চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী–দামু ভাবল। যা মনে হচ্ছে, হাতি বোধহয় কেনা যাবে না। তার চেয়ে জমিদারের কাছে গিয়েই ধরে পড়া যাক। বড়লোক, শরীফ মেজাজকে জানে দিয়েও দিতে পারে।
চৌধুরীপাড়া? সে কত দূর?
তা কোশ পাঁচেক হবে এখান থেকে। এই তো সোজা রাস্তা-জোর পায়ে যদি হেঁটে যাও, তা হলে সন্ধের পর পৌঁছে যাবে সেখানে। তার চেয়ে আমি বলি কী, সে তো অচেনা জায়গা–রাত-বিরেতে গিয়ে কিছু ঠাহর করতে পারবে না–আমার এখানেই রাতটা থেকে যাও।
কিন্তুক দেরি হয়ে যাবে যে।
কিচ্ছু দেরি হবে না। আর জমিদার–তাদের হল গে নবাবী মেজাজ, রাত্তিরে কি আর তারা তোমার আমার মতো গরিব মানুষের সঙ্গে দেখা করবে, না কথা কইবে? থেকে যাও এখানেই। আমাদের রান্না তো আর খাবে না, আমি নতুন হাঁড়ি দেব, চাল-ডাল-আনাজ দেব, দুটি ফুটিয়ে নিয়ো।
দামু ভেবে-চিন্তে বললে, তবে তাই হোক দাদা, আজ আমি তোমারই অতিথ হলাম।
.
রাতটা খুব সুখে কেটে গেল দামুর। শুধু ডাল-চাল-আনাজ নয়, কোত্থেকে চারটি মাছও এনে দিলে কলিম শেখ। রান্না-টান্ন দামুর আসে না–কলিম শেখের বুড়ো মা দূরে বসে সব দেখিয়ে-টেখিয়ে দিলে। মোটের ওপর খাওয়াটা তার ভালোই হল।
সকালে উঠেই দামু তৈরি। আর তর সইছে না।
কলিম বললে, আল্লা ঠিক তোমায় একটা হাতি জুটিয়ে দেবেন। কিন্তু যাওয়ার সময় এখান দিয়ে একটু দেখিয়ে নিয়ে যেয়ো ভাই। আমার অনেক কলাগাছ আছে, তোমার হতিকে পেট পুরে খাইয়ে দেব।
নিচ্চয়–নিচ্চয়। সকলের আগে তো তোমার দোরগোড়াতেই হাতি নিয়ে আসব। অনেক উবগার করেছ দাদা–কোনওদিন তোমায় ভুলতে পারব না।
দামু বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।
একটু এগিয়েছে, হঠাৎ দূর থেকে ভেসে এল একদল ছেলের চিৎকার : খেপেছে রে, হাতি খেপেছে–
আবার জগাই ঘোষ!
দামু আর দাঁড়ায়? কোনওদিকে না তাকিয়েই সোজা দৌড়।
দৌড়ল মাইল তিনেক। না–গাঁ-টা পেছনে পড়ে গেছে অনেকক্ষণ, জগাইয়ের চিহ্নও নেই কোথাও। দামু জিরোবার জন্যে একটা গাছতলায় বসে পড়ল।
একদল লোক আসছিল উল্টো দিক থেকে। দামু তাদের জিজ্ঞেস করলে, চৌধুরীপাড়া এদিকেই তো?
তাদের একজন বললে, , আর কোশ তিনেক হবে। আমরাও চৌধুরীপাড়া থেকেই আসছি।
বটে-বটে।–দামু উঠে দাঁড়াল : তবে তো ভালোই হল। বলতি পারো, ওখানে গেলে জমিদারবাবুর সঙ্গে হবে কি না?
জমিদারবাবু? তিনি তো এখন গাঁয়ে নেই, ছমাস হল কলকাতায় গেছেন। সেখানেই তিনি থাকেন, কালে-ভদ্রে গাঁয়ে আসেন। কেন, তাঁকে তোমার কী দরকার?
তাঁকে দরকার নেই, দরকার তাঁর হাতিটা।
হাতি?–লোকগুলো আশ্চর্য হল। তারপর একজন বললে, বুঝেছি, মাহুতের চাকরি চাও। কিন্তু সে-হাতি তো মরে গেছে সাত বচ্ছর হল। আর এখন তো জমিদারিই নেই হাতি পুষবে কে?
–অ্যাঁ!–ধপাস করে দামু বসে পড়ল গাছতলায়। কী হল, শুনে যে তোমার মাথায় বাজ পড়েছে মনে হচ্ছে।
কিন্তু একটা হাতি যে আমার চাই-ই দাদা।
নেতান্তই চাই!–আর একজন ঠাট্টা করে বললে, তাহলে জঙ্গলে চলে যাও–একটা হাতি ধরেই আনো গে।
শুনে, সব লোকগুলো খ্যাঃ খ্যাঃ করে একচোট হাসল, তারপর এগিয়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল দামু। বসে রইল মুখোনাকে একটা কেলে হাঁড়ির মতো বিকট আর গম্ভীর করে।
ঠিক বলেচে। হাতিই ধরব জঙ্গল থেকে। সেদিনও পালানো ছাগল ধরে এনিচি, দড়ি ছেঁড়া বাছুর ধরিচি–আর একটা হাতি ধরতি পারব না? নিশ্চয় ধরব। কেবল জঙ্গল চাই একটা। দামু উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে পড়ল জঙ্গল খুঁজতে।
.
ছয়
জঙ্গল একটা খুঁজতে হবে। কিন্তু কোথায় সেরকম জঙ্গল, যাতে হাতি পাওয়া যায়?
চলতে চলতে দামু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার খিদে পেয়েছে। হাতির ভাবনা ভাবতে ভাবতে হাতির মতোই খিদে পেয়ে যায় কেবল। কী মুস্কিল!
একটা কুয়ো দেখা যাচ্ছিল একটু দূরে, গাঁয়ের মেয়েরা তাতে জল তুলছিল। দামু সেই কুয়োর কাছে গিয়ে মস্ত একটা পাকুড় গাছের তলায় বসে পড়ল। খাওয়ার ভাবনা ছিল না, আসবার সময় কলিম শেখের বুড়ি মা পুঁটলি বেঁধে সের দুই মুড়ি-মুড়কিকদমা বাতাসা বেঁধে দিয়েছিল তার সঙ্গে। তারই খানিকটা খেতে-খেতে দামু ভাবতে লাগল-একটা বেশ বড়গোছর জঙ্গল দরকার।
অবশ্য তার নিজের গাঁয়ে, আশেপাশে, ঝোঁপঝাড়, বনবাদাড় বিস্তর আছে। টোপা কুল, বৈঁচি, তফল, পানিয়াল কিংবা ট্যাঁপারির খোঁজে সে সব ঝোপেঝাড়ে আদাড়ে-পাদাড়ে সে হানা দিয়েছে অনেকবার। শেয়াল-খরগোশ-খটাশ এ সব অনেক দেখেছে, ভাম বেড়ালও চোখে পড়েছে দু চারটে, কিন্তু হাতি কখনও দেখেনি। হাতির জন্যে অনেক বড় জঙ্গল দরকার বোধহয়। অমন পেল্লায় জানোয়ার-ছোটখাটো জঙ্গলে কি তার পোয়?
কিন্তু সেই বড় জঙ্গলটার খবর পাওয়া যাবে কী করে?
থাবা থাবা মুড়ি-মুড়কি খেয়ে, গোটা ছয়েক কদমা চিবিয়ে, দামুর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। যে-মেয়েরা জল তুলছিল, তাদের দিকে এগিয়ে গেল সে।
এটটু জল দাও দিনি বাছারা। গলায় কদমা আটকে তো মলাম।
প্রায় এক বালতি জল খেয়ে দামুর প্রাণটা একটু ঠাণ্ডা হল।
বাঁচালে বাছারা। ভগবান ভালো করবেন তোমাদের।
ভার-ভাত্তিক গিন্নি-বান্নি চেহারার একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল : বিদেশী লোক বুঝি?
হাঁ দিদি, বিদেশী লোক।
যাবে কোথায়?
যাব?–একটু ভেবে-চিন্তে দামু বললে, যাব একটা হা–মরুক গে, যাব জঙ্গলে।
