শুনে দামু চটে গেল।
আমি বেহ্মদত্যি নই–দামু।
তা দামুই হও আর বেহ্মদত্যিই হও–এবার পটাইয়ের পিঠ ছেড়ে ওঠো দিকিনি। অজ্ঞান হয়ে গেছে-গোঁ গোঁ করছে, দেখতে পাচ্ছ না?
দামু এতক্ষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পটাইয়ের পিঠেই গদিয়ান হয়ে বসেছিল, এবার তোক করে লাফিয়ে উঠল।
চৌকিদার গুটিগুটি পায়ে আরও একটু এগোল দামুর দিকে।
তুমি কে বট হে?
দামু বিরক্ত হয়ে বললে, কানে কম শোনো নাকি? বললুম না–আমি দামু? বিদেশ থেকে এইচি?
বিদেশ থেকে? তা এই আমবাগানে ঢুকেছিলে কেন?
কে জানে আমবাগান না কী!–হাতির ব্যাপারে দামু চালাক হয়ে গিয়েছিল, আসল কথাটা স্রেফ চেপে গেল। গজগজ করে বললে, আঁধার হয়ে গেল, গাঁ-টা কিছু খুঁজে পাইনে, এর মধ্যে ঢুকে পড়েছিলুম। ভেবেছিলুম, সকাল হলে যা হয় হবে।
বিদেশী তো এখানে কেন?
একটা চা-চাকরি খুঁজতে।
তোমার যা চেহারা–দেখলেই তো প্রাণ ঠাণ্ডা হয়ে যায়।–একজন টিপ্পনি কেটে বললে, চাকরি তোমায় দেবে কে হে? রাত্তিরবেলা তোমাকে দেখলে তো মানুষের দাঁতকপাটি লেগে যাবে।
আর তুমিই বা কোন কাত্তিকটি হে?–দামু চটে গেল : এই তো বেঁটে একটা খটাশের মতন চেহারা–তার ওপর কপালে আবার একটা আব গজিয়েছে। ঠিক কোলাব্যাঙের মতো দেখতে।
চৌকিদার থানার লোক–সে গম্ভীর হয়ে ঝগড়াটা থামিয়ে দিলে। বললে, যেতে দাও, যেতে দাও, এ-সব তুচ্ছু কথা নিয়ে সময় নষ্ট করতে হবে না। তা দামু, তুমি পটাইকে ধরলে কী করে বলো তো হে? ভারি ঘোড়েল চোর, আজ তিন মাস ধরে আমরা ধরবার চেষ্টা করছি অথচ ওর টিকিও ছুঁতে পাইনে। ইদিকে আশপাশের পাঁচ-সাতখানা গাঁ চুরি করে একেবারে ফাঁক করে দিলে। কী করে এটাকে ধরলে দাদা?
ইচ্ছে করে তো ধরিনি।
সেই কপালে আবওলা কোলাব্যাঙের মতো লোকটা আবার টিপ্পনি কাটল : তা যা বলেছ, ইচ্ছে করে তোমার ধরবার দরকার হয় না। সামনে এসে একবার দাঁত খিঁচিয়ে দাঁড়ালেই–ব্যস!
চৌকিদার মোটা গলায় বললে, আঃ, চুপ করো না গুপী হাজরা। এখন আইনের কথা হচ্ছে, এর মধ্যে টিকটিক কোরো না। তুমিই বলো দিকিনি দাদা হয়েছিলটা কী?
কী আর হবে?–দামু একবার কটমট করে তাকাল গুপী হাজরার দিকে : ভাবলুম বনবাদাড়, রাত্তিরে আবার মা-মনসা ছুবলে না দেন। তাই গাছের ডালে উঠে একটু ঘুমুতে চেষ্টা করছিলুম। তারপরেই যেন একটা হাতি
হাতি! হাতি কী হে!–চৌকিদার চমকে গেল।
না–না, ভুল বলিচি।–দামু সঙ্গে সঙ্গে জিভ কাটল : মানে হাতি নয়–ঘুমের ঘোরে হাত ফসকে পড়ে গিয়েছি গাছ থেকে। একেবারে লোকটার ঘাড়ের ওপর।
পটাই কী করছিল গাছতলায়?
কী করছিল সে আমি কেমন করে জানব? ওকেই শুধোও না।
কিন্তু তুমি যে ধরিচিধরিচি বলে চ্যাঁচাচ্ছিলে? সেই চিৎকার শুনেই তো আমরা এদিকে দৌড়ে এলুম।
দামু মাথাটা একবার চুলকোতে চাইল, কিন্তু পাগড়ির জন্যে চুলকানো গেল না। বললে, তাই তো–কেন যে চ্যাঁচালুম–সে তো জানিনে। বোধহয় বেভুল লেগে গিয়েছিল।
চৌকিদার মাথা নেড়ে বললে, লাগে, ওরকম বেভুল লাগে। ঘুমুতে-ঘুমুতে ও-ভাবে। আচমকা কারুর ঘাড়ের ওপর পড়লে অমন চিৎকার লোকের বেরোয়।
পটাই চোর এতক্ষণে আস্তে আস্তে উঠে বসল। চোখ দুটো ছাগলের চোখের মতো গোল-গোল করে তাকাতে লাগল চারদিকে! ব্যাপারস্যাপার যেন এখনও সে বুঝতে পারছে না।
চৌকিদার ঠাট্টা করে বললে, ওঠো হে মক্কেল, আর কেন? বিস্তর হাড় জ্বালিয়েছ আমাদের, উঠে পড়ো এবারে। লক্ষ্মী ছেলের মতো থানায় চলো এবার, তারপর মাস ছয়েক বেশ করে জেলখানায় ঘানি ঘুরিয়ে আসবে।
পটাই ঘোঁ-ঘোঁ করে বললে, ভূ—ভূ–ভূত—
গুপী হাজরা খ্যাখ্যা করে হাসল : ভূত নয়–ভূত নয়, বেহ্মদত্যি! পরশু চক্কোত্তি মশাইয়ের বাড়িতে সিঁধ কেটেছিলে না? তিনিই বেহ্মদত্যি চালান করে দিয়েছেন।
দামু বললে, দ্যাখো কোলাব্যাঙ–
চৌকিদার বললে, আহা থামো থামো, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে নেই। চলো হে পটাই, দারোগাবাবু তোমার মুখোনা দেখবার জন্যে ভারি ব্যস্ত হয়ে রয়েছেন। আর দামুদাদা, তোমাকেও যে একবারটি থানায় আসতে হচ্ছে আমাদের সঙ্গে।
থানার নাম শুনে বিষম ঘাবড়ে গেল দাম।
আমি? আমি কেন থানায় যাব? চোর নাকি আমি?
আহা-হা, চোর তুমি কেন, চোর তোপটাই। তুমি তাকে ধরেচ না? পটাইকে ধরলে একশো টাকা বকশিশ পাওয়া যাবে, দারোগাবাবু নোটিশ দিয়েছেন যে! আজ তো তোমারই ফুর্তি হে! চলো–চলো–ড্যাং ড্যাং করে নাচতে নাচতে চলল।
পটাই হাজতে গেল, চৌকিদারের সঙ্গে সেই দুজন ছাড়া আরও কিছু কিছু লোক পটাইকে গাল দিতে দিতে থানায় গিয়েছিল, তারাও বাড়ি চলে গেল। দারোগা একটা চেয়ারে বসে হুঁকো খাচ্ছিলেন। এবার দামুর দিকে তাকিয়ে বললে, তুমি কোথায় যাবে?
আমি আবার যাব কোন চুলোয়?–দামু, চটাস করে একটা মশা মারবার চেষ্টা করে। বললে, যদি দয়া করে থাকতে দেন, তা হলে থানার বারান্দায় শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারি।
তারপর?
কাল সকালে আবার পথে বেরিয়ে পড়ব।
কিন্তু তোমার চোর ধরবার বকশিশ? ও তো সরকারি টাকা–পেতে একটু দেরি হবে।
তা বটে!–দামু ভাবনায় পড়ল : টাকাটা পেলে খুব উগার হত। একটা দামী জিনিস কিনতে বেরিয়েছি–মানে একটা হাতি–
দারোগার হুঁকোর ফুড়ক-ফুড়ক টান বন্ধ হয়ে গেল।
কী কিনতে বেরিয়েছ বললে?
দামু একটু চুপ করে রইল। তারপর দারোগাবাবুর ভারভাত্তিক চেহারা দেখে তার মনে হল, হাঁ, বিশ্বেস করে সব কথা এঁকে বলা যায়। ইনি শোনবার মতো লোক।
