একটু কেশে নিয়ে দামু বললে, তা হলে ইয়ে মানে দারোগাবাবু, আপনাকে সবটা গোড়া থেকেই বলি।
দারোগা গম্ভীর হয়ে সব শুনলেন। কোনও কথা বললেন না, দু-একবার বোধহয় হাসি পেয়েছিল, খুক খুক করে কেশে সেটা সামলে নিলেন। তারপরে সব শুনে-টুনে আবার ফুড়ক-ফুড়ক করে হুঁকো টানলেন কিছুক্ষণ।
দামু কাতর হয়ে বললে, দারোগাবাবু, আমি হাতি পাব একটা?
দারোগাবাবু বললেন, নিশ্চয়।
আপনি যোগাড় করে দিতে পারবেন?
দারোগা বললেন, আলবাত। আমরা থানার দারোগা–ইচ্ছে করলে সব পারি। যদি মনে করি, তোমাকে এক ঘটি টাটকা বাঘের দুধও খাইয়ে দিতে পারি–তা জানো?
দামু একেবারে গলে গেল।
এজ্ঞে জানি বই কি! সবাই তো সেই কথাই বলে।
দারোগা বললেন, তবে হাতি তো–দু-চারদিনের কাজ নয়, যোগাড় করতে একটু সময় লাগবে। সেদিন তুমি বরং আমার বাসাতেই থেকে যাও। আপত্তি আছে?
আপত্তি! বলেন কী! আমি আপনার গোলাম হয়ে থাকব।
দারোগা খুশি হয়ে বললেন, তা হলে চলো আমার বাসায়। রাত্তিরে বোধ হয় কিছু খাওয়া হয়নি তোমার?
খাওয়ার কথায় দামুর মনে পড়ে গেল, সেই চিড়ের পুঁটলি সাবাড় হয়ে গেছে কখন, এখন পেটে আগুন জ্বলছে। বললে, এজ্ঞে না। খুব খিদে পেয়েছে।
পাবেই। পটাই চোরকে ধরা কি চাট্টিখানি কথা হে? ওর মুখ দেখেই তো অন্নপ্রাশনের চাল পর্যন্ত হজম হয়ে যায়। এসো–এসো আমার সঙ্গে। দেখি, বাড়িতে ভাত-তরকারি কিছু আছে কি না।
পরমানন্দে দামু দারোগার সঙ্গে রওনা হল।
আর দারোগাবাবু ভাবছিলেন–যাক, বাঁচা গেল। একটা হাবা-গোবা চাকর খুঁজছিলুম অনেক দিন ধরে–অ্যাদ্দিনে পাওয়া গেল সেটাকে। একেই বলে বরাত।
.
আট
চোর ধরা পড়ল, বকশিশও জুটল, কিন্তু দারোগার বাড়ি থেকে দামুর আর ছুটি মেলে না। সন্ধেবেলা–যেদিন থানায় বিশেষ কাজ-টাজ থাকে না–সেদিন দামুকে পাক্কা দুটি ঘণ্টা ধরে দারোগার হাত-পা ডলাই-মলাই করতে হয়। আমেজে দারোগার চোখ বুজে আসে, আর দামু তখন তাঁর কানের কাছে সমানে ভ্যানর-ভ্যানর করতে থাকে : আমার হাতি কী হল? অ দারোগাবাবু, আমার হাতি?
মেজাজী ঘুমটা চটে যায়–দারোগা ভারি বিরক্ত হন বোকা লোকটার ওপর। ধমক দিয়ে বলেন : হচ্ছে–হচ্ছে, এত ব্যস্ত কেন?
কই আর হচ্ছে। এক মাস পেরিয়ে গেল যে।
হাতি কি আর চাড়ডিখানি জানোয়ার?–হাই তুলে দারোগা বলেন, পাঁঠা না গোরু যে গলায় দড়ি বেঁধে দিলুম ব্যাব্যা, হাম্বা-হাম্বা করে ডাকতে থাকল আর তুই হিড়হিড়িয়ে টেনে নিয়ে গেলি? অত বড় পেল্লায় একখানা কাণ্ড, তাকে ধরতে বিস্তর হ্যাঁপা। এখন চুপ করে থাক, সময় হলেই এনে দেব, আর তুই তখন তার পিঠে চেপে ড্যাং ড্যাং করতে করতে চলে যাবি।
বলতে বলতে দারোগা ঘুমিয়ে পড়েন আর কুড়ং কুড়ং করে তাঁর নাক ডাকতে থাকে।
আসলে, দামুকে পেয়ে দারোগাবাবুর আর তাঁর গিন্নির সুখের সীমা নেই, মাইনে-টাইনে কিছু তো দিতে হচ্ছে না–দামু মাইনে চায়ও না–বিনি পয়সায় এমন খাটবার লোক, এমন। একটি নিরেট বোকারাম আর কোথায় পাওয়া যাবে? শুধু হাত-পা-ই টেপে নাকি? কুয়ো থেকে বালতি বালতি জল তুলে দিচ্ছে, বাগান কোপাচ্ছে, আস্ত-আস্ত গাছ হেঁইয়ো হেঁইয়ো করে কেটে চ্যালা কাঠ বানাচ্ছে, কাঁড়ি কাঁড়ি বাসন মেজে দিচ্ছে। তার ওপরে গোরু চরানো তো আছেই।
দারোগা আর তাঁর গিন্নি দুধ-ক্ষীর এইসব খেতে খুব ভালবাসেন–কেই বা না বাসে, বলো? আর পেট পুরে দুধ-ক্ষীর-দই খাওয়ার জন্যে দারোগা গোটা সাতেক গোরু পুষেছেন। রোজ সকালবেলা নটা নাগাদ বাড়ির কাজকর্ম সেরে দামু বেরোয় গোরু চরাতে। রাতের খানিকটা বাসী রুটি-তরকারি গিন্নি-মা পুঁটলি করে বেঁধে দেন–সারাদিন তাই গিলে বিকেল পর্যন্ত দামু নদীর ধারে গোরু চরায়, তারপর বিকেল হলে গোরুর পাল তাড়িয়ে ফিরে আসে।
গোরু চরাতে দামুর যে খুব খারাপ লাগে তা নয়। বাড়িতে থাকলেই তো গিন্নি মার হাজারো ফাইফরমাস, তার চাইতে এ এক রকম ভালো। নিজের আনন্দে চেঁচিয়ে গান। গাওয়া যায়-এমনিতে কেউ তার গান শুনতে চায় না, হয়তো কেবল প্রাণ খুলে যাত্রাগানের একটা সুর ধরেছে : ও ভাই লক্ষ্মণ রে, কোথায় গেল জনকনন্দিনী–অমনি চারদিকে সবাই হইচই করে ওঠে: থাম-থাম কান ফেটে গেল) গোরুরাও তার গানে কোনও আপত্তি করে না। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে, একটা লাল-শাদা আর একটা কালো গোরুকে নিয়ে। দারোগার গোক হলে কী হয়–সে-দুটো আইন কানুন কিছু মানে না। একবার ছাড়া পেল তো আর কথা নেই সঙ্গে সঙ্গে দে-দৌড়। লম্বা লম্বা ঠ্যাং নিয়েও দামু তাদের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না, একেবারে ঘোড়ার মতো ছুটতে থাকে গোরু দুটো।
শুধু ছুটলেও বা কথা ছিল। এর কলাই খেতে নেমে সব মুড়িয়ে দিয়ে আসে, তার লাউয়ের মাচা টেনে নামায়, ওর বাগান ভেঙে ঢুকে কচি কচি পালং শাকগুলো একেবারে সাফ করে দেয়। গোৰু তো নয়–যেন দু-দুটো ডাকাত পুষেছেন দারোগা। তাঁর গোরু বলে লোকে আর তাদের ধরে খোঁয়াড়ে দিতে সাহস পায় না; কিন্তু দামুকে গালাগাল করে একেবারে ধুন্ধুড়ি উড়িয়ে দেয়!
কেমন বেয়াক্কেলে গো-মুখ রাখাল তুমি হে! গোরু সামলাতে পারো না।
গো-মুখ্য বলেই তো গোরু চরাই। হি-হি!–দামু হাসতে চেষ্টা করে।
আবার দাঁত বের করে হাসা হচ্ছে? বলি, আমার পালং শাকগুলো সব যে খেয়ে নিলে–তার দাম কে দেবে হে? তুমি?
