হাতি! ব্যাপারটা কেউ বুঝে উঠতে পারলেন না। ত্রিলোেচন হেসে বললে, ওহো, দিদির বোধহয় খেলনাটা নিতে ভুল হয়ে গেছে। ওরে কে আছিস, সেই তুলোর তৈরি গলায় ঘুঙুর বাঁধা লাল হাতিটা।
না–লাল তুলোর হাতি না।–রুনকু আবার চিৎকার করে জানাল : আমি জে বড় হয়ে গেছি, ও-হাতি নিয়ে তো আমি আর খেলি না। আমার আসল জ্যান্ত হাতি কোথায়? সেই হাতিতে চেপেই তো আমি দাদুর বাড়ি যাব।
সে কি! হাতি কোথায় পাওয়া যাবে?
বা রে, দামুদাদা যে বললে আমাকে হাতিতে করে দাদুর বাড়িতে নিয়ে যাবে! কই দামুদাদা, হাতি কই আমার?
দামু প্রমাদ গনল। ভাবগতিক দেখে তার নিরেট মগজটাও একটু করে সাফ হতে আরম্ভ করেছিল। দামু বুঝতে পারল, কাজটা খুব কাঁচা হয়ে গেছে। বড়লোকের আদুরে নাতনিকে হাতিমাকা গল্প বলা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি।
দন্তবিকাশ করে, খানিকটা হেঁ-হেঁ আওয়াজ তুলে, মাথা-টাথা চুলকে দামু বললে, ঐ হে-হে। রুনকু দিদি, ও আমি একটুখানি ঠাট্টা করেছিলাম। এবার না হয় মোটর গাড়ি চেপেই দাদুর বাড়ি চলল, তারপর দেখেশুনে একটা দাঁতওলা পেল্লায় হাতি–
আর বলতে হল না। রুনকু একেবারে সোজা বসে পড়ল ধুলোর ওপর। তারপর হাত-পা ছুঁড়ে শুরু হল দাপাদাপি–মোটর গাড়ি ছাই, মোটর গাড়ি বিচ্ছিরি আমাকে হাতি এনে দাও, এক্ষুনি এনে দাও
তার পরের ব্যাপার আর না বলাই ভালো। মা-মরা নাতনিকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন ত্রিলোচন, কিছুতেই তার জেদ ভাঙানো গেল না। ত্রিলোচন অনেক বোঝালেন, পঞ্চাননের বেয়ান এসে বিস্তর ভালো-ভালো কথা শোনালেন, সদু ঝি অনেক মিষ্টি কথায় তাকে ভোলাতে চাইল, কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। শেষকালে ধুলোতে শুয়ে পড়ল রুনকু।
হাতি কোথায় গেল–দাদুর হাতি? হাতি না হলে আমি যাব না।
তেতে-বিরক্ত হয়ে শেষে রুনকুর বাবা যখন মেয়েকে মারবার জন্যে একটা চড় তুলেছে, তখন পঞ্চানন এসে তাকে কোলে তুলে নিলেন। বললেন, থাক বেয়াই, এ-ভাবে জোর করে নিয়ে গিয়ে তো কোনও লাভ নেই। তার চাইতে এখন থাকুক-একটু ঠাণ্ডা হোক, তারপর না হয়–
বিলোচন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলেন। বললেন, সেইটেই ভালো কথা। আপনি আরও দুটো দিন থাকুন বেয়াই, আমি এর ভেতরে মেয়েকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব।
চোখে জল আসছিল, পঞ্চানন সামলে নিলেন। ম্লান হেসে বললেন, না বেয়াই, আমার আর থাকবার জো নেই–বাড়িতে রামের মা একা রয়েছে। যখন সুবিধে হয়, আপনি পাঠিয়ে দেবেন। আমি বরং আজ আসি, আপনারা ততক্ষণ রুকুকে শান্ত করুন।
শান্ত যে সে সহজে হবে, এমন মনে হচ্ছিল না। সদু ঝি তাকে দোতলায় নিয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেও সমানে শোনা যাচ্ছিল তার কান্না আর ফোঁপানিঃ হাতি কোথায়, হাতি? দামুদাদা যে বলেছিল আমাকে হাতি–
মাথার দেড়-হাত উঁচু পাগড়িটা খুলে ফেলে, কোলের ওপর সেই মস্ত লাঠিখানা রেখে দামু কেলে হাঁড়ির মতো মুখ করে একটা কাঁটালতলায় বসেছিল। কী ভাবছিল, সেই জানে। এইবার তার দিকে একটা বজ্ৰদৃষ্টি ফেললেন পঞ্চানন।
কি রে, যাবি আমার সঙ্গে? না–হাতি জোগাড় করবি এখানে বসে বসে?
শুকনো গায় দামু বললে, এজ্ঞে চলুন। পায়ে হেঁটে যেতে যতই সময় লাগুক, মোটরে আর কতটুকু রাস্তা? ধুলো উড়িয়ে, ভঁক ভঁক করে হর্ন বাজিয়ে, দুপাশের গোর তাড়িয়ে গাড়ি চলতে লাগল। পেছনের সিটে বসে পঞ্চাননের চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। দামু মাথা নিচু করে বসেছিল ড্রাইভারের পাশে, জীবনে প্রথম মোটর গাড়িতে চাপতে পেরেও তারও মনে যে এতটুকু সুখ ছিল না, পঞ্চানন তা বুঝতে পারছিলেন।
হতভাগা–গো-মুখ্য কোথাকার!
কিন্তু রাগ করে আর কী হবে, ইচ্ছে করে তো আর বিপদ বাধায়নি। স্রেফ বুদ্ধির দোষেই এই কেলেঙ্কারিটা বাধিয়ে বসেছে। পঞ্চানন ভাবতে লাগলেন, সবই তাঁর কপালের দোষ।
হলে নিজের মেয়েটা এত সুখী হয়েও এমন অসময়ে মরেই বা যাবে কেন, আর নাতনিটাই বা দামুর মতো গর্দভের কথায় বিশ্বাস করে এমন একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসবে কেন! তাঁর বরাতটাই খারাপ, নাতনিকে দু-দিনের জন্যে কাছে নিয়ে যাওয়াও তাঁর অদৃষ্টে লেখা নেই, তিনি আর কাকে দোষ দেবেন। রামের মার কথা ভেবে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল–সে বেচারি অনেক আশা করে রুনকুর জন্যে নারকোলের নাড়, রসবড়া, গঙ্গাজলী চিড়ের মোয়া-এই সব তৈরি করে বসে রয়েছে।
দামু চুপ করে বসেছিল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে, বিষম ব্যাজার গলায় বললে, দাদাঠাকুর, আমি একটা আস্ত পাঁঠা।
পঞ্চাননের তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু মুখে তিনি সেকথা বলতে পারলেন না, বরং দামুকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টাই করলেন একটু।–তুই আর কী করবি, একটু বেশি গল্প করেছিলি বই তো নয়। সেইটে যে ও বিশ্বাস করে বসে থাকবে, তা তুই কেমন করে জানবি?
না দাদাঠাকুর, আমি একটা গাড়ল।
মনে দুঃখ করিসনি দাম, ভুল-টুল মানুষের হয়ই।
আমাকে যে সবাই বলে অকর্মার ধাড়ি আর পয়লা নম্বরের ভণ্ডলরাম-সে একদম খাঁটি কথা।
পঞ্চাননের মন আদৌ ভালো ছিল না, তার ওপরে দামুর এইসব খেদোক্তি শুনে এখন তাঁর বিরক্তি ধরে গেল। বললেন, হয়েছে, হয়েছে, বাপু, থাম। যা করেছিস, করেছিস, এখন আর ভ্যানভ্যান করে আমাকে জ্বালাসনি।
দামু আবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর গাড়িটা যখন গ্রামের কাছাকাছি এসে পড়েছে, তখন হঠাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল : ও ডেরাইভার সায়েব, গাড়িখানা একটু থামাও দিকিনি।
