ইকি ল্যাঠায় পড়া গেল রে বাপু। সারা রাতই ঘুরে মরতে হবে নাকি এমনি করে?
ল্যাঠা মিটতে দেরি হল না। শেষ পর্যন্ত দামু যেখানে গিয়ে পৌঁছল সেখানে চারদিকে শুধু গাছপালার সার আর অথই অন্ধকার।
অ্যাঁ–এই তো জঙ্গল! এই তো পেয়ে গেছি!
কিন্তু জঙ্গল পেয়েও দামুর মনে তখন আর সুখ ছিল না। বুক ভয়ে ধুকপুক করছে। তখন। বাপরে, কী অন্ধকার আধ হাত দূরেও যদি নজর চলে! ঝাঁ ঝাঁ করে ঝিঁঝি ডাকছে চারদিকে–সে-আওয়াজে কানের পর্দা ছিঁড়ে যাওয়ার জো! ধু ধুধুম করে কোথায় একটা হুতোম প্যাঁচাও ডাকল।
হাতি মাথায় থাক, এখন বাঘে না খেলেই রক্ষে।
লাঠিটা অবিশ্যি সঙ্গেই আছে, বাঘকে জুতমতো পেলে পিটিয়ে ঠাণ্ডা করেও দেওয়া যায়। কিন্তু তার আগেই তো বাঘ তাকে ধরে ফেলবে। অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না, পিছন থেকে বাঘ যদি গুটিগুটি এসে
ওরে বাপরে!
দামু আর ভাবতে পারল না। হাতি-টাতি পরে হবে, এখন তো একটা গাছে টাছে উঠে পড়া যাক। তারপর সকাল হলে খুঁজে দেখা যাবে, এই বনের ভেতর দু-একটা হাতির দেখা মেলে কি না!
অতএব আর কথা নয়, সামনে যে-গাছটা পেল, তাতেই তড়বড়িয়ে উঠে পড়ল দামু।
কী গাছ কে জানে। যেমন বড়, তেমনি ঝুপসি। গাছটার আধাআধি উঠে পড়ে, গোটা দুই মোটা ডালে ঠেসান দিয়ে বসে পড়ল দামু। জায়গাটা মন্দ জোটেনি। এখানে শুধু বসে থাকা নয়, ইচ্ছে হলে একটু ঝিমিয়েও নেওয়া যেতে পারে।
দু-চারটে কাঠপিঁপড়ে কামড়ে দিয়েছিল, তাতে এক-আধটু জ্বালা করছিল। একঝাঁক বিচ্ছিরি মশাও গুনগুন করছিল কানের কাছে। তবু পরম নিশ্চিন্তি হয়ে বসে রইল দামু। অনেকটা উঠে বসেছে সে–এখানে অন্তত বাঘ তাকে লাফিয়ে ধরতে পারবে না।
আশেপাশে এদিকে-ওদিকে জোনাকির সার জ্বলছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন দামুর দুচোখ ভরে ঘুম এল। হাতের লাঠিটা যে কোন ফাঁকে নীচে পড়ে গেল সে টেরও পেল না। তারপর একসময় চটকা তার ভাঙল। শুকনো পাতায় খসখস করে আওয়াজ উঠছে যেন। গাছের নীচে কালো মতন কী একটা চরে বেড়াচ্ছে না? অন্ধকারে চোখ একটু সয়ে গিয়েছিল। ভালো দেখতে না পেলেও দামু বুঝতে পারল, সেটা চার পায়ে গুঁড়ি মেরে হাঁটছে। না–বাঘ নয়। বরং–
অ্যাঁ, তবে কি বাচ্চা হাতি? মানে হাতির বাচ্চা?
মনে হতে যা দেরি। তবে তো পেয়ে গেছি! জয় গুরু!
গাছের তলায় হাতির বাচ্চাটা তখনও গুঁড়ি মেরে হাঁটছিল। দামু নামতে লাগল আস্তে আস্তে। ধরবই এবার। একবার ঝপাং করে পিঠে চড়াও হই, তারপর দেখব তুমি কেমন হাতির বাচ্চা! দেখব সুড়সুড় করে তোমায় পঞ্চানন মুখুজ্যের দুয়ারে নিয়ে হাজির করতে পারি কি না!
জয় গুরু!
হাত তিনেক ওপর থেকেই দামু ধপাস করে লাফিয়ে পড়ল হাতির বাচ্চার পিঠের ওপর। সঙ্গে সঙ্গেই সে আওয়াজ করল, ক্যাঁক–আর মাটির ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।
জঙ্গল কাঁপিয়ে, দামু বিজয়োল্লাসে হাঁক ছাড়ল : ধরিচি—ধরিচি—
.
সাত
সেই মিশমিশে অন্ধকারের ভেতরে একটা বিটকেল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল তখন।
ধরিচিধরিচি বলে দামু যত গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচায়–ততই চেপটে যাওয়া জানোয়ারটা কী রকম যেন কঁক কঁক করে আওয়াজ করতে থাকে। দাম বললে, করো–করো কঁক কঁক–! এর পরে যখন কলাটা মুলোটা খাইয়ে দিদিমণিকে তোমার পিঠে চাপিয়ে দেব, তখন ভাববে–হাঁ, হাতি-জন্মটা অ্যাদ্দিনে সাথক হল আমার।
কিন্তু একটু পরেই কেমন খটকা লেগে গেল দামুর। অ্যাঁ–ই কী রকমটা হল? হাতিটার মাথায় যেন ছাঁটা-ছাঁটা কদম চুল রয়েছে। হাতির বাচ্চার মাথায় চুল থাকে নাকি? কই–এমন তো কখনও শোনা যায়নি। তা ছাড়া গায়ে যেন তেল মাখা রয়েছে মনে হচ্ছে! আর হাতির গুঁড়-দামু মুখে হাত বুলিয়ে দেখল শুড় তো নেই, দিব্যি একটা থ্যাবড়া মতন নাক রয়েছে সেখানে।
.
অ্যাঁ–এ যে মনিষ্যি বলে মনে হচ্ছে গো!
দামু হাঁউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠবে কি না ঠাহর করবার আগেই টর্চ লাইটের খানিক আলো এসে পড়ল তার গায়ে। তারপরই মোটা গলার আওয়াজ : বলি হচ্ছে কী? হচ্ছেটা কী এই অন্ধকারের ভেতর?
কোত্থেকে আবার লণ্ঠন হাতে জন দুই লোক দৌড়েও এল। দামু দেখল, টর্চ আর লাঠি হাতে গাঁয়ের চৌকিদার, তার পিছনে পিছনে দুজন গাঁয়ের মানুষ।
আর সে যার ওপর গাঁট হয়ে বসে রয়েছে সে এক কালো মুশকো জোয়ান। তার পরনে। লেংটি মন কী রয়েছে, এক হাতে একটা সিঁদকাঠি। জোয়ানটা বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে–গলা দিয়ে গোঁ গোঁ করে আওয়াজ বেরুচ্ছে তার।
চৌকিদার আর লোক দুটো খানিকক্ষণ হাঁ করে চেয়ে রইল এই অপরূপ দৃশ্যের দিকে। তারপর তাদের একজনের মুখ থেকে অদ্ভুত আওয়াজ বেরুল : এ যে পটাই চোর গো!
কিন্তু পটাইয়ের পিঠের ওপর বসে কে? ঐ যে আদত বেহ্মদত্যি!
তা বেহ্মদত্যি ছাড়া কী আর? চেহারাখানা একবার দেখছ না? তার ওপরে আবার মাথায় আড়াই হাত এক পাগড়ি।
দামু এতক্ষণে একটু একটু করে ধাতস্থ হচ্ছিল। দুত্তোর, জঙ্গল না ঘোড়ার ডিম, কোত্থেকে কাঁদের এক আমবাগানে ঢুকে বসে আছি! আর হাতির বাচ্চাই বা কোথায় কোন এক লেংটিপরা পটাই চোরকেই ঘপাৎ করে ধরে ফেলিচি! রামো-রামো।
লোকগুলো দূরে দাঁড়িয়ে কথা কইছিল, এতক্ষণে ভরসা পেয়ে চৌকিদার একটু একটু করে এগিয়ে গেল। বেশ মিহি গলায় দামুকে ডাকল : ওহে বেহ্মদত্যি।
