এরই মধ্যে তাকে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে–আর এমনিতে যদি কারুর কাছে গতি না পাওয়া যায়, তা হলে একটা কিনেই নিতে হবে তাকে। একটা হাতির দাম কত হবে? মনে-মনে আঁচ করতে লাগল দামু। অত বড় জানোয়ার, অমন পেরকাণ্ড শুড়, গাছের গুঁড়ির মতো মোটা-মোটা পা-দাম একটু বেশিই হবে নিশ্চয়। হয়তো আট-দশটা টাকাই লেগে যাবে হাতি কিনতে। হুঁ, বুঝেই খরচ করতে হবে একটু। জিলিপি খেতে যতই ভালো লাগুক, লোভ সামলেই চলতে হবে আপাতত।
দামু মনে-মনে হিসেব করছিল আর জিলিপি খাচ্ছিল, এদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখছিল নিবারণ ময়রা। দেখবার মতো চেহারাই বটে। এমনটি সচরাচর নজরে পড়ে না।
শেষে আর থাকতে না পেরে নিবারণ বললে, পাগড়িখানা তো জব্বর চাপিয়েছ হে?
দামু খুশি হয়ে বললে, হুঁ-হুঁ, কুটুমবাড়ি গিয়েছিলুম কি না।
তা বেশ করেছিলে। কুটুমবাড়ি যাওয়ার মতো সাজই বটে। এখন বুঝি বাড়ি ফিরছ?
বাড়ি? এখন? উঁহু!–দামু সগর্বে মাথা নাড়ল : একটা হাতি যোগাড় করতে বেরিয়েছি।
হাতি?–নিবারণ একটু চমকাল। তারপর বললে, ওঃ, বুঝিছি, খেলনার হাতি? তা উদিকে কুমোর পাড়ায় যাও–সেখানে তারা ওসব বানায়-টানায়।
খেলনার হাতি তোমায় কে বললে?–দামু নাক কোঁচকাল : সত্যিকারের হাতি। ঘরের চালের সমান উঁচু। শুড় নাড়ে, চলে বেড়ায়।
নিবারণ টাক চুলকোল। আবার কিছুক্ষণ চেয়ে রইল দামুর দিকে।
তা হাতি দিয়ে কী করবে?
অত খোঁজে তোমার দরকারটা কী? হাতি একটা আমার অবিশ্যিই চাই, সেইজন্যিই বেরিয়েচি। কোথায় পাব বলতে পারো?
গরিবের ঘোড়া-রোগ হয় বলে জানতুম, কারুর কারুর যে হাতি-রোগও হয় এটা এই পেপ্রথম শোনা গেল।–নিবারণ আবার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে লাগল দামুর। এত মন দিয়ে দেখতে লাগল যে জিলিপি ভাজার কথা স্রেফ ভুলেই গেল সে।
কী বললে হে তুমি?
কী আর বলব তোমায়।–নিবারণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : মাথায় ছিট থাকলে তাকে কী আর বলা যাবে। তা যাও খোঁজ গে হাতি।
ছিট-টিট বোলো না ময়রার পো–দামুর রাগ হতে লাগল : তুমি কি হেঁজি-পেঁজি পেলে আমায়? জানো, দরকার হলে হাতি আমি কিনতে পারি?
কিনতি পায়রা? লাটসায়েবের নাতি নাকি তুমি? কত টাকা নিয়ে বেরিয়েচ।
হুঁ হুঁ, অনেক। তোমাকে জিলিপির দাম দিয়েও আমার তেরো টাকাইয়ে তেরো টাকা, খুচরো পয়সার হিসেব করতে গিয়ে দামুর একটু গুলিয়ে গেল : মরুক গে, তেরো টাকা কয়েক গণ্ডা পয়সা থেকে যাবে আমার কাছে। কত হবে বলে একটা হাতির দাম? বেশি হলেও ওই ধরো দশটা টাকাই লাগুক–অ্যাঁ?
আরও একবার চমকাল নিবারণ ময়রা। এবার এত বেশি করে চমকাল যে জিলিপি ভাজার কড়াইটা উল্টে যেতে যেতে একটুর জন্যে সামলে গেল।
তারপর নিবারণ সোজা দুহাতে নিজের টাক থাবড়ে বলতে লাগল : হায়—হায়—হায়–হায় রে।
বলি, অমন করে মাথা চাপড়াচ্ছ কেন? আমি হাতি কিনব শুনে তোমার যে সব্বোনাশ হয়ে গেল মনে হচ্ছে।
সে কথায় কানই দিলে না নিবারণ। টাক থাবড়ে বলে যেতে লাগল : ওগো, এমন পাগলাকেও কেউ রাস্তায় ছেড়ে দেয়? দশ টাকায় হাতি কিনতে চায়, একে যে পাগলা গারদে আটকে রাখা উচিত ছিল গো! হায়—হায়—হায়–
বর্ষার জল-ভরা ধানখেতে ঢোঁড়া সাপের তাড়া খেয়ে ধেনো চিংড়িগুলো যেমন ছটাং ছটাং করে লাফিয়ে ওঠে, তেমনি করে একটা লাফ মারল দামু।
বটে, মস্করা হচ্ছে আমার সঙ্গে? আমায় বলছ পাগল?–দামু চেঁচিয়ে উঠল : ভাগ্যিস তোমার জিলিপি খেয়েছি, নইলে হাতের এই লাঠি দিয়ে তোমায় পিটিয়ে আমি চৌকো করে দিতুম! ইঃ, উনি আবার জিলিপি ভাজেন। তোমার জিলিপি পচা, তোমার জিলিপি ছাই, তোমার জিলিপি ছাগলেও খায় না। এই আমি চললুম। হাতি নিয়ে তোমার সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে যদি চলে না যাই, তবে আমার নাম দামু মণ্ডলই নয়।
কড়ায় জিলিপি পুড়ে গেল, নিবারণ হাঁ করে চেয়ে রইল দামুর দিকে। পয়সা আগেই দেওয়া হয়ে গিয়েছিল, মাথায় সেই জগঝম্প পাগড়ি আর মস্ত লাঠি নিয়ে হন্ হন্ করে এগিয়ে গেল দামু।
ফুঃ, ময়রাজিলিপি ভাজতেই জানে কেবল, হাতির ও কী জানে। চলতে-চলতে ভাবতে লাগল দামু : এ-সব বোকা-সোকা লোকের সঙ্গে কথা কয়ে লাভ নেই, বুঝদার কাউকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে। গাঁ সুদ্ধ সবাই নিশ্চয় ময়রাটার মতো হাবাগোবা নয়।
বুঝদার তোক পাওয়া গেল একটু পরেই। দাওয়ায় বসে তামাক খাচ্ছিল সে।
তার নাম জগাই ঘোষ। পেল্লায় মোটা চেহারা, প্রকাণ্ড ভূঁড়ি, লম্বা-লম্বা কান। গাঁয়ের ছেলে-পুলে দূর থেকে তাকে দেখে হাতি-হাতি বলে চাঁচায়, আর তা শুনলেই জগাই ঘোষ–
তা শুনলেই জগাই ঘোষ কী করে, সেটা দামুই টের পেল একটু পরে।
জগাইয়ের জাঁদরেল চেহারা দেখেই দামু দাঁড়িয়ে গেল। বেশ বিনয় করে বললে, ও মশাই!
লাল টুকটুকে দুটো খুদে চোখ দিয়ে দামুকে একবার দেখল জগাই। তারপর বললে, কী, দই চাই? দই আজ ফুরিয়ে গেছে, আর হবে না। কাল সকালে এসো।
এজ্ঞে দই চাইনে। একটা হাতি—
ঠক করে হুঁকোটা নামিয়ে জগাই ঘোষ ঘোঁৎ করে উঠল : কী বললে?
এজ্ঞে হাতি। একটা হাতি যদি—
ব্যস, ওই পর্যন্তই, আর বলতে হল না। তখুনি দাঁড়িয়ে পড়ল জগাই ঘোষ।
পাজি–নচ্ছার—বেল্লিক—ছুঁচো– বলে আকাশ ফাটিয়ে ডাক ছাড়ল একটা। তারপরেই কুড়িয়ে নিল একখানা রাম-লাঠি–দামুর লাঠির চাইতেও হাতখানেক সেটা লম্বা।
