হাতি চড়ে বীরদর্পে দামু রওনা হয়ে গেল। পিছন থেকে হাততালি দিয়ে ম্যানেজার আর তার দলবল গান গাইতে লাগল। ট্রা-লা-লা-লা-লা–
দামু চলল–মাঠ-ঘাট পেরিয়ে–গ্রাম ছাড়িয়ে। যেতে-যেতে এক জায়গায় দেখল সাইকেল থামিয়ে তার হাতির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে পথের ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেই দারোগাবাবু। দামু তাঁকে দেখে গান গেয়ে উঠল :
এখন করবে আমার কী
আমি হাতি পেয়েছি।
দারোগা কিছুই করতে পারলেন না। কেবল ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলেন।
হাতি চলল কলাগাছ খেতে-খেতে–আরও অনেক গ্রাম-নদ-নদী-মাঠ-জঙ্গল পেরিয়ে। তারপরে এক জায়গায় একদল ছেলেমেয়ে চেঁচিয়ে উঠল–হাতি-হাতি? দামুর হাতি দেখেই তারা চ্যাঁচালো কি না কে জানে কিন্তু ঘোঁৎ করে আওয়াজ তুলে একটা বেজায় মোটা লোক তক্ষুনি তাদের পিছনে তাড়া করল।
জগাই ঘোষ!
হাতির ওপরে বসে দামু দুলে দুলে বলতে লাগল :
বনের হাতির পিঠে চড়ে–
মানুষ-হাতি দৌড়ে মরে!
জগাই শুনতে পেল না। সে হা-রে-রে-রে করে বাচ্চাদের পিছনে পিছনে ছুটতেই লাগল।
ঠিক সেই সময় কলিম শেখ এক ঝাঁকা ঢ্যাঁড়স নিয়ে বাজারে বেরুচ্ছিল। হঠাৎ সে দেখল সামনে একটা বিরাট হাতি।
কিন্তু হাতিটাকে ভালো করে দেখবার আগেই তার কানে এল : কলিম দাদা–ও কলিম দাদা!
কলিম হাঁ হয়ে দেখল, হাতির উপরে দামু বসে।
অ্যাঁ, তুমি।
আমিই তো। সেই দামু। কত খাইয়েছিলে, কত আমায় যত্ন করেছিলে–মনে আছে?
হাতি পেয়েছ তা হলে?
দেখতেই পাচ্ছ।
ভীষণ খুশি হয়ে কলিম শেখ বললে, যে লোক ভালো হয়, আল্লাহ তার ভালো করেন। তা হাতি থামাও দাদা-দুটো কলা-মুলো খাইয়ে দিই।
নিশ্চয়–নিশ্চয়। তোমার এখানেই তো হাতিকে বরণ করতে হবে আগে। তুমি ভরসা না দিলে তো আমি ডুবে যেতুম কলিম দাদা। তুমি কলা-মুলো খাওয়াবে–আর নিবারণ ময়রাকে ডাকো–সে পাঁচ টাকার জিলিপি দিয়ে যাক–ভারি চ্যাটাং চ্যাটাং তার কথা। ও মাহুত দাদা-হাতি থামাও।
.
পঞ্চানন মুখুজ্যের বেয়াই ত্রিলোচন চক্রবর্তী তাঁর কাছারি বাড়িতে বসে চমকে উঠলেন। মস্ত একটা হাতি দেউড়ি পেরিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল।
আশ্চর্য হয়ে বেরিয়ে এলেন ত্রিলোচন।
কার হাতি? কোত্থেকে এল?
পা ভেঙে হাতি বসে পড়ল তাঁর সামনে। আর হাতির ল্যাজ বেয়ে সড়াক করে নেমে এল দামু। ত্রিলোচনের পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বললে, রুনকু দিদিকে হাতি করে দাদুর বাড়ি নে যাব দা-ঠাকুর।
ত্রিলোচন একটা খাবি খেয়ে বললেন, অ্যাঁ।
দিদি কোথায়–তাকে ডাকুন।
ত্রিলোচন আবার বললেন, অ্যাঁ।
কিন্তু দিদিকে আর ডাকতে হল না। দোতলা থেকেই সে হাতি দেখেছিল, হাতির পিঠে দামুকেও দেখেছিল। চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতে, লাফাতে লাফাতে সে ছুটে বেরিয়ে এল।
আমার হাতি এসেছে–আমার হাতি এসেছে। দামুদা হাতি এনেছে–এবার আমি হাতি চেপে দাদুর বাড়ি যাব।
তারপর?
তারপর আর কী? হাতি চেপে রুনকু দাদুর বাড়ি গেল কত আনন্দ, কত খাওয়াদাওয়া হল, রামের মা রুনকুর জন্যে কত পিঠে, কত নাড়, কত মোয়া যে তৈরি করল! বেশিটাই অবিশ্যি গেল দামুর পেটে।
আর পঞ্চানন–দামুকে বুকে জড়িয়ে ধরে–কত চোখের জল ফেলে–কত যে আশীর্বাদ করলেন–সে আর কী বলব।
ওদিকে থানার সেপাই ছত্তেরি সিং! হঠাৎ একদিন দশ টাকার একটা মানি অর্ডার এসেছিল তার নামে। তাতে লেখা : হাতি পেয়েছি, মিঠাই খেয়ো। ছত্তেরি সিং ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারল না–কিন্তু মিঠাই খেল পেট ভরেই।
দামু এখন আর গাঁয়ে থাকে না–সে থাকে কলকাতায়। সে আর তার পিসি রুনকু দিদির কলকাতার বাড়িতেই রয়েছে। দামুদাদাকে ছাড়া রুনকুর এক মিনিটও চলে না–দামু তাকে এখনও হাতি পাওয়ার গল্প বলে–শুনে-শুনেও রুনকুর কাছে তা পুরনো হয় না।
দামু এখন কলকাতার লোক–অনেক চালাকচতুর হয়ে গেছে। এখন আর তার পাগড়ি নেই, সে লাঠিও না। তবু তাকে দেখলেই তোমরা চিনতে পারবে। রোজ বেলা দশটার সময়–গড়িয়াহাটার মোড়ে একটি ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েকে সে ইস্কুলে নিয়ে যায়। দু-চারদিন ওই সময়–মোড়টার কাছে দাঁড়ালেই তোমরা ওদের দেখতে পাবে। তখন ওকে জিজ্ঞেস কোরো :তোমার নাম কি দামু? ও গম্ভীর হয়ে বলবে : আমার নাম সুদামচন্দ্র মণ্ডল।
তোমার পাগড়ি কোথায় গেল?
পাগড়ি আমি আর পরিনে।–দামু আরও গম্ভীর হয়ে বলবে : গাঁয়ের লোকে পরে।
তোমার লাঠিগাছটা কোথায়?
দিদিমণিদের বাড়িতে বন্দুক আছে। লাঠি আর লাগে না।
দামু, তুমি আমাদের হাতি চড়াতে পারো?
দামু আরও গম্ভীর হয়ে বলবে : সে অনেক বেত্তান্ত। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আমার কথা কইবার সময় নেই, দিদিমণির ইস্কুলের দেরি হয়ে যাবে।
তোমরা এই হাতির গল্পটা যদি দামুর মুখ থেকেই শুনতে চাও, তা হলে ওর রুনকু দিদিমণির সঙ্গেই ভাব করে নিয়ো।
রাঘবের জয়যাত্রা (উপন্যাস)
এক
রামগর্জনবাবু দোকানে প্রথমে সিদ্ধিদাতা গণেশকে প্রণাম করলেন। তারপর চারদিকে গঙ্গাজল ছিটিয়ে মন্ত্রট আউড়ে, নিজের ক্যাশবাক্সটির সামনে এসে ভাবুকের মতো বসে পড়লেন।
এখনও ভোর হয়নি। মফস্বল শহরের ইলেকট্রিক আলোগুলো সবে নিবতে আরম্ভ করেছে। গঙ্গার দিকটায় আকাশে ফিকে লালচে রং। কাকেরা সবে বেরুতে আরম্ভ করেছে, রামগর্জনবাবুর টিনের চালে গোটাকতক শালিক পাখি ঘুম থেকে উঠেই ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে–ওই ওদের স্বভাব।
