আজ খুনই করে ফেলব তোকে–বলে জগাই সেই বিরাট শরীর নিয়ে–হা-রে-রে-রে বলে তাড়া করল দামুকে!
বাবা রে গিচি–গিচি–বলে দামু ছুটল। ছুটল বিশ মাইল স্পিডে। পেছনে খ্যাপা হাতির মতো তেড়ে চলল জগাই ঘোষ।
.
পাঁচ
ছুট তো ছুট–একেবারে বাপ-রে মা-রে করে।
হাতে অবিশ্যি পেল্লায় লাঠিখানা দামুর ছিলই, কিন্তু জগাইয়ের সেই হাতির মতো জগঝম্প চেহারা, সেই পাকা করমচার মতো টুকটুকে লাল চোখ, সেই পিলে কাঁপানো চিৎকার আর অ্যাই মোটা ঠ্যাঙাটা দেখেই দামু বুঝতে পেরেছিল যে জগাই একবার তাকে ধরতে পারলে আর আস্ত রাখবে না। প্রাণপণে ছুটতে ছুটতে দামু ভাবতে লাগল : এই দ্যাখো একবার। কাণ্ডখানা! হাতির খবর জানতে চাইলে তেড়ে মারতে আসে। এ কী রকম গাঁ–আর এখানকার মনিষ্যিগুলিই বা কী ধরনের! বাবা গো–এ যে দেখছি মেরেই ফেলবে একেবারে।
কিন্তু জগাই দামুকে ধরতে পারল না। একে তো তালগাছের মতো লম্বা লম্বা ঠ্যাং, তার ওপরে প্রাণের দায়। দামু ছুটতে লাগল দিল্লি মেলের মতো। আরও একটা কাণ্ড ঘটল তার সঙ্গে। হঠাৎ দূর থেকে পাঁচ-সাতটা ছেলে: চেঁচিয়ে উঠল। এই রে হাতি খেপেছে।
ঘাঁক করে থেমে গেল জগাই ঘোষ, যেন ব্রেক কষল। ঘাড় ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল : কে বললে রে?
দূর থেকে সাড়া এল :হাতি খেপেছে রে, হাতি খেপেছে।
তোদের সব কটাকে চটকে আমি ছানা বানাব বলেই জগাই ঘোষ এবার ছুটল ছেলেদের দিকে। অর্থাৎ দিল্লি মেলের পেছনে ছুটলাগানো বোম্বাই মেল লাইন বদল করল। আর দামু গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ল একটি ভালোমানুষের ঘাড়ে, সে বেগুন-মুলো-কাঁচকলা–এই সবের পসার নিয়ে বসেছিল তার ঘরের সামনে। বোধহয় হাটে বেরুতে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণ মুলো-বেগুন কাঁচকলার ভেতরে গড়াগড়ি খেল দুজনে। তারপর সামলেসুমলে উঠে বসল দামু। হাতজোড় করে বললে, কিছু মনে কোরো না দাদা–যে রামতাড়া লাগিয়ে ছিল, দিশে হারিয়ে তোমার ঘাড়ে এসে পড়িচি।
চাষী গেরস্তটি নিপাট ভালোমানুষ। সে ধুলো ঝেড়ে উঠে তরকারি গোছাচ্ছিল। বললে, কিছু মনে করিনি ভাই, নিজের চোখেই তো দেখলুম। ওই ছোঁড়াগুলোই তোমায় বাঁচিয়ে দিলে। ওদের আর ধরতে পারবে না–টুক টুক করে আমগাছে জামগাছে উঠে পড়বে। তা বেত্তান্তটা কী? জগাই ঘোষকে অমন খেপিয়ে দিলে কী বলে?
খেপাইনি তো। হাতির কথা জিজ্ঞেস করেছিলুম।
আল্লা–আল্লা।–চাষীটির মুখ ভার হল :তোমারই বা আক্কেল কী, দাদা? একেবারে ছেলেমানুষ তো নও। তুমিও হাতি-হাতি বলে জগাইকে খেপাতে গেলে?
আরে দুত্তোর! আমি ভি-গেরাম থেকে এইচি, কী করে জানব যে হাতির নাম শুনলিই। লোকটার অমন মাথামুণ্ডু বিগড়ে যায়? কেবল বলিচি, দাদা-একটা হাতি কোথায় পাব–অমনি ব্যস!
তুমি জানতে না?
মা কালীর দিব্যি, কিচ্ছু জানতুম না।
অ।–চাষীটি বললে, ওই তো মুস্কিল। যাক গে, বেঁচে গেলে এ-যাত্রায়। কিন্তু কারবারখানা কী বলল দিকিনি? সত্যিই তোমার একটা হাতি দরকার নাকি?
সত্যিই দরকার।
কিন্তু তুমি হাতি নিয়ে কী করবে?–লোকটি ভালো করে দামুর দিকে চেয়ে দেখল : তুমি তো দেখছি আমার মতন গরিব মানুষ। হাতি পুষবে কী করে?
অনেক খরচ বুঝি?
বেজায়। শুনিচি, হাতি পুষতে রাজা বাদশাও দেউলে হয়ে যায়।
তবে পুষব না। কাজ মিটে গেলে বনেবাদাড়ে ছেড়ে দেব। চরে খাবে।
সে আবার কী?–একটা বেগুন হাতে নিয়ে চাষীটি বোকার মতো চেয়ে রইল :তোমার কথার মাথামুণ্ডু তো বুঝতে পারছি না।
সব বুঝিয়ে বলছি। আগে এক ঘটি জল খাওয়াও দাদা–ওই জগাইয়ের তাড়ায় আমার বুকের ভেতরটা হাঁক্কোল-পাঁক্কোল করছে।
লোকটি ভেতরে উঠে গেল। শুধু এক ঘটি জলই নয়, একটা ছোট ধামায় করে খানিক মুড়ি-মুড়কিও নিয়ে এল। আর তখন সব দুঃখ ভুলে গিয়ে, মুড়ি-মুড়কিতেই মন দিলে দামু। জগাই ঘোষের চিৎকার শুনেই নিবারণ ময়রার জিলিপিগুলো হাওয়া হয়ে গিয়েছিল পেটের ভেতর।
দেখতে দেখতে ধামা সাফ। তারপর এক ঘটি জল। এতক্ষণ পরে দামুর পেট, শরীর, মাথা সব একসঙ্গে জুড়িয়ে গেল। নাঃ, যা ভেবেছিল তা নয়। এ-গাঁয়ে ভালো লোকও আছে! একটা ঢেকুর তুলে, মুখ-টুখ মুছে বললে, তা হলে বেত্তান্তটা হল গিয়ে তোমার–
ব্যথার ব্যথী পেয়ে দামু খুলে বললে ব্যাপারটা। পঞ্চাননের কথা, রুনকুর কথা–সব।
চাষীর নাম কলিম শেখ। শুনে সে মাথা চুলকোতে লাগল।
তবে তো মুস্কিল।
খুব মুস্কিল।
দশ-বারো টাকায় হাতি কিনতে চাইছ- কলিম শেখ মাথা নাড়তে লাগল :সে তো হবে না।
পঁচিশ-তিরিশ লেগে যাবে নাকি?–দামু ভয় পেয়ে গেল।
না হে, শুনচি দুত্তিন হাজার টাকা লাগে।
দুত্তিন হাজার! সে কত?
কে জানে। চোখে দেখেচি নাকি কোনওদিন? মানে, তোমার আমার মতো বিশ-পঞ্চাশ জনকে বেচলেও হবে না। উঁহু, হাতি তুমি কিনতে পারবে না।
তবে কী হবে?–দামুর কান্না এসে গেল গলায় : হাতি কী একটা আমি পাব না? তা হলে যে আমি আর ঠাকুরমশাইয়ের কাছে মুখ দেখাতে পারব না। আমাকে সন্নিসি হয়ে চলে যেতে হবে।
দাঁড়াও–দাঁড়াও, সন্নিসি হবে কেন? তুমি তোক ভালো, আল্লা আছেন–একটা ব্যবস্থা করে দেবেনই। কলিম শেখ একটু ভেবে নিল : শুনিচি, চৌধুরীপাড়ার জমিদারবাবুর একটা হাতি আছে। যাও না–তাঁকে বলে কয়ে কদিনের জন্যে চেয়ে নাও না হাতিটা।
দেবে?
কেন দেবে না? তুমি একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বললেই দিতে পারে।
