একজন বললে, চল–এটাকে ম্যানেজার সাহেবের তাঁবুতে ফেলে রেখে আসি। যা করবার তিনিই করবেন এখন।
কী আর করবেন–আচ্ছা করে ঠ্যাঙাবেন।
কিংবা থানায়-টানায় পাঠিয়ে দেবেন–যা খুশি।
বলে তারা চ্যাং-দোলা করে দামুকে তুলে নিয়ে গেল।
তাঁবুর বাইরে গোলমাল একটু হচ্ছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তখন জমাট খেলা, ক্ল্যাপ আর হাসির আওয়াজ–ম্যানেজার কিছুই টের পাননি। ঘণ্টা দেড়েক বাদে, খেলা শেষ হলে, ভেতরে এসে তিনি অবাক হয়ে গেলেন–এটা কী রে? কোনও আজব জানোয়ার নাকি?
লোকেরা বললে, স্যার–ওটা পাগল।
মানে?
সকালে কদিনের জন্যে হাতি ধার চাইতে এসেছিল।
সে কী?
আর বলেন কেন স্যার, আমরা তখন তাড়িয়ে দিলুম। আবার সন্ধেবেলায় এসে ভারি হাঙ্গামা আর মারামারি বাধিয়ে দিলেবলে, আপনার সঙ্গে দেখা করবে কারা রাত্তিরে নাকি তাঁবুতে আগুন দেবে–হা-হা-হা!
ম্যানেজার দামুকে একটা খোঁচা দিলেন, দামু সাড়া দিলে না।
মুখটা খুলে দাও।
খোলা হল–তবুও দামুর সাড়া নেই।
কাল সারা রাত জেগে পথ-চলা, আজ গোটা দিন না-খাওয়া, ভয়ে-দুঃখে-ক্লান্তিতে দামু মড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাকে কিছুতেই আর জাগানো গেল না।
ম্যানেজার বললেন, রাত্তিরটা থাক পড়ে। সকালে তাড়িয়ে দিস।
কিন্তু তাঁবুতে আগুন! কেমন যেন বেয়াড়া কথাটা। বলুক পাগলে, তবু মনের ভেতরটা খচখচ করতে লাগল। একটু সাবধানে থাকলে ক্ষতি কী। তাতে তো পয়সা লাগে না।
বন্দুক নিয়ে জেগেই রইলেন ম্যানেজার। পাঁচ-সাতজন লোককে রেখে দিলেন পাহারায়।
.
দামু একবার চোখ মেলল মাঝরাতে।
বাইরে দারুণ হট্টগোল তখন। দুমদাম করে গোটা দুই বন্দুকের আওয়াজ। কেরোসিনের টিনসুষ্ঠু ধরা পড়েছে কালু নস্কর আর তার সঙ্গী জোয়ান লোকটা। হেবোকে ধরা যায়নি,
অন্ধকারে ছুটে পালিয়েছে সে।
কিন্তু খিদেয়, ক্লান্তিতে দামু তখন কিছু বুঝতে পারল না, ভাবতেও পারল না। একবারের জন্যে চারদিকে তাকাল, কোথায় আছে, কীভাবে আছে, কিছু মনে করতেও পারল না। তারপরে আবার ঠিক মরণঘুমে দুই চোখ তার জড়িয়ে এল।
.
দামু চেঁচিয়ে বললে, আরে থামোথামো-ই কী করছ!
কিন্তু কে শোনে কার কথা! পুরো দশ মিনিট তাকে কাঁধে করে নাচলেন ম্যানেজার। নিজের নাচ শেষ হলে দামুকে তুলে দিলেন আর-একজন পালোয়ানের হাতে–যে মাথায়। একটা হেলমেট পরে তারের খাঁচার ভেতরে বনবনিয়ে মোেটরসাইকেল চালায়। সে দামুকে পিঠে করে গোটা তাঁবুর ভেতরে সাঁই সাঁই করে তিন পাক ঘুরে এল। তারপর সে আবার দামুকে তুলে দিলে ভীমের মতো জোয়ানটার হাতে–যে বুকের ওপর হাতি চাপায়। সে-লোকটা আবার দামুকে ধাঁই করে ছুঁড়ে দিলে! দামু-বাবা গো–গিচি গিচি করতে করতে টাঙানো একটা জালের ঝোলার মধ্যে পড়ল। একটুও লাগল না–চিত হয়ে তার ওপর শুয়ে দোল খেতে লাগল।
সার্কাসের ক্লাউনরা ডিগবাজি খেতে লাগল। আর সবাই মিলে হাততালি দিয়ে গান গাইতে লাগল : লা-লা-লা–ট্রা-লা-লা–
ঝোলার মধ্যে আঁকুপাঁকু করতে করতে দামু বললে, তোমরা ই কী করচ–অ্যাঁ?
ঝোলা থেকে নামিয়ে এনে ম্যানেজার দামুর হাত ঝাঁকাতে লাগলেন : তুমি আমার সাকাস বাঁচিয়েছ, লাখ টাকা বাঁচিয়েছ। তুমি সময়মতো খবর না দিলে আগুন লেগে সর্বনাশ হয়ে যেত একেবারে। বলো মিস্টার–কী করতে পারি তোমার জন্যে।
খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল দামু। তখনও তার মাথা ঘুরছে।
ম্যানেজার বললে, তুমি খবর না দিলে ওরা ঠিক আগুন দিয়ে পালিয়ে যেত। পারেনি শুধু তোমার জন্যে আমরা ওদের ক্যাঁক করে ধরে ফেলেছি। আমার লোকজন না বুঝে। তোমার ওপর খুব দুর্ব্যবহার করেছে, আমি সেজন্য ভারি লজ্জিত। বলো মিস্টার কী পুরস্কার তুমি চাও?
এতক্ষণে দামুর মাথায় একটু-একটু করে আক্কেল গজাতে লাগল। তা হলে এসব হচ্ছে তারই অভ্যর্থনা–তারই জন্যে আনন্দ করছে সবাই! দামু বললে, সে সব কথা পরে হবে, আগে কিছু খাওয়াও দিনি। কাল থেকে পেটে কিচ্ছুটি পড়েনি, খিদেয় চোঁ-চোঁ করছে।
ও–এই কথা?
ম্যানেজার তক্ষুনি গলা ফাটিয়ে হাঁক ছাড়ল : এই–কৌন হ্যায়! রসগোল্লা লাও-চমচম লাও–গজা লাও-মোতিচুর লাও–সিঙাড়া লাওকচুরি লাও–দহি লাও–দুহিবড়া লাও
দামু যা খেল, সে দেখবার মতো। রসগোল্লা-চমচম-গজা-সিঙাড়া-দইবড়া কিচ্ছুটি ফেলা গেল না। তার খাওয়া দেখে সাকাস সুদ্ধ লোক থ! সবাই বললে, শাবাশ খাইয়ে বলতে হয় তো একেই।
খাওয়া-দাওয়া মিটে গেলে ম্যানেজার বললে, মিস্টার–তুমি সাকাসে চাকরি করবে? শুনে দামু চটে গেল। কালকের কথা মনে পড়ে গেল তার।
তোমার সাকাসের খাঁচায় বুঝি আমায় বাঁদর সাজিয়ে বসিয়ে রাখবে?
ম্যানেজার জিভ কেটে বললে, আরে রাম রাম, কে বলেছে সেকথা! তুমি বাঁদর সাজবে কেন? মধ্যে মধ্যে মাথায় পাগড়ি বেঁধে লাঠি হাতে এসে লাফালাফি করবে, আর
দামু গোঁজ হয়ে বললে, না–আমি সাকাসে চাকরি করব না।
করবে না?–ম্যানেজার দুঃখিত হয়ে বললে, অল রাইট। তবে আর কী করা যাবে। কিন্তু বলোক পুরস্কার কত টাকা তোমার চাই?
দামু বললে, একটা টাকাও চাই নে। শুধু সাতদিনের জন্যে একটা হাতি ধার চাই আমার।
.
শুধু হাতি ধার দেননি ম্যানেজার, হাতি চালাবার লোক দিয়েছেন, আর সেই সঙ্গে দিয়েছেন হাতির খাই-খরচ। হাতির রোজকার খাওয়া তো চারটিখানি ব্যাপার নয়–সে এক এলাহি কাণ্ড! অন্তত গোটা দশেক কলাগাছ আর সের তিরিশেক চাল তার চাই। গরীব মানুষ দামু সে-সব জোটাবে কোত্থেকে।
