পঞ্চানন বললেন, আবার কী হল, গাড়ি থামাতে হবে কেন?
একটু কাজ আছে দাদাঠাকুর।–কই গাড়ি থামালে না?
মোটর থামল। আর থামতে না থামতেই লাঠি আর পাগড়ি নিয়ে গাড়ি থেকে প্রায় লাফিয়ে পড়ল দামু।
পেন্নাম দাদাঠাকুর, আমি চললুম।
পঞ্চানন আশ্চর্য হয়ে গেলেন। গ্রাম তো এখনও দু মাইল দূরে। এখানে নেমে তুই কোথায় যাচ্ছিস?
গ্রামে যাব না দাদাঠাকুর। তোমার যে-ক্ষেতি করেছি, তার প্রতিবিধেন না করে গাঁয়ে আর মুখ দেখাব না। রুনকু দিদির জন্যে হাতি খুঁজতে যাচ্ছি।
রাগে আর বিরক্তিতে পঞ্চাননের আর মেজাজ ঠিক রইল না।
হতভাগা–উল্লুক! হাতি কি পাকা আমড়া যে গাছতলায় গেলেই কুড়িয়ে পাওয়া যায়? শিগগির ওঠ বলছি গাড়িতে, এখন আমার মস্করা করবার সময় নয়।
মস্করা নয় দাদাঠাকুর, সত্যি বলচি। প্রিতিজ্ঞে করচি, হাতিতে চাপিয়ে দিদিকে আপনার কাছে নিয়ে আসব, নয় আর কোনওদিন গাঁয়েই ফিরব না। এই আমি চললুম।
তারপরেই আর দেখতে হল না। সেই এক-একখানি হাত-চারেক লম্বা ঠ্যাং ঝড়ের বেগে ফেলে ফেলে লাঠি আর পাগড়িসন্ধু তালগাছের মতো দামু পাশের মাঠে নেমে পড়ল, আর পঞ্চানন ভালো করে কিছু বোঝবার আগেই বাবলা বনের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
প্রায় পনেরো মিনিট ধরে গলা ফাটিয়ে ডাকাডাকি করলেন পঞ্চানন। কিন্তু দামুর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। সে ততক্ষণে মাইল দেড়েক পথ পাড়ি দিয়েছে।
ড্রাইভার বললে, আমি খুঁজতে যাব বাবু?
তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে পঞ্চানন বললেন, খুঁজে কী হবে? পেটে আগুন লাগালে আপনিই ফিরে আসবে এখন। হতচ্ছাড়া উজবুক কোথাকার! তুমি গাড়ি চালাও।
.
চার
রাগে, দুঃখে, বিরক্তিতে একাকার হয়ে পঞ্চানন তো বাড়ি ফিরে গেলেন। আর ওদিকে দামু চলল পঞ্চাননের হাতির খোঁজে। হাতিতে চাপিয়ে রুনকু দিদিকে যদি দাদুর বাড়ি নে যেতে না পারি, তা হলি গাঁয়ে আর মুখই দেখাব না মনে-মনে এই কঠিন প্রতিজ্ঞা করে। লম্বা লম্বা ঠ্যাঙে দামু মাঠের পর মাঠ পেরুতে লাগল।
ঘন্টা চারেক এই ভাবে মাঠ-ঘাট বনবাদাড় গ্রাম-গঞ্জ পাড়ি দিয়ে তারপর দামুর হাঁপ ধরল। বেশ বড় গোছর একটা গ্রামের কাছে এসে ছায়া-ছায়া একটা নিম গাছের তলায় বসে পড়ল সে।
ইস-কাণ্ডখানা দ্যাখো একবার!–দামু ভাবতে লাগল : কারবারটা একবার দ্যাখো। এই-যে এতটা রাস্তা পাড়ি দিয়ে এলুম–তা প্রায় ক্রোশ চারেক হবে–এর মধ্যে একটা হাতিও কি চোখে পড়ল? গোরু চরছে তো চরছেই, ছাগলে ঘাস খাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে, দুটো-চারটে ভেড়াও ভ্যা-ভ্যা করছে এদিক-ওদিক, এক-আধটা ঘোড়াও তো ছোলা-মটরের বুড়ো শাকগুলো চিবিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু একটা হাতিরও কি চরতে নেই কোথাও? কেন হাতি কি ঘাস খায় না, ছোলা-মটরের শাক চিবোয় না?
ভাবতে ভাবতে দামু বিরক্ত হয়ে গেল। কেমনধারা লোক সব দেশের? এত গোর-ঘোড়া-ছাগল পুষছে–অথচ দু-দশটা হাতি পুষতে পারে না কেউ? কত সুবিধে! পিঠে চাপা যায়–সে তো আছেই। তা ছাড়া–এই ধরো না, হাতিকে লাঙ্গলে জুড়ে চাষ করলেওঃ, সে আর দেখতি হবে না। ওই পেল্লায় জানোয়ার–এক ঘন্টার ভেতরে দশ বিঘে জমি চষে একেবারে ধুলো করে দেবে। আর গোরু পোয্য কী জন্য? দুধ খাবার জন্যি তো? হাতি পুষে তাকে দুইয়ে নাও না কমসে কম একমন দুধ দেবে একবারে, গাঁ সুষ্ঠু লোককে দুবেলা বাটিবাটি পায়েস খাইয়ে দিতে পারবে।
সেসব টু-টু, পুষছে কতগুলো শিংওলা গোরু আর দাড়িওলা কটা পুঁচকে ছাগল। দেশসুদ্ধ লোকের বোকামি দেখে দামুর গা জ্বালা করতে লাগল।
অবিশ্যি, সব চেয়ে বেশি জ্বালা করছিল পেটের ভেতরে। রওনা হওয়ার আগে ত্রিলোচন চক্রবর্তীর বাড়িতে খান তিরিশেক লুচি আর সের খানেক মিঠাই খেয়েছিল সে, কিন্তু এই চার ক্রোশ রাস্তা পাড়ি দিয়ে সেসব কখন বেমালুম উধাও হয়ে গেছে। হাতির খোঁজ পরে হবে,
সে তো আছেই, তার আগেই পেটটা একটু ঠাণ্ডা করে নেওয়া যাক।
একটু দূরেই, একটা টিনের ছাউনির তলায় বসে মাথায় টাক পড়া ভালোমানুষ চেহারার একজন লোক মস্ত লোহার কড়াইয়ে জিলিপি ভেজে-ভেজে রসে ফেলছিল। সেই জিলিপির গন্ধ দামুর প্রাণমন কেড়ে নিলে। আপাতত হাতির ভাবনা ছেড়ে দিয়ে সে ময়রার কাছে গিয়ে হাজির হল।..
জিলিপি দাও তো দাদু দু গোণ্ডা।
দু গোণ্ডা? আট খানা?–লোকটা বললে, আট আনা লাগবে কিন্তু। পঞ্চাশ পয়সা।
অ্যাঁ, পঞ্চাশ পয়সা! ইকি ডাকাতের গাঁ নাকি হে? আমাদের দেশে তো পঁচিশ পয়সাতেই দু গোণ্ডা জিলিপি পাওয়া যায়।
সেসব ভাঙা আর বাসী জিলিপি। নিবারণ ময়রার দোকানে ওসব পাবে না। তবে তুমি বিদেশী লোক, অতিথ এয়ে বলতে গেলে, তোমাকে চল্লিশ পয়সায় দিতে পারি।
দাও তবে, তাই দাও।
তা হলে বোসো ওখানে–নিবারণ ময়রা একটা নড়বড়ে বেঞ্চি দেখিয়ে দিলে।
বেঞ্চিতে বসে দামু গম্ভীর হয়ে জিলিপি খেতে লাগল। জিলিপিগুলো সত্যিই ভালো, লোকটা জাঁক করতে পারে বটে। আরও দু-চারখানা খেলেও হত। কিন্তু না, বেশি পয়সা খরচ করা চলবে না।
লোকে তাকে বোকারাম বলে বটে, কিন্তু এখন দামু চালাক হয়ে গেছে। রুকু দিদির জন্যে হাতি খুঁজতে বেরিয়েছে সে। এমনিতে সে-হাতি পাওয়া যাবে কি না কে জানে, হয়তো কিনতে হবে শেষ পর্যন্ত। হাতির দাম কত হবে কে বলতে পারে। দোকানদারেরা সুযোগ পেলেই তাকে ঠকায়, তাই মাসি অনেক কান্নাকাটি করে তাকে গুনতে শিখিয়েছে। দাম জানে, এখন তার ট্যাকে কম করেও তেরো টাকা বারো গণ্ডা পয়সা আছে। পঞ্চানন তাকে দুটো টাকা দিয়েছিলেন, পাঁচ টাকা দিয়েছেন ব্রিলোচন, আরও পাঁচ টাকা দিয়েছিলেন ত্রিলোচনের গিন্নি–মানে রুনকুর ঠাকুরমা। আসবার সময় মাসি আরও এক টাকা বারো গণ্ডা পয়সা দিয়েছিল, তা হলে দাঁড়াল তেরো টাকা বারো গণ্ডা। সোজা হিসেব।
