সামনের বড় গেটটা পেরিয়ে দামু একেবারে তাঁবুর কাছে চলে এল। বাইরে একটা খাঁচার। ভেতরে চার-পাঁচটা বাঁদর লাফালাফি করছিল, কয়েকটা বাচ্চা গাঁয়ের ছেলে হাঁ করে বাঁদর দেখছিল আর বাঁদরগুলো ভেংচি কাটছিল তাদের। দামুও কিছুক্ষণ সেসব দেখল। তিনটে ঘোড়া চি-হি-হি করছিল এক জায়গায় আর শাদা পোশাক-পরা দুজন লোক বালতি করে জল দিচ্ছিল, একজন মালকোঁচা মারা গাঁট্টাগোট্টা জোয়ান থাবড়ে থাবড়ে গা পরিষ্কার করছিল তাদের।
দামু এদিক-ওদিক তাকাল। কিন্তু যে-হাতির জন্য সে এখানে এসেছে, তাদের কাউকে সে দেখতে পেল না। সাকাসের হাতিদুটোকে ছেলেপুলেরা বিরক্ত করে বলে ম্যানেজার তাঁবুর ওপাশে–ভেতর দিকে বেঁধে রেখেছিল তাদের।
যারা ঘোড়া ধোয়াচ্ছিল, এবার তাদের নজর পড়ল দামুর দিকে। বেড়ে মূর্তিটি তো! এমন জীব তত সহজে চোখে পড়ে না!
একজন জিজ্ঞেস করলে, ওই ওহে–তোমার নাম কী?
সাহস পেয়ে দামু বললে, আমি? আমার নাম দামু দাস।
সার্কাসে চাকরি করবে?
শুনে যে দামুর মনটা একবার ছটফট করে উঠল না, তা নয়। সার্কাসের চাকরি? আহা–তার মতো সুখের আর কী আছে! রোজ বিনি পয়সায় হাতি-ঘোড়া বাঘ-ভাল্লুকের। খেলা দেখা যাবে, হয়তো বা হাতিতে চড়াও যাবে কখনও কখনও। লোকে কত খাতির করবে-বলবে, সাবাস-সাকাসের খেলুড়ে। হয়তো অনেক মাইনেও দেবে কে জানে, এক কুড়ি টাকাই কি না!
কিন্তু তা হয় না। আগে রুনকু দিদির জন্যে হাতি যোগাড় করে তবে অন্য কথা। দামু গম্ভীর হয়ে বললে, না–আমি এখন চাকরি করব না।
কেন হে–আপত্তি কী?–একটা লোকের নাকের নীচে মাছির মতো একটু গোঁফ ছিল, সে মিটমিট করে হেসে বললে, আমাদের খাঁচায় শিম্পাঞ্জি নেই–অনেক দাম, তুমি থাকলে তোমাকে দিয়েই কাজ চলে যেত।
শিম্পাঞ্জি?–দামু অবাক হয়ে গেল সে কাকে বলে?
নিজেই তো তুমি শিম্পাঞ্জি হে–চেনো না? বেশ খাঁচায় থাকবে–কলাটা-মুলোটা খেতে দেব–নেচে নেচে খেলা দেখাবে–হি-হি-হি!
সব লোকগুলো একসঙ্গে হাসিতে গড়িয়ে পড়ল।
দামু বোকা হলেও বুঝতে পারল এরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে, আর শিম্পাঞ্জি নিশ্চয় কোনও জানোয়ারের নাম। বানর-টানরই হবে হয়তো বা।
দামু গজগজ করে বললে, আমি তোমাদের সঙ্গে কথা কইব না। সার্কেসের মালিকের সঙ্গে দেখা করব।
মালিক? তার সঙ্গে তোমার কী কাজ?
দরকারি কথা কইব।
দরকারি কথা?–লোকগুলো একটু অবাক হয়ে হাসি বন্ধ করল : কী কথা?
তাঁর ঠেয়ে বলব।
লোকগুলো একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তারপর একজন এগিয়ে এসে বললে, আমাকে বলতে পারো, আমিই মালিক।
দামুর ঠিক বিশ্বাস হল না! কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে রইল। তারপর আস্তে-আস্তে বললে, একটা জিনিস আমি চাইতে এসেছি। এই তিন দিনের জন্যে।
কী সেটা?
একটা হাতি।
কী বললে?-লোকগুলো একসঙ্গে হাঁ করল : কী বললে তুমি?
দামু আবার গম্ভীর হয়ে জবাব দিলে : হাতি–একটা হাতি। রুনকু দিদির ওখানে নিয়ে যাব–দিদি সেটাতে চেপে দাদুর বাড়িতে–
দামুর কথাটা শেষ হতেও পেল না! লোকগুলো চারদিক ফাটিয়ে হেসে উঠল হা-হা করে। একজন বললে, পাগল, আর একজন বললে, দে ওর মাথাটা ঠাণ্ডা করে।
ঝপাৎ–ছলাৎ! একেবারে পুরো এক বালতি ঘোড়া-ধোয়ানোর ময়লা জল এসে পড়ল দামুর মুখে। সেই জলের ঘায়ে উল্টে পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে দামু দেখল, আর-এক বালতি তুলে ধরেছে আর একজন।
গিছি গিছি–বাবা গো–বলে টেনে দৌড় দিলে দামু। যে বাচ্চাগুলো এতক্ষণ বাঁদরের ভেংচি দেখছিল, পাগলা-পাগলা বলে তারাই তাড়া করল দামুকে।
ছুটতে ছুটতে দামু চলে এল প্রায় গাঁয়ের বাইরে। তারপর সামনে একটা জংলা বাগানের ভেতরে মস্ত একটা পোড়ো বাড়ি দেখতে পেয়ে ঢুকে গেল তার ভেতরে।
না ঢুকে উপায় ছিল না। প্রায় শ তিনেক ছেলে তার পিছু নিয়েছিল আর সমানে গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাচ্ছিল : পাগলা–হাতি-পাগলা। দামু এতক্ষণে বুঝতে পারছিল, হাতির নাম শুনলেই সেই জগাই ঘোষ অমন করে খেপে যায় কেন।
একটা ভাঙাচুরো অন্ধকার ঘরের ভেতরে, ইটের ওপর মাথা রেখে সারাদিন মনের কষ্টে চুপ করে পড়ে থাকল দামু। আজকে তার কিছুই খাওয়া হয়নিদারুণ দুঃখে সেই খিদের কথাটাও একেবারে ভুলে গেল সে। পাওয়া গেল না-হাতি পাওয়া গেল না। দাদাঠাকুরের অপমান হল, রুনকু দিদি দাদুর বাড়িতে যেতে পারল না, দামুর কথার খেলাপ হয়ে গেল। না–সে আর দেশে ফিরবে না। এইবার একদম বিবাগী হয়ে–যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই চলে যাবে।
ছত্তেরি সিং বলেছিল, আসামের জঙ্গলে হাতি ধরে, সেখানে গেলে চেয়ে-চিন্তে একটা হাতির বাচ্চা আনা যায়। কিন্তু তারাও কি দেবে। হয়তো এমনি পাগল বলেই তাড়িয়ে দেবে তাকে। দামুর গাঁয়ের কথা মনে পড়ল, পিসিমার কথা মনে পড়ল, ফোঁস ফোঁস করে কাঁদতে লাগল দামু।
দিনটা এইভাবে কেটে গেল, বেলা পড়ল, সন্ধ্যার অন্ধকার নামল পোড় বাড়িতে ঝিঁঝি ডাকতে লাগল, দামুর ভয় ধরে গেল।–ভাবল, এই বেলা উঠে পড়ি এখান থেকে–আঁধারে আঁধারে পালিয়ে যাই স্টেশনের দিকে। এমন সময়–
এমন সময় হঠাৎ মানুষের গলার আওয়াজ। কারা যেন চুপিচুপি কথা কইছে!
ভূত। পিলে চমকে উঠল। তারপরেই দামুর চোখে পড়ল, ঘরটার ফাটা দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে আলো আসছে। পাশের ঘরে কারা যেন কথা বলছে।
দামু চোখ এগিয়ে নিলে ফাটলের দিকে।
