতে। মানুষে ঠেলে নিয়ে যায়। দুটো বিড়ি ঘুষ দিলেই তারা উঠিয়ে নেয় টবের উপর। ওতে চড়ে শহর বাজারের বেশ্যাপল্লী ঘুরে এস। সপ্তাহে একদিন বৈ তো নয়?
