জঙ্গলে! অ্যাঁ, সেকি গো?–মেয়েরা অবাক হয়ে গেল। অবশ্য দামুকে দেখলে আচমকা জঙ্গলের জীব বলেই সন্দেহ হয়, কিন্তু সত্যি সত্যিই সে যে জঙ্গলে যেতে চাইবে এটা তারা ঠিক বিশ্বাস করতে পারলে না।
হাঁ দিদি, একটা জঙ্গলই আমার দরকার। বড় জঙ্গল।
বড় জঙ্গল! কী করবে সেখানে গিয়ে?–একজন দামুর মস্ত লাঠিখানার দিকে চেয়ে দেখল : বাঘ–ভালুক মারবে নাকি? ওই লাঠি দিয়ে?
না–না, বাঘ-ভালুক মারব না। দামু ভীষণ চমকে গেল : বাঘ-ভালুক আমি আদৌ পছন্দ করি না।–বলতে বলতে দামুর মনে পড়ে গেল, তাদের গাঁয়ের কে যেন জঙ্গলে যেত কাঠের ব্যবসা করতে। সে বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলে বসল : আমি কাঠের ব্যবসা করি।
তাই বুঝি?
সেই জন্যেই তো জঙ্গল খুঁজে বেড়াচ্ছি দিদি। বলতে পারো, কোন্ দিকে গেলে জঙ্গল পাব?
তা জঙ্গলের অভাব কী? দেশটাই তো জঙ্গলে ভর্তি। এই তো পুবদিকে ক্রোশ দুই হাঁটলেই রাজার গড়ের মস্ত জঙ্গল রয়েছে। মাঝে মাঝে সেখান থেকে চিতে বাঘ-টাঘ বেরোয় শুনেছি।
না–না, চিতে বাঘ নয়।–দামু আবার ভীষণভাবে চমকে উঠল : আমার দরকার একটা হা বলতে বলতেই দামু জিভ কাটল। এই রে, হাতির কথাটা বলে ফেলেছিনু আর কি। জগাই ঘোষের তাড়া খেয়ে আর পথ-চলতি লোকগুলোর ঠাট্টা মস্করা শুনে, সে বুঝে গিয়েছিল–হাতির ব্যাপার যাকে-তাকে বলে ফেলাটা উচিত নয়। তাতে লাভ তো হয়ই না, বরং ঝঞ্জাট বেড়ে যায়। সাধে কি পিসি বলে, ভালো পিত্তিজ্ঞে পাঁচ কান করতে নেই?
সেই গিন্নি বান্নি মেয়েটি অবাক হয়ে বললে, হা কিগো? হা কাকে বলে?
কাউকে বলো না দিদি, কাউকে না।–দামু খুব বুদ্ধিমানের মতো সামলে নিলে : এই মুখ দিয়ে একটা হাই উঠেছিল কিনা, তোমার গে সেইটেকেই–সে যাক গে, আমি রাজার গড়ের জঙ্গলের দিকেই চললুম।
বলতে বলতে, হাতের সেই রামলাঠিতে ভর দিয়ে দামু লাফিয়ে নেমে পড়ল মাঠের ভেতর। তারপর আরও গোটা কয়েক লাফ দিয়ে একেবারে উধাও!
মেয়েরা অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে রইল সেদিকে। তারপর একজন বললে, লোকটা যেন কেমনধারা। পাগল-টাগল নাকি?
আর একজন বললে, মানুষ নয় বোধহয়। বেহ্মদত্যি-টত্যি হতে পারে। চেহারাখানা দেখলে না? তার ওপর আবার লাফাতে লাফাতে চলল জঙ্গলের দিকে। হুঁ, বেহ্মদত্যিই নিঘাত।
অ্যাঁ। রাম—রাম–রাম–
আর দামু তো চলল জঙ্গলের দিকে। মাঠ-ঘাট খানা-খন্দ গাঁ-গঞ্জ পেরিয়ে চলেছে তো চলেছেই। হাতি ধরবে–হাতি ধরবে। যে-জঙ্গলে চিতাবাঘ থাকে সেখানে হাতি থাকবে না, তাও কি হয়?
কিন্তু বাঘ!
দামু একবার থেমে দাঁড়াল। এই বাঘের ব্যাপারটাই তার পছন্দ হচ্ছে না। যদি হাতি ধরতে গিয়ে বাঘে খায়? সব্বোনাশ!
ঝঞ্জাটটা দ্যাখো দিকিনি একবার। একটা ভালো কাজও কি নিশ্চিন্দি হয়ে করবার জো আছে? জঙ্গল থাকবে, সেখানে পালে-পালে হাতি চরে বেড়াবে আর দামু তাদের একটা শুড় ধরে সুড়সুড় করে টেনে নিয়ে আসবে। এর ভেতরে আবার খামকা বাঘ এসে হাজির হয় কেন? বাঘ সোঁদরবনে যাক না–সেখানে হালুম-হালুম করে যাকে ইচ্ছে ধরে খাক।
মরুক গে, আর ভাবব না। পিঠের পুঁটলি থেকে আরও কিছু মুড়ি কদমা খেয়ে, একটা পুরনো দিঘি থেকে খানিকটা জল খেয়ে নিয়ে-দামুর মনে হঠাৎ একটা তেজ এসে গেল। ইস, বাঘে খেলেই হল আর কি। হাতে লাঠি আছে না? দাদাঠাকুরের নাতনির জন্যে হাতি খুঁজতে চলেছি, কত বড় পুণ্যির কাজ-বাঘের সাধ্যি কী, আমার কাছে এগোয়? হাতের এই পেল্লায় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে একেবারে পরোটা বানিয়ে ছাড়ব।
যেই মনে হল কথাটা, অমনি দামু একটা হুঙ্কার ছাড়ল। কাছেই দুটো দাড়িওয়ালা ছাগল চরছিল, তারা আচমকা ভয় পেয়ে ব্যাব্যা করে বাড়ির দিকে ছুটল।
দামু চলল। মাথার ওপর দিয়ে দুপুর গড়িয়ে গেল, বিকেল হল। তবু রাজার গড়ের জঙ্গলের তো দেখা নেই। মিথ্যে কথা বললে নাকি মেয়েরা?
একজন চাষী আসছিল নিড়েন হাতে। দামু তাকেই ডাকল।
ও দাদা।
কী গো?
রাজার গড়ের জঙ্গল কোনদিকে?
রাজার গড়? সে তো ওদিকে।–দামু যে-দিক থেকে এসেছে সেই দিকটাই দেখিয়ে দিল লোকটা।
ওই রাস্তা দিয়েই তো এলমদেখতে পেলাম না তো?
কটা উঁচু উঁচু ঢিবি দ্যাখোনি? একটা পুরনো দিঘি?
দেখব না কেন? সেই দিঘিতে নেমে তো জল খেলুম।
সেইটেই তো রাজার গড়।
কিন্তু জঙ্গল তো দেখতে পেলুম না।
আরে জঙ্গল তো ছিল বিশ বছর আগে। কবে কেটে সাফ করে দিয়েছে লোকে। পাঁচ-সাত বছর আগেও দু-চারটে গাছটাছ ছিল, এখন তাও নেই।
অ্যাঁ।–দামু বসে পড়ল ধুলোর ওপর।
কী হল তোমার?
কিছু হয়নি দাদা, তুমি যাও।
এবার দামুর কান্না পেতে লাগল। বরাত একেই বলে। জমিদারের হাতি মরে গেছে সাত বচ্ছর আগে, বিশ বছর হল রাজার গড়ের জঙ্গল সাফ। তা হলে? তা হলে হাতি কোথায় পাওয়া যাবে? কেমন করে সে ফিরে যাবে দা-ঠাকুরের কাছে, রুনকু দিদির কাছে? আর কি কোনও দিন কারও কাছে মুখ দেখাতে পারবে সে?
চোখ দিয়ে দামুর জল পড়তে লাগল।
অনেকক্ষণ একভাবে সে বসে রইল। সূর্য ডুবে গেল মাঠের ওপারে, চারদিকে কালো রাত নেমে এল। তখন দামুর মনে হল মাঠের ভেতরে এরকম একা একা বসে থাকার কোনও মানে হয় না। কাছাকাছি কোনও গাঁয়ে গিয়ে রাতের আস্তানাটা যোগাড় করা যাক, তারপরে কাল সকালে যা হয় একটা ব্যবস্থা করা যাবে।
দামু গ্রাম খুঁজতে বেরুল। কিন্তু অন্ধকারে মাঠের ভেতরে পথ হারাতে তার সময় লাগল না। না পায় খুঁজে গ্রাম, না চোখে পড়ে একটা আলো। ঘুরতে ঘুরতে হাঁটু টনটন করতে লাগল, কাঁটায় পা ছড়ে গেল, কিন্তু গ্রাম আর মেলে না! কোথা থেকে যে কোথায় যাচ্ছে, কিছুই টের পাচ্ছে না সে।
