আর পরিষ্কার শুনতে পেল : হাঁ, ওই সার্কাসের তাঁবুতে। আজ রাত্তিরেই আগুন দিতে হবে– ব্যাটাচ্ছেলেরা কালু নস্করকে চেনে না।
আরও খাড়া হল দামুর কান, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল তার।
শুনতে শুনতে দামুর যে কেবল কান খাড়া হল তা নয়, সারা বুক ধড়ফড় করতে লাগল, হাত-পা হিমহয়ে আসবার জো হল। বলে কী লোকগুলো! সার্কেসের তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেবে! ই কী সব্বোনেশে কথা গো!
কালু নস্কর বলে লোকটার কালো কালো বেঁটে চেহারা, হাত ভর্তি বড়বড় রোঁয়া, নাকের নিচে ছাঁটামতন গোঁফ আর মুখে ইয়া ইয়া দাঁত। রেগে সে দাঁত কটমট করছিল আর গোল-গোল চোখ দুটো তার বনবন করে পাক খাচ্ছিল। দেওয়ালের ফাটল দিয়ে লণ্ঠনের
আলোয় দামু তার যেটুকু দেখল–আত্মারামকে আঁতকে দেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট।
কালু নস্কর বললে, বুঝিচিস তো হেবো?
হেবো বললে, বিলক্ষণ–বুঝিনি আবার! এক-টিন কেরোসিন ঢেলে দেব তাঁবুর গায়ে। তারপরে একটা দেশলাইয়ের কাঠির ওয়ান্তা। ব্যস–খেল খতম।
খতম বলে খতম। আর কারদানি করে সাকাস দেখাতে হচ্ছে না বাছাদের! আমি কালু নস্কর-সাতখানা গাঁয়ের ঝানু কাপ্তান–আমাকে পাশ দেবে না? বলে, বিনি-পয়সায় সাকাস দেখা যায় না রাস্তায় মাদারীর খেল দ্যাখো গে। ঠিক আছে–এবার তোদেরই আমি মাদারীর খেল দেখাচ্ছি কালু এমন করে দাঁত বের করল যে দামুর মনে হল, এখুনি সে কাউকে খ্যাঁক করে কামড়ে দেবে।
হেবো বললে, মাঝরাতে তো?
মাঝরাতে বই কি। সামনেই ওদের লোক জেগে থাকে, পিছনে বড় কেউ থাকে না–সে আমি নজর করে দেখেছি। আর থাকলেও বুঝলি তো আমরা তিনজন আছি, জাপটে ধরে কপ করে হাত-মুখ বেঁধে ফেলব।
সঙ্গে যে আর-একটা জোয়ান লোক ছিল, সে বললে, গাঁট্টা মেরে একেবারে চুপ করিয়ে ফেলব।
কালু বললে, ঠিক আছে, এই কথাই তা হলে রইল। চল–উঠে পড়ি এবার। ওদিকে আবার সব ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা করতে হবে।
হেবো লণ্ঠন নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কালু আর জোয়ান লোর্কটাও উঠল। তারপর তিনজনে যে সুট করে কোন দিকে চলে গেল, দামু তা আর ঠাহর করতে পারল না।
পোড়ো জংলা বাড়িটাকে ঘিরে তখন অথই অন্ধকার নেমেছে। দামু মশার কামড় খেতে-খেতে, প্যাঁচার ডাক শুনতে-শুনতে ভয়ে কাঠ হয়ে বসে রইল অনেকক্ষণ। স্বপ্ন দেখলম নাকি? সার্কেসের তাঁবুতে–মাঝরাত্তিরে–এক-টিন কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেবে? পটাই চোর কোথায় লাগে এদের কাছে? এরা তো ডাকাতের ওপরেও এক কাঠি।
সব্বোনাশ–সব্বোনাশ! এখুনি তো সার্কেওলাদের খবরটা দিতে হয়।
দামু হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল খানিকটা। ঘরের বাইরে মুখ বের করে দেখল–চারদিকে শুধু অন্ধকার, এখানে-ওখানে ইটের পাঁজা, গাছপালাগুলো কালো কালো ভূতের মতো দুলছে। না–জন-মনিষ্যিরও সাড়া নেই কোথাও। কালু নস্করের দলবল সেই অন্ধকারের ভেতরে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে।
দামু উঠে পড়ল। তারপরেই টেনে দৌড়।
আর কোথাও নয়–একেবারে সোজা সাকাসের তাঁবুর দিকে।
তখন সাকাস আরম্ভ হয়ে গেছে। একেবারে জমজমাট। শুধু এই গঞ্জই নয়, চারদিকের সব গাঁ ঝেটিয়ে লোক এসেছে সাকাস দেখতে। ভেতরে চলছে ছুটন্ত ঘোড়ার খেলা। সাকাসের মালিক নিজেই রিং-মাস্টার, ঘোড়া আর বাঘ-সিঙ্গীর খেলা সে-ই দেখায়। বেশ জবরদস্ত পোশাক পরে, গলায় মেডেলের মালা দুলিয়ে–চাবুক সাঁই সাঁই করে ঘোড়ার দৌড় করাচ্ছে। ওদিকে আবার দুজন ক্লাউন নেমেছে এসে–একজন একটা ঘোড়ার পেট ধরে ঝুলছে আর একজন ঘোড়ায় চাপতে গিয়ে ধপাস ধপাস করে আছাড় খাচ্ছে। হেসে কুটিপাটি হচ্ছে লোক, ক্ল্যাপও দিচ্ছে ঘন ঘন।
এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে দামু এসে গেটে হাজির।
আমি সার্কেসের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করব–এক্ষুনি।
কেন–কী দরকার?
ভীষণ ব্যাপার আছে একটা। সব্বেনাশ হয়ে যাবে।
দামুর বিটকেল চেহারা আর তার ভাবভঙ্গি দেখে গেটকিপার চটে গেল।
এঃ, ভারি একটা লাটসায়েব এসেছেন সব্বোনাশ হয়ে যাবে! যাওয়াও–মেলা। ঝামেলা কোরো না। ম্যানেজার এখন খেলা দেখাচ্ছেন কিছু বলতে হয়, সকালে এসে বোলো।
না–এখুনি বলতে হবে। পথ ছেড়ে দাও শিগগির-বলে দামু গেটকিপারকে ধাক্কা মারল একটা।
আরে–আচ্ছা লোক দেখছি তো।–গেটকিপার দামুর ঘাড়টা চেপে ধরল : পাগল নাকি?
ভারি গোলমাল শুরু হল একটা।
কোন দিক থেকে সেই দুটো লোক এগিয়ে এল–সেই যারা সকালে ঘোড়া ধোয়াচ্ছিল। দামুকে দেখেই চেঁচিয়ে উঠল তারা।
আরে এই তো সেই পাগলা। সকালে হাতি চাইতে এসেছিল।
পাগলা-পাগলা বোলো না বলে দিচ্ছি।–দামু চেঁচিয়ে উঠল : উদিকে রাত্তিরে লোকে তাঁবুতে আগুন দিতে চাইছে, আর এরা–
হাতি ছেড়ে এবারে আগুন।–লোকগুলো হা-হা করে হেসে উঠল : মাথায় একটা-একটা খেলে ভালো। যা পাগলা–শিগগির ভাগ এখান থেকে
তোরা পাগল–তোরা ভাগ। আমি ম্যানেজারবাবুকে বলবই। নইলে রাত্তিরে যদি আগুন ধরিয়ে দেয়
হা-হা-হা-হাসতে-হাসতে গড়িয়ে পড়ল লোকগুলো।
সরো–আমায় যেতে দাও বলছি বলে দামু এবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল গেটকিপারের ওপর। আর তক্ষুনি তিন-চারটে লোক সাপটে ধরল তাকে।
এই পাগলটা তো দেখছি এখানে আর সাকাস করতে দেবে না। আবার যাঁড়ের মতো চাঁচাচ্ছে দ্যাখ না। হাত-পা মুখ বেঁধে ফ্যাল শক্ত করে।
তাই হল। দামুকে তারা আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল বস্তার মতো। গোঁ-গোঁ করতে লাগল দামু। সার্কাসের জিমন্যাস্টিক করা জোয়ান লোক সব–তাদের সঙ্গে সে পারবে কী করে?
