আমি দেব কেন? দারোগাবাবুর গোরু, তাঁর কাছেই যাও না।
দারোগার কাছে আর কে পালংলা কলাইয়ের দাম চাইতে যাচ্ছে? জলে বাস করে কুমিরকে ঘাঁটানো–আরে ব্বাস! নিরুপায় লোকগুলো বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়–আর দূর থেকে দামুকে গাল পাড়ে।
কেলেভূত–ঊন-পাঁজুরে–বেয়াক্কেলে।
কিন্তু সবাই তো আর নিরীহ ভালোমানুষ নয়। শেষ পর্যন্ত একদিন একজন লোক এসে ক্যাঁক করে দামুর টুটি টিপে ধরল।
কী তার চেহারা! সেই হাতি-মাকা জগাই ঘোষকেও বলে তফাত থাকো! বুনো মোষের মতো জোয়ান, মুখে দেড় হাত দাড়ি, চোখ দুটো আগুনের ভাঁটার মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। দামুর ঘাড় চেপে ধরে বললে, দে শিগগির, আমার সাত সের ঝিঙের দাম দে।
সেই বজ্র টিপুনিতে দামুর দম আটকে আসবার জো।
ছাড়ো-ছাড়ো, আমি কোথায় পয়সা পাব মিঞা সাহেব।
পয়সা নেই তো আমার ঝিঙেগুলো গোরুকে দিয়ে খাওয়ালি কী বলে?
আমি তো খাওয়াইনি–নিজেই খেয়েছে। তোমার ইচ্ছে হয় দারোগাবাবুকে—
নিকুচি করেছে দাবোগাবাবুর! তুই রাখাল–সব দোষ তোর! বলে লোকটা দামুকে ধরে ঝাঁকুনি দিতে লাগল, চোখ কপালে চড়ে গেল দামুর।
আমি–আমি–দাবোগাবাবুকে বলে দেব।
দে বলে।–দাড়িওয়ালা লোকটা বিচ্ছিরি করে মুখ ভ্যাংচাল : তারপর আবার আসবি তো গোরু চরাতে? তখন তোর মুণ্ডটি ভেঙে নদীর বালিতে পুঁতে দেব–এই তোকে বলে গেলুম।
তারপর ঠাঁই-ঠাঁই করে কটা রাম চড়। সেই চড় খেয়ে দামু মাথা ঘুরে পড়ে গেল, যখন উঠল তখন দাড়িওয়ালা লোকটা কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে।
মনের দুঃখে দামু বসে বসে খানিকটা হাঁউমাউ করে কাঁদল। তার পিসিমার কথা মনে পড়ে গেল কতদিন দেশে যায়নি সেকথা ভেবে তার আরও কান্না পেতে লাগল। কী কুক্ষণেই যে রুনকুকে হাতি চড়াবার কথাটা বলেছিল সে।
একটু সামলে-সুমলে দেখে সামনেই সেই লাল-সাদা গোরুটা। সাত সের ঝিঙে খেয়ে এসে পরমানন্দে জাবর কাটছে এখন।
তোর জন্যেই এত কাণ্ড! দাঁড়া–মেরে পোম্বা উড়িয়ে দেব।
হাতে লাঠি ছিল না–দামু ঠেসে একটা চাঁটি বসিয়ে দিল গোরুকে। সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজ হল ফোঁসস! এক তঁতোয় গোরু দামুকে চিত করে দিয়ে ল্যাজ তুলে হন হন করে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল।
সেদিন বাড়ি ফিরে দামুর আর ধৈর্য থাকল না। একে চড়ের জ্বালা, তার ওপরে গোরর অঁতো–মানুষের শরীরে আর কত সয়! দামু সোজা গোঁ-গোঁ করতে করতে দারোগাবাবুর কাছে গিয়ে হাজির হল।
শিগগির হাতি দিন আমার। আমি চলে যাব।
দারোগা মুখ থেকে হুঁকো নামিয়ে বললেন, চলে যাবি মানে?
মানে, চলে যাব। আর আমি গোরু চরাতে পারব না।
পারবি না-বটে!–দারোগা মিটমিটে চোখে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ : যাবার চেষ্টা করেই দ্যাখ না। তোকে আমি তখুনি ধরে চোর বলে হাজতে পুরে দেব।
চোর বলে–অ্যাাঁ?–দামু শুনে আকাশ থেকে পড়ল : কেন, আমি কী চুরি করিচি তোমার?
আমার চুরি করবি কেন? গাঁসুন্ধু লোকের ঘরে সিঁধ দিয়েছিস।
আমি।
হুঁকোয় একটা জর টান দিয়ে দারোগা বললেন, আলবাত। সিঁদেল চোর না হলে আর অমন বিটকেল চেহারা হয় কারও? তুই পটাই চোরের দলের লোক–আমি বুঝেছি।
আমি পটাই চোরের দলের?–দামু কটা খাবি খেল শুনে : বা রে, আমি তাকে ধরিয়ে দিলুম, আর শেষে আমাকেই–
হাঁ-হাঁ, তোকেই–তোকেই হাঁড়ির মতো মুখ করে দারোগা বললেন, আমি বিশ বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছি, চোর চিনি নে? কত ঘঘাড়েল চোরকে জেলে পাঠিয়ে ঘানি ঘোরালুম আর তুই তো তুই।–দারোগা হুঁকোয় আর একটা টান দিয়ে বললেন, আমি সব জানি। চুরির বখরা নিয়ে পটাইয়ের সঙ্গে তোর ঝগড়া হয়েছিল, তাই তুই তার ঘাড়ে চড়াও হয়ে ধরিয়ে দিয়েছিস, আর দিব্যি ভালোমানুষ সেজে সরকারের কাছ থেকে বকশিশ। নিয়েছিস। আমি ইচ্ছে করে তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ফের যদি হাতি-হাতি করে চ্যাঁচাবি কিংবা এখান থেকে সটকাতে চাইবি–তা হলে তোকে তখুনি আমি হাজতে চালান করে দেব। তারপরে পাক্কা ছটি মাস জেল।
অ্যাঁ।–
দামু হাঁ করে চেয়েই রইল, আর কথা ফুটল না তার মুখ দিয়ে।
দারোগা বললেন, আর যদি জেল খাটতে না চাস, তা হলে যেমন আছিস, তেমনি থাক–বাসন-টাসন মাজ, কাঠ চ্যালা কর, গোরু চরা। তোফা আরামে থাকবি। এই তোকে সাফ কথা বলে দিলুম। এখন যা–খানিক সর্ষের তেল এনে ভালো করে আমার হাঁটুতে মালিশ করে দে। বেশ টনটন করছে–বাতই হল কি না কে জানে।
এই বলে দারোগা পরম আরামে হুঁকো টানতে লাগলেন। আর তাঁর সেই মোক্ষম কথাগুলো শুনে গোটা তিনেক খাবি খেয়ে, দামু হুঁকোর মতো মুখ করে গিন্নি-মার কাছে সর্ষের তেল আনতে চলে গেল।
মুচকি হেসে দারোগা মনে মনে বললেন, পুলিশের খপ্পরে পড়েছ বোকারাম–এত সহজেই কি আর ছাড়ান পাবে? হুঁ–হুঁ—
.
নয়
হাঁড়ির মতো মুখ করে দামু দারোগার পায়ে তেল মালিশ করতে লাগল, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লেন দারোগা, গুড়গুড় করে নাক ডাকতে থাকল তাঁর। তখন দামু উঠে পড়ল সেখান থেকে, তারপর দারোগার বাসা থেকে বেরিয়ে সুড়সুড় করে এসে থানার বারান্দায় বসে পড়ল।
ইস, প্যাঁচখানা দ্যাখো একবার। কী কুক্ষণেই যে সে হাতির বাচ্চা ভেবে পটাই চোরের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছিল, তারপর থেকেই এই যাচ্ছেতাই কাণ্ড! পটাই এখন কোনও জেলে আছে নিশ্চয়, অনেক ভালোই আছে তার চাইতে। সেও তো কয়েদী, দারোগাবাবুর হাত থেকে ছাড়া পাবার কোনও রাস্তাই তো দেখা যাচ্ছে না। জেলে গেলে নাকি ঘানি ঘোরাতে হয়, পটাইও নিশ্চয় ঘোরাচ্ছে, কিন্তু দামুর মনে হল তার চাইতে অনেক সুখেই আছে সে। তাকে তো আর দুটো হাড়বজ্জাত গোরু চরাতে হয় না, সেই গোরুর গুতো খেতে হয় না, কোত্থেকে একটা দাড়িওলা বিটকেলে লোক এসে তাকে ঠাঁই-ঠাঁই করে চাঁটিয়ে দেয় না! আর কাঠ চ্যালা করা–ওঃ! একদিন তো কুড়ল ফসকে তার একখানা পা-ই চ্যালা হয়ে যাচ্ছিল।
