–দেবে?
–দে সকতা (দিতেও পারে)। খুশি হোলে কেনো দিবে না?
আর বলতে হল না। দামু লাফিয়ে উঠল এবার।
–সেপাইজী, আমি আসামেই যাব।
–হাঁ যাও।-ছত্তেরি সিং ভরসা দিয়ে বললে, কুছ ডর নেহি দাদা, তুমি বহুৎ ভালা আদমি আছে–তুমার ভালা হোবে। এখানে বড়বাবু তোমাকে বুদ্ধ বানিয়েছে, তাই আমার বহুৎ দুখখো হইলো–এহি শলা (পরামর্শ) তুমাকে দিলাম। চলা যাও ভাইয়া-আজহি চলা যাও।
দামুর চোখ জলে ভরে গেল!
–সেপাইজী, খুব উগার করলে আমার। এই তোমার গা ছুঁয়ে বলছি দাদা, হাতি যদি পাই তোমাকে পেট ভরে আমি মোণ্ডা খাওয়াব।
–আচ্ছা-আচ্ছা, আগে হাঁথি মিলে, তবে তো!–ছত্তেরি সিং হাসল।
সেই রাতেই রওনা হল দামু। দারোগা আর তাঁর গিন্নি তখন অঘোরে ঘুমুচ্ছেন। ছত্তেরি সিং তাকে স্টেশনের রাস্তা বলে দিয়েছিল। মাইল পনেরো রাস্তা বাসে চেপে যেতে হয়। কিন্তু পাড়াগাঁয়ে আর অত রাতে বাস কোথায়? তা ছাড়া ছত্তেরি সিং-এর কথায় দামুর ভরসা নেইবাসে যদি কেউ তাকে চিনে ফেলে আর দাবোগাকে গিয়ে খবর দেয়? সর্বনাশ! উঁহু, বাস পেলেই চেপে বসবে, দামু এমন কাঁচা ছেলে নয়।
লম্বা লম্বা ঠ্যাংয়ের কাছে পনের মাইল কিছুই নয়-দামুর হাঁটবার অভ্যেস আছে, দেখতে-দেখতে সে পথ পেরিয়ে গেল। চতুর্দশীর জ্যোৎস্না ছিল আকাশে, কোনও অসুবিধে হল না। কেবল দু-চার বার তাকে দেখে গাঁয়ের কুকুরগুলো ঘেউঘেউ করে উঠেছিল কয়েকটা শেয়াল খ্যাঁচম্যাচ করে এদিক-ওদিক ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল, একজন চৌকিদার কে যায় গো বলে হাঁক দিয়ে দামুর সামনে এসেই–ওই বিকট মূর্তি, মস্ত পাগড়ি আর লম্বা লাঠি দেখে, ভূত ভেবে–বাবা গো বলে দৌড় দিয়েছিল। আসাম যাওয়ার উৎসাহে দামু এ সব কিছুই গায়ে মাখেনি; থানার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে মাইল পাঁচেক এসেই সে একটা করুণ গান ধরেছিল–ও রাম, কেন তুই যাবি বনবাস–আর এই গান গাইতে গাইতেই ঠিক ভোরবেলায় এসে সে রেলের ইস্টিশনে পৌঁছে গেল।
আসাম যেতেই হবে। কিন্তু তার আগে–।
তার আগেই দামুর চোখে পড়ল স্টেশনের লাল ইটের দেওয়ালে ছবিওলা একটা মস্ত পোস্টার। হাতি-ঘোড়া বাঘ-ক্লাউন–তারের ওপরে সাইকেল চালাচ্ছে মেয়েরা, ফ্লাইং ট্রাপিজ থেকে একজন শূন্যে উড়ে যাচ্ছে। আর, আর লেখা আছে–দি গ্রেট হিমালয়ান সাকাস। চমকপ্রদ হাতি আর বাঘের খেলা। রহিমপুরের মেলায় দেখানো হইতেছে। এমন সুযোগ–
দামু সামান্য যেটুকু লেখাপড়া জানত, তাতে ওটুকু সে এক রকম পড়ে ফেলল। নেচে উঠল তারপরেই।
সে কোথায় যাবে ঠিক হয়ে গেছে। আসাম নয় রহিমপুরে।
.
দশ
এই সকালবেলাতেই একজন লোক ইস্টিশনের বাইরে বসে, একটা গাছের গায়ে হেলান দিয়ে, শিশিরে ভিজে ভিজে ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে, কুড়মুড় কুড়মুড় করে মুড়ি খাচ্ছিল আর একটা পাকা লঙ্কায় একটু একটু করে কামড় দিয়ে হুস-হুঁস করে শিস টানছিল। দামু খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার খাওয়া দেখল, তারপর ডাকল, ও মশাই।
লোকটি বললে, উঁ–হু–উস। আমায় কিছু বলছ?
এজ্ঞে আপনাকেই তো!
হুস–কুড়মুড় কুড়। তা কী বলবে বলে ফ্যালো।
এজ্ঞে সার্কেসটা কোন দিকে হচ্ছে?
সার্কেস? হু উ-উস!–একবার লাল লঙ্কার শেষটুকু অবধি দাঁতে কেটে নিয়ে, তার বোঁটাটা নাকের কাছে ধরে, লোকটা কিছুক্ষণ চেয়ে রইল দামুর দিকে। লঙ্কার ঝালে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল, বাঁ-হাতে সেটা মুছে ফেলে বললে, সার্কেস হচ্ছে ওই ওদিকে রথতলার মাঠে। কিন্তু তুমি কে হে?–দামুর সেই তালট্যাঙা চেহারা, মাথায় সেই জাঁদরেল পাগড়ি আর হাতের সেই জবরদস্ত লাঠির ওপর খানিকটা চোখ বুলিয়ে নিয়ে শেষে বললে, বুঝিচি।
কী বুঝেছ হে?
তুমি নিযস সার্কেসের খেলুড়ে। চেহারাতেই মালুম হচ্ছে।
দামু আপত্তি করে বললে, না, আমি কখনও সার্কেসের খেলুড়ে নই।
বললেই হল দাদা? কুড়কুড়কুড়। সার্কেসের লোক না হলে এমন উদভুট্টে চেহারা হয়। কারুর? তোমায় রাতের বেলা রাস্তায় দেখলে আমারই যে ভিরমি লেগে যেত হে!
দামু রাগ করে বললে, মেলা বোকো না। আমার চৌদ্দ পুরুষ সার্কেসের খেলুড়ে নয়।
তাই নাকি? হু-উ-স! তবে তুমি কোথায় খেলা দেখাও দাদা? কুড়-মুড়-কুড়। রাত-বিরেতে আমগাছে জামগাছে নাকি? রাম—রাম–রাম! ভূত আমার পুত, শাঁকচুন্নি আমার ঝি, রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে–
ধ্যাত্তোর–কী একটা বেহেড লোকের পাল্লায় পড়লুম।–দামু গজগজ করতে লাগল : তুমি বকর বকর করো বসে আর মুড়ি গিলে ময়রা–আমি যাচ্ছি।
পিছন থেকে খ্যাঁকর-খ্যাঁকর করে হাসতে থাকল নোকটা। দামু হনহন করে চলল। রথতলার মাঠের দিকে।
চিনিয়ে দিতে হল না সাকাসের তাঁবু, তার মাথার ওপর দিয়ে দড়িতে লাল-নীল পতাকার সার অনেক দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল। তার সামনে পৌঁছে দামু খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল। ওরেব্বাকত ছবি টাঙিয়েছে এখানে-ওখানে! সাইকেলে চেপে বাঁদর চলে যাচ্ছে–দড়ির দোলনা থেকে কারা যেন পরীর মতো আকাশে উড়ে চলেছে, হাতিরা লাল বল নিয়ে খেলা করছে, একজন আবার রাজপুত্তুরের মতো পোশাক পরে-হাতে চাবুক নিয়ে তিন-তিনটে সিঙ্গীকে শাসাচ্ছে।
কিন্তু দামু সব ছবি দেখছিল না–তার নজর শুধু হাতির দিকে। আহা–অমন একখানা হাতি যদি তিন দিনের জন্যও তাকে দেয়। শুধু যে রুনকু দিদিকে পিঠে চাপিয়ে দাদুর বাড়িতে নিয়ে যাবে তা নয়–দিদির সঙ্গে রাঙা বল নিয়ে এক-আধটু খেলাও করবে হয়তো। কী চমৎকার যে হবে তা হলে! ভাবতে গিয়ে হাততালি দিয়ে নেচে উঠতে ইচ্ছে হল দামুর।
